নানা চমকে গ্রামগঞ্জে ইউপি নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা জমজমাট
অদ্যবধি ঘোষণা হয়নি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল কিংবা ভোটের নির্ধারিত দিনক্ষণ। তারপরও দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনের বাড়তি আমেজ। হাট-বাজার কিংবা রাস্তার ধারে চা স্টলে সর্বত্রই বিরাজ করছে ইউপি নির্বাচনের আলোচনা-সমালোচনা। ইউপি নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। কেউ কেউ হাট-বাজারে কর্মীসমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে উঠান বৈঠকে তুলে ধরছেন নিজ নিজ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। ফলে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পদচারণায় নানা চমকে জমে উঠেছে ইউপি নির্বাচনের আগাম প্রচার-প্রচারণা। নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নির্দলীয় ঘোষণা দিলেও সব রাজনৈতিক দলেই দলীয় একক প্রার্থী সমর্থনের কাজ করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই মধ্যে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পদচারণায় নজর কেড়েছে সাধারণ ভোটারদের। সর্বশেষ কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নাটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী সেলুন ব্যবসায়ী মো. ফেরদৌস মিয়া ব্যতিক্রমী আগাম প্রচারণা চালিয়ে স্থানীয়দের নজর কেড়েছেন। গত ২৭ আগস্ট দুপুরে বিন্নাটি চৌরাস্তা মোড় এলাকায় ভৈরব-কিশোরগঞ্জ সড়কে দেখা যায় তার অভিনব প্রচারণা। হাতির পিঠে চড়ে, সঙ্গে ঢাকঢোল ও ব্যান্ড পার্টি নিয়ে সড়ক প্রদক্ষিণ করেন ফেরদৌস মিয়া। ব্যান্ডের বাদ্য আর ঢাক-ঢোলের তালে তার এ প্রচারণা দেখতে সড়কের পাশে ভিড় করেন স্থানীয়রা। অনেকেই মোবাইল ফোনে ধারণ করেন দৃশ্যটি। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ব্যতিক্রমী প্রচারণার আলোচনা। তবে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা তার নিজের একার নয়। ফেরদৌস জানান, তার মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে একদিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই মারা যান তার মা। এরপর মায়ের অপূর্ণ ইচ্ছাকেই নিজের লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন তিনি। অপরদিকে গতকাল শনিবার বেতাল ও বৈরাগীর চর বাজারে পৃথক পৃথক উঠান বৈঠকে ভোটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছাসহ মতবিনিময় করেছেন মসুয়া ইউনিয়নের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল কুদ্দুস রতন। এ সময় এলাকার উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক। স্বশিক্ষিত ও মেধাবী হিসেবে আবদুল কুদ্দুস রতনের সুখ্যাতি রয়েছে মসুয়া ইউনিয়নজুড়ে। তিনি সব সময় অন্যের উপকারে নিবেদিত একজন আদর্শ ও যোগ্য মানুষ। আগামী নির্বাচনে তাকেই বেছে নিতে চান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা। একইভাবে জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপি নেতা মো. রফিকুল আলম রফিক। এলাকাবাসীর উন্নয়নের তিনিও দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। বসে নেই আসমিতা ইউনিয়ন পরিষদের বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নানও। এলাকাবাসীর কল্যাণে তিনি ইতিমধ্যে নানাভাবে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এতে ভোটাররাও তার দিকে ঝুঁকছেন। একইদিন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ২নং কপিলমুনি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
তবে স্থানীয়দের একাংশের মতে, চেয়ারম্যান পদে নতুন মুখ হলেও সমাজসেবক ও তরুণ রাজনৈতিক নেতা শেখ আবু তালেব সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে ইউনিয়নজুড়ে বেশ পরিচিতি ও সমর্থন অর্জন করেছেন। এমনকি চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্রই আলোচনায় ভাসছেন তারই নাম। শেখ আবু তালেব কপিলমুনি ইউনিয়নের রেজাকপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। তার পিতার নাম শেখ আনসার আলী। তিনি উপজেলা বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য ও ইউনিয়ন পলিশিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছেন বলেও স্থানীয়রা জানান।
আরও পড়ুন: সবাইকে নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঝাঁপ দিতে হবে: সিইসি
সম্প্রতি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার ৪নং পালাখাল মডেল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে দিন দিন সরগরম হয়ে উঠছে স্থানীয় রাজনীতি। নির্বাচনের সময় ও দিনক্ষণ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো নির্ধারিত না হলেও থেমে নেই সম্ভাব্য ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদপ্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ। নির্বাচনী আমেজে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা ইউনিয়ন এলাকা। তবে সাধারণ ভোটাররা জানান, নির্বাচনের তারিখ না হলেও প্রার্থীরা যেভাবে আমাদের কাছে আসছেন, তাতে বেশ নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে। তবে আমরা এমন প্রার্থীকেই বেছে নেব যিনি ইউনিয়নের সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন। নির্বাচনি প্রচারণা ও প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ দেখে স্পষ্ট, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলে পালাখাল মডেল ইউনিয়নের নির্বাচনি ময়দান আরও উত্তপ্ত ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নে প্রায় হাফ ডজন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী মাঠ পর্যায়ে চালাচ্ছেন গণসংযোগ, মতবিনিময়, সামাজিক কর্মকাণ্ডে জানান দিচ্ছেন প্রার্থিতা। কথা হয় মাসুদ মোল্লার সাথে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত রাজনীতি করতে গিয়ে মামলা, হামলার শিকার হয়েছি। ওটরার সাধারণ মানুষ তা জানে। আমি ওটরা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং থানা কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বিগত দিনে আমাদের ওটরা ছিল অবহেলিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ সর্বক্ষেত্রেই আমাদের ওটরা ইউনিয়ন ছিল উন্নয়নবঞ্চিত। কাজেই আমার ইচ্ছা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে সকলের মতামত নিয়ে অবহেলিত ওটরা ইউনিয়নকে একটি আদর্শ ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলব।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০ আগস্ট: মির্জা ফখরুল ও কর্নেল অলির মনোনয়ন বৈধ
একইভাবে সারাদেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্ব স্ব প্রার্থীরা নিজেদের জানান দিতে এবং ভোটারদের ভালোবাসা পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।
নভেম্বর-ডিসেম্বরে শুরু হচ্ছে ইউপি নির্বাচন: চলতি বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকারের ভোট শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন উপযোগী ইউপিগুলোর মধ্যে প্রথম ধাপের তফসিল আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন।
গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে বিকালে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সামনে এ পরিকল্পনা তুলে ধরেন সিইসি। স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের মধ্যে সামনে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, প্রায় ৫০০টি উপজেলা এবং সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন পদে নির্বাচন রয়েছে। ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনায় ইউপি নির্বাচন দিয়েই এ ভোটপর্ব শুরু করার কথা রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত ভোটের জন্য দুই মাস সময় রাখা হয়, সে কথা তুলে ধরে সিইসি বলেন, শিডিউল যদি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দিই, ইলেকশনটা আগামী বছরে চলে যাবে। আগামী বছর ইলেকশন করলে আমাকে এ বছর শিডিউল দিতে হবে। আশা করছি, হয়তো আমরা সেপ্টেম্বরে শিডিউলটা ঘোষণা করতে পারব। তাহলে কিছু কিছু বছরের শেষে, কিছু আগামী বছরেও চলে যেতে পারে।
এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের পর এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের ভোট দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে সিইসি বলেন, ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপে ৩৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ ছিল। নির্বাচন কমিশনের নথিতেও ওই ধাপে ৩৭১টি ইউপির তথ্য রয়েছে। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে এসব ইউপি বিবেচনায় নিতে হবে। কোনোভাবেই খারাপ মৌসুমে করা যাবে না, শুষ্ক মৌসুমে করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। পার্বত্য এলাকায় ভোটও শুষ্ক মৌসুমে করার চিন্তা করতে হবে। সবকিছু মিলিয়েই করতে হবে। শীতকালে নির্বাচন করার উপযোগী, নির্বাচনের মৌসুম।
ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আচরণবিধি ও আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আচরণবিধির খসড়াও প্রকাশ করা হয়েছে। সিইসি বলেন, আইন সংশোধনের খসড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদন এবং পরে সংসদে পাসের প্রক্রিয়া রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দেন তিনি।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তফসিল দিয়ে নভেম্বরে ভোট শুরু করা হবে কি না এমন প্রশ্নে সিইসি বলেন, আমরা আগামী মাসে সেপ্টেম্বরে তফসিল দিতে চাই। কারণ, সেখানে আইনি কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে (মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে)। নভেম্বরে পরীক্ষা শেষ করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। বছরের শেষে ইলেকশন করতে হলে আমাকে শিডিউলটা দিতে হবে আগামী মাসে। অন অ্যান এভারেজ মাস দুয়েক সময় রেখে শিডিউল দিতে হয়।
তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে শুরু হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে সারাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। এতদিন অবশ্য ইসি বলেছিল, অক্টোবর থেকেই তারা স্থানীয় নির্বাচন শুরু করতে চায়।





