রূপগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই, আগস্টেই আক্রান্ত ৪৯ জন

Sadek Ali
শ্রী দিপু চন্দ্র গোপ,রূপগঞ্জ
প্রকাশিত: ১:২৫ অপরাহ্ন, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৪:৪১ পূর্বাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বর্ষার পানিতে যখন স্বস্তি পাওয়ার কথা, তখন সেই জমে থাকা পানিই রূপগঞ্জবাসীর জন্য হয়ে উঠছে আতঙ্কের কারণ। বাড়ির আঙিনা, নর্দমা, ডোবা, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে নির্বিঘ্নে বংশ বিস্তার করছে এডিস মশা। আর এডিসের বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা।দিন দিন ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক। প্রতিদিনই জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাবসহ নানা উপসর্গ নিয়ে রোগীরা ছুটছেন রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। কারও শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে, আবার শারীরিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে।রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু আগস্ট মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৯ জন। এর বাইরে উপজেলার ২৮টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে সরকারি হাসপাতালের পরিসংখ্যানের বাইরেও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষের বসবাস রূপগঞ্জে। শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ঘনবসতিপূর্ণ এ উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বাড়িঘরের আশপাশে জমে থাকা পানি, অপরিষ্কার নর্দমা, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব ও পুরোনো টায়ারে জমে থাকা পানি হয়ে উঠছে এডিস মশার প্রজননস্থল।সাধারণ জ্বর ভেবে দেরি, পরে ডেঙ্গু শনাক্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী জানান, শুরুতে জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা মনে করে বাড়িতেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু কয়েকদিন পর জ্বরের সঙ্গে শরীর ও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিলে হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করান। এরপরই ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।ডেঙ্গু আক্রান্ত একাধিক রোগী বলেন, কয়েকদিন ধরে তাদের প্রচণ্ড জ্বর ছিল। সঙ্গে মাথা ও শরীরে ব্যথা এবং দুর্বলতা দেখা দেয়। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করান। পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা।রূপগঞ্জ এলাকা থেকে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে রতন চন্দ্র গোপ বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম দেখা গেলেও রূপগঞ্জে তেমন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা না হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।শুধু চিকিৎসা নয়, ধ্বংস করতে হবে মশার প্রজননস্থল চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি রোগের উৎস বন্ধ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা না গেলে আক্রান্তের সংখ্যা কমানো কঠিন।রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। বাড়ির আশপাশে যেখানে-সেখানে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। তাই নিয়মিত বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়ার মাধ্যমে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা সম্ভব।তিনি বলেন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, পুরোনো টায়ার, ড্রাম কিংবা যেসব স্থানে পানি জমতে পারে সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বাড়ির নর্দমা ও ডোবার পানিও যথাসম্ভব পরিষ্কার রাখতে হবে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।প্রতিটি বাড়ির আঙিনা পরিষ্কারের নির্দেশ ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাড়া-মহল্লার প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় থাকা ময়লা-আবর্জনা ও জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে গণসচেতনতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু প্রশাসনের উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রত্যেক পরিবারকে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলা করা সম্ভব।মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। এর সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে দ্রুত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।স্থানীয়দের মতে, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। একদিকে যেমন বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, অন্যদিকে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি রয়েছে মানুষের সচেতনতার মধ্যেই। একটি বাড়ির আঙিনায় জমে থাকা সামান্য পানিও হতে পারে এডিস মশার প্রজননস্থল। তাই নিজের ঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি প্রতিবেশীকেও সচেতন করতে হবে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ একযোগে কাজ করলেই রূপগঞ্জে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন: গাজীপুরে ধর্ষণের শিকার শিশুর পাশে নিপীড়িত নারী ও শিশু সহায়তা সেল