তিন বছর পর পটুয়াখালীর মঞ্চে আলো ‘থিয়েটারওয়ালা’য় ফিরে এল নাটকের প্রাণ
তিন বছর পর আবারও আলো জ্বলল পটুয়াখালীর মঞ্চে। শুক্রবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে একের পর এক আসন পূর্ণ হতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় পুরো মিলনায়তন। মঞ্চের পর্দা ওঠার অপেক্ষায় দর্শকদের মধ্যে তখন চাপা উত্তেজনা। অবশেষে মঞ্চে আলো জ্বলে উঠল। শুরু হলো নাটক, ‘থিয়েটারওয়ালা’।
দীর্ঘ তিন বছরের বিরতির পর পটুয়াখালীতে কোনো নাটকের মঞ্চায়ন ঘিরে এমন দৃশ্যই দেখা গেল। নাট্যপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকদের উপস্থিতিতে জেলা শিল্পকলা একাডেমি যেন ফিরে পেল পুরোনো সেই প্রাণচাঞ্চল্য।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে ধর্ষণের শিকার শিশুর পাশে নিপীড়িত নারী ও শিশু সহায়তা সেল
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় নাট্য সংগঠন ‘আগুন মুখা’ নাটকটির আয়োজন করে। বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত চিকিৎসক ফজলুল করিমের স্মরণে মঞ্চস্থ হয় ‘থিয়েটারওয়ালা’।
একটি শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণচাঞ্চল্যের অন্যতম সূচক তার মঞ্চনাটক। নিয়মিত নাটকের আয়োজন হলে সেখানে শিল্পী তৈরি হয়, দর্শক তৈরি হয়, নতুন চিন্তার সঙ্গে মানুষের পরিচয় ঘটে। কিন্তু পটুয়াখালীতে সেই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়েছিল।
আরও পড়ুন: হরিরামপুরে ১ যুগেও হয়নি রাস্তা সংস্কার, ঝুঁকিতে চলাচল
প্রায় তিন বছর ধরে স্থানীয় মঞ্চে নিয়মিত নাটকের আয়োজন না থাকায় অনেকটাই নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল নাট্যচর্চার পরিবেশ।
এই বিরতির মধ্যে শিল্পীরা থেমে থাকেননি। নিজেদের মতো করে অনুশীলন করেছেন, নাটকের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। কিন্তু দর্শকের সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করার সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে নাট্যকর্মীদের মধ্যে যেমন এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তেমনি দর্শকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছিল অপেক্ষা। ‘থিয়েটারওয়ালা’র মঞ্চায়ন সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে।
নাট্যকর্মীদের কাছে এটি তাই কেবল একটি প্রযোজনার প্রদর্শনী নয়; বরং দীর্ঘ বিরতির পর নিজেদের প্রিয় মঞ্চে ফিরে আসার উপলক্ষ।
‘থিয়েটারওয়ালা’র বিশেষত্ব এর বিষয়বস্তুতে। নাটকের গল্পে উঠে এসেছে থিয়েটার অঙ্গনের ভেতরের বাস্তবতা। দর্শক মঞ্চে যে অভিনয় দেখেন, তার পেছনে শিল্পীদের যে দীর্ঘ প্রস্তুতি, শ্রম, ত্যাগ, হতাশা ও স্বপ্ন থাকে, সেই নেপথ্যের গল্পই নাটকটির অন্যতম প্রধান বিষয়।
মঞ্চের আলো সাধারণত দর্শকের চোখে পড়ে। কিন্তু সেই আলোর বাইরে থাকে আরও অনেক গল্প।
কখনো অর্থের সংকট, কখনো সময়ের সংকট, কখনো দর্শকের অভাব, আবার কখনো ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন পেরিয়ে শিল্পীদের মঞ্চে দাঁড়াতে হয়। অভিনয় শেষ হলে করতালি পাওয়া যায়, কিন্তু সেই করতালির পেছনে থাকা দীর্ঘ পরিশ্রমের গল্প অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে যায়। ‘থিয়েটারওয়ালা’ সেই অদৃশ্য গল্পগুলোই সামনে নিয়ে এসেছে।
নাটকটি দেখিয়েছে, থিয়েটার শুধু বিনোদনের জায়গা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের আবেগ, স্বপ্ন, সম্পর্ক এবং টিকে থাকার লড়াই।
নাটকটির রচনা করেছেন স্বপ্নীল দাস। নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় ছিলেন আব্দুল্লাহ আশরাফ অপূর্ব (অনীম)। প্রযোজনার সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন জেলা কালচারাল কর্মকর্তা কাজী মো. কামরুজ্জামান।
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাকসুদ উন নবী, গতিয়া সেন প্রীতি, আসিফ আহমেদ, ফারহানা জামান যোথি, তূর্য, মুশফিক, যোমি, জান্নাত, হাবিবাত, আরাফাত, আসিফ, সৌরভ, জোবায়েদ, মো. মশিউর রহমান মিথুন, সানিয়া মেহেরিনসহ একঝাঁক অভিনয়শিল্পী।
মঞ্চের পেছনের কাজেও ছিল একাধিক মানুষের অংশগ্রহণ। রূপসজ্জার দায়িত্ব পালন করেন মো. জোবায়ের রহমান। আলোক পরিকল্পনাতেও ছিলেন তিনি। পোশাক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেন মুশফিক, জান্নাত ও মিথুন।
অর্থাৎ মঞ্চে কয়েকজন শিল্পীকে দেখা গেলেও এর পেছনে কাজ করেছেন আরও অনেকে। নাটকের এই সামগ্রিক আয়োজনই দেখিয়ে দিয়েছে, একটি মঞ্চনাটক কেবল অভিনয়শিল্পীদের কাজ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি বড় দল।
তিন বছর পর নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। প্রদর্শনী শুরুর আগেই মিলনায়তন পূর্ণ হয়ে যাওয়া সেই আগ্রহেরই প্রমাণ দিয়েছে।
নাট্যকর্মীদের জন্য দর্শকের এই উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মঞ্চনাটকের প্রাণ কেবল শিল্পী নন, দর্শকও। দর্শক না থাকলে মঞ্চের আলো জ্বলে, কিন্তু নাটকের প্রাণ জাগে না।
দীর্ঘ বিরতির পর দর্শকের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তাই পটুয়াখালীর নাট্যকর্মীদের জন্য নতুন আশার বার্তা হিসেবে দেখছেন সংস্কৃতিকর্মীরা।
‘থিয়েটারওয়ালা’র প্রদর্শনী শেষ হয়েছে। দর্শকের করতালিও থেমে গেছে। কিন্তু এই আয়োজনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পটুয়াখালীর মঞ্চে কি আবার নিয়মিত নাটক ফিরবে?
সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, একটি বা দুটি নাটকের আয়োজন দিয়ে নাট্যচর্চার দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটবে না। প্রয়োজন নিয়মিত মঞ্চায়ন, মহড়া ও নতুন নাট্যকর্মীদের যুক্ত করার সুযোগ।
বিশেষ করে তরুণদের থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পটুয়াখালীর নাট্যাঙ্গনে নতুন প্রাণ ফিরতে পারে। এজন্য নিয়মিত নাটকের আয়োজনের পাশাপাশি প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা, সাংগঠনিক উদ্যোগ এবং দর্শকদের সঙ্গে মঞ্চের ধারাবাহিক যোগাযোগ। তিন বছর পর ‘থিয়েটারওয়ালা’ সেই সম্ভাবনার দরজাটিই যেন আবার খুলে দিয়েছে।
একসময় যে মঞ্চ নীরব ছিল, সেখানে শুক্রবার সন্ধ্যায় আবার কণ্ঠ শোনা গেছে, আলো জ্বলেছে, চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দর্শকের চোখের সামনে অভিনীত হয়েছে মঞ্চের গল্প, আর সেই গল্পের ভেতর দিয়েই উঠে এসেছে থিয়েটার বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম।
পটুয়াখালীর নাট্যকর্মীদের কাছে তাই এই সন্ধ্যার তাৎপর্য হয়তো এখানেই—তিন বছরের খরার পর মঞ্চে শুধু একটি নাটক ফেরেনি, ফিরেছে নাটক করার সাহস এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগও। এখন অপেক্ষা, সেই আলো কত দিন জ্বলে থাকে।





