শিশু নুসরাতের মৃত্যু ঘিরে মায়ের দিকেই সন্দেহের তীর

Any Akter
কবির হোসেন রাকিব, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:০৪ অপরাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৬:২৪ অপরাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মাত্র পাঁচ বছরের শিশু নুসরাত জাহান আলিফা। যে বয়সে মায়ের আঁচল ধরে পৃথিবীটাকে চিনে নেওয়ার কথা, উঠানে ছুটে বেড়ানোর কথা, হাসি-খেলায় মুখর করে রাখার কথা—সেই শিশুটির নিথর দেহ মিলেছে পানিতে। তার মৃত্যু ঘিরে এখন তৈরি হয়েছে একের পর এক প্রশ্ন। এটি কি নিছক পানিতে ডুবে মৃত্যু, নাকি এর আড়ালে রয়েছে কোনো অজানা ঘটনা?

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে পাঁচ বছরের শিশু নুসরাত জাহান আলিফার পানিতে ডুবে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এমনই রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। শিশুটির বাবা দিদার হোসেনের অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধের জেরে তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে মায়ের পরিবারের দাবি, খেলার ছলে পুকুরে পড়ে পানিতে ডুবে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। দুই পরিবারের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য।

আরও পড়ুন: শ্যামনগরে ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে পুলিশের ওপর হামলা, আসামি ছিনতাই

নিহত নুসরাত জাহান আলিফা কমলনগর উপজেলার চর জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের দিদার হোসেনের মেয়ে। তার মা মর্জিনা আক্তারের বাবার বাড়ি একই উপজেলার চর কাদিরিয়া ইউনিয়নের কিল্লার রোড চৌকিদার বাড়ি এলাকায়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে দিদার হোসেন ও মর্জিনা আক্তারের বিয়ে হয়। ব্যবসার কারণে দিদার হোসেন অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করতেন। পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ চলছিল বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে মর্জিনা আক্তার শিশু নুসরাতকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি পদক পেলেন টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার

শিশুটির বাবা দিদার হোসেনের অভিযোগ, গত শনিবার মুঠোফোনে স্ত্রী মর্জিনার সঙ্গে তার তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সন্তানকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। এর পরদিন রোববার বিকেলে মেয়ের পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর পান দিদার।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মেয়ের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হওয়ার আলামত দেখতে পান বলে দাবি করেন তিনি। এতে তার সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। দিদার হোসেনের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নয়; তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে শিশুটির মায়ের পরিবারের সদস্যরা এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য, নুসরাত খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পুকুরে পড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

এদিকে শিশুটির মৃত্যুর খবর ও পরস্পরবিরোধী অভিযোগের বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেকের নজরে আসে। তিনি ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনায় কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল আলম প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

সোমবার লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে শিশুটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে মাগরিবের নামাজের পর চর জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের একটি মসজিদে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নুসরাতকে দাফন করা হয়।

একটি শিশুর নিথর দেহ, দুই পরিবারের দুই রকম দাবি—আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রশ্ন, নুসরাতের মৃত্যুর আসল কারণ কী? দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সত্য—ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তেই মিলবে সেই প্রশ্নের উত্তর।

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পাশাপাশি ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখে তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।