ট্রলার নিয়ে সাগরে যাওয়া ১১ জেলের সন্ধান নেই ৯ মাস

Shahrier Islam Pallab
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:০১ অপরাহ্ন, ০১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৯ অপরাহ্ন, ০১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পাঁচ মেয়েকে রেখে জীবিকার সন্ধানে সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলমগীর মাঝি। কিন্তু সাগরে যাওয়ার পর কেটে গেছে প্রায় নয় মাস। এখনো তাঁর কোনো সন্ধান নেই। শুধু আলমগীর নন, একই ট্রলারে থাকা আরও ১০ জেলেরও কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

নিখোঁজ এসব জেলের স্বজনরা বলছেন, তাঁদের প্রিয়জনেরা জীবিত না মৃত- কোনোটিই নিশ্চিতভাবে জানতে পারছেন না তাঁরা। দীর্ঘ অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারগুলোর।

আরও পড়ুন: নবীগঞ্জে পৌর কর সেবা সপ্তাহে আদায় ৪১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট থেকে ‘এফবি শরিফা-২’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলারে করে সাগরে রওনা হন চার জেলার ১১ জেলে। এরপর থেকেই তাঁদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ট্রলারটিরও এখন পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ ১১ জেলের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের তিনজন, নোয়াখালীর চারজন, কুমিল্লার দুজন এবং চট্টগ্রামের দুজন রয়েছেন।

আরও পড়ুন: সুরেশ্বরে পদ্মার ডান তীররক্ষা বাঁধে ফাটল ৫০ মিটার আতঙ্কে বসতি সরিয়ে নিচ্ছে নদী পাড়ের মানুষ।

নিখোঁজরা হলেন- লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার সুজন গ্রামের আলমগীর মাঝি (৫৪), চর গজারিয়া গ্রামের মামুন মিস্ত্রি (৩৪) ও সবুজ গ্রামের তছির আহমেদ (৪৩); নোয়াখালীর চর জব্বরের চর লক্ষ্মী গ্রামের আজাদ (৩০), চর নাঙ্গালিয়া গ্রামের আজাদ (২৭), পূর্ব চর মজিদ গ্রামের ইমাম উদ্দিন হোসেন (২৮) ও সুবর্ণচরের চর কাজি মোখলেছ গ্রামের সালাউদ্দিন; চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পূর্ব খইয়াছড়া গ্রামের রুবেল ও পাহাড়তলী এলাকার মিলন মিয়া এবং কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের ফজলে এলাহী ও নাঙ্গলকোটের নিশ্চিতপুর গ্রামের ইসমাইল।

নিখোঁজ আলমগীর মাঝির মেয়ে জেসমিন বেগমের ভাষ্য, ৮ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাঁর বাবা ও অন্য জেলেরা চট্টগ্রামের পুরাতন ফিশারিঘাট এলাকার চান্দগাঁও ঘাট থেকে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে সাগরের দিকে রওনা হন। এরপর তাঁদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ট্রলারটিরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

জেসমিনের দাবি, এর আগেও তাঁর বাবা একই ট্রলারে দুবার সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। তবে তৃতীয়বার যাওয়ার আগে ট্রলার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আচরণ নিয়ে তাঁর বাবার সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। ট্রলারে যেতে অনীহা প্রকাশ করায় মালিকপক্ষের সঙ্গে তাঁর বিরোধও হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের।

জেসমিনের অভিযোগ, ঘটনার দিন ফোনে হুমকি দিয়ে তাঁর বাবাকে ট্রলারে যেতে বাধ্য করা হয়।

নিখোঁজ হওয়ার পর ট্রলার মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও পরিবারের সদস্যরা কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলে আলমগীরের বিরুদ্ধেই ট্রলার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মামলা করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

থানায় মামলা, ডিবিতে তদন্ত

এ ঘটনায় ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন জেসমিন বেগম। মামলায় ট্রলার মালিক মাইন উদ্দিন নাহিদ কোম্পানি, নুরুল ইসলাম রাসেল, মোহাম্মদ বেলাল ও কামাল মেম্বারকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

মামলার আসামিদের মধ্যে কয়েকজনের বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়া ও চট্টগ্রামে। তবে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে বসবাস করছেন বলে মামলার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইমাম হোসেন জানান, মামলা হওয়ার পর চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ ট্রলার মালিকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের রিয়াজ উদ্দিন বাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২৫০ বস্তা সিমেন্ট ও ময়দা নিয়ে ট্রলারটি মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়।

তবে এরপর ট্রলারটির কী হয়েছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

এসআই ইমাম হোসেন আরও বলেন, ওই ব্যবসায়ীকে শনাক্ত করা হয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে থানায় আরও কয়েকটি মামলা রয়েছে বলে তদন্তে জানা যায়। মামলার দুই নম্বর আসামি মো. রাসেলকে গ্রেপ্তার করা গেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে তিনি পলাতক থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পরে তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় মামলার পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি।

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছেন সিএমপির ডিবির এসআই সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, রিয়াজ উদ্দিন বাজারের ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সিমেন্ট ও ময়দা নিয়ে ট্রলারটি মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার থেকে ফেরত আসা এক জেলের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই ট্রলারের মাঝি-মাল্লাদের আটক করেছিল। এ বিষয়ে ওই জেলের জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, মামলায় আগে গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। আরেক আসামি মো. রাসেল পলাতক।

রাখাইনে আটকের আশঙ্কা পরিবারের

নিখোঁজ জেলেদের স্বজনদের ধারণা, তাঁদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকায় আরাকান আর্মির কাছে আটক রাখা হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—বিজিবির মহাপরিচালকের কাছেও আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনো তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

নিখোঁজ জেলেদের সন্ধানে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বপ্ন নিয়ে’ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেছে।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আশরাফুল আলম হান্নান বলেন, বিজিবি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। নিখোঁজ জেলেদের তালিকাসহ আবেদনও করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনও করেছেন।

‘বাবা বেঁচে আছেন কি না, সেটিও জানি না’

আলমগীর মাঝির মেয়ে জেসমিন বেগম বলেন, আমরা শুধু জানতে চাই, আমার বাবা ও অন্য জেলেরা কোথায় আছেন। তাঁরা বেঁচে আছেন কি না, সেটিও জানি না। নয় মাস ধরে প্রতিদিন বাবার ফেরার অপেক্ষায় আছি।

এদিকে দীর্ঘ সময়েও ১১ জেলের অবস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় স্বজনদের উদ্বেগ বাড়ছে। নিখোঁজ জেলেদের দ্রুত শনাক্ত করা, তাঁরা জীবিত না মৃত তা নিশ্চিত করা এবং পুরো ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি ঘটনায় কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।