বগুড়া থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আখের গুড়

Shahrier Islam Pallab
নব চন্দ্র (সূর্য্য) বগুড়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৩:১৭ অপরাহ্ন, ১০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৫:৪৩ পূর্বাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বগুড়া থেকে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে আখের গুড়। আখের রস থেকে সুস্বাদু আখের গুড় হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে হাল ধরে রেখে আখের গুড় তৈরী করছে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিনয় মাস্টার। শীতের মৌসুম এলেই দেখা মিলত আখের ক্ষেত আর গুড় তৈরির ব্যস্ততা। মাঠ থেকে আখ কেটে রস বের করে বড় কড়াইয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেয়া। তারপর সেই রস থেকেই তৈরি হতো সুস্বাদু আখের গুড়। সময়ের সঙ্গে আখের চাষ কমে গেছে, কমেছে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে গুড় তৈরির আয়োজনও। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই আখ থেকে গুড় তৈরির দৃশ্য এখন অনেকটাই অবাক করা নতুন কিছু।

তবে পুরোনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে বগুড়া শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা রহবল গ্রামাঞ্চলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিনয় মাস্টার। শিক্ষকতা থেকে অবসরে গিয়ে তিনি সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে আখ চাষ শুরু করছে। একই সঙ্গে নিজের চাষ করা আখ থেকে নিজেই তৈরি করছে আখের গুড়। এতে একদিকে যেমন তার অবসর সময় কাটছে। অন্যদিকে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যও ফিরে পাচ্ছে নতুন চাঞ্চলের প্রাণ।

আরও পড়ুন: মোহনগঞ্জে পুকুরে ডুবে একই বাড়ির দুই শিশুর মৃত্যু

সরেজিমনে রহবল এলাকার বর্মসর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় যে, সারিসারি জমি থেকে পরিপক্ব আখ কেটে সংগ্রহ করে সেগুলো নেয়া হচ্ছে রস বের করা মেশিনের কাছে। মেশিনে চাপ দিয়ে আখ থেকে বের করা হচ্ছে রস। সেই রস কলাগাছের বাকল দিয়ে পড়ে জড়ো হচ্ছে বড় একটি পাত্রে।

পরবর্তীতে শুরু হয় গুড় তৈরির মূল কর্মকাণ্ড বা প্রক্রিয়া। বড় কড়াইয়ে আখের রস ঢেলে চুলায় জ্বাল দেয়া শুরু হয়। প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা ধরে জ্বাল দেয়ার পর ধীরে ধীরে রসের পানি কমে আসতে থাকে। আগুনের তাপে এক পর্যায়ে ঘন হয়ে যায় আখের রস গুলো।তারপর কড়াইটি চুলা থেকে নামিয়ে কাঠের নাড়ানি দিয়ে রসে কিছুক্ষণ ঢাবু দিয়ে নাড়াচাড়া করা হয়। তারপর আস্তে আস্তে তা জমতে থাকে এবং এক পর্যায়ে আখের রস থেকে আখের গুড় তৈরির উপযোগী হয়। তখন কড়াই থেকে নামিয়ে এনে তৈরি করা হয় আখের গুড়। সেই গুড় তৈরির পর সেটা নির্দিষ্ট পরিমাণে ওজন করা হয়। প্রায় আধা কেজি বা ১ কেজি করে ওজন করে হাতের সাহায্যে মুঠো আকারে তৈরি করে বিনয় মাস্টার ও অন্যান্য শ্রমিকরা। পরে এসব আখের গুড় খুচরা ও পাইকারি হিসাবে বিক্রি করে বিনয় মাস্টার।

আরও পড়ুন: কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে শয্যা হবে এক হাজার: কৃষিমন্ত্রী

এতে অত্র এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন যে, এক সময় অত্র এলাকায় অনেক আখের চাষ এবং আখের গুড় তৈরির প্রচলন ছিল। বর্তমানে এখন সেভাবে আর দেখা যায় না। এমনকি এই ব্যবসা বা পেশা বর্তমানে বিলুপ্ত বা হারিয়ে যেতে বসেছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই হারানো পেশাটি ফিরিয়ে এনেছেন বিনয় মাস্টার। তাই এই আখ চাষ ও গুড় তৈরির দৃশ্য অনেকের মধ্যেই পুরনো দিনের হারানো স্মৃতি ফিরিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন অত্র এলাকাবাসী।

এবিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিনয় মাস্টার বলেন যে, তিনি দীর্ঘদিন রহবল দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি বসে না থেকে কৃষি কাজের প্রতি আগ্রহ থেকেই আখ চাষ শুরু করেন। তাই সে নিজের জমিতে উৎপাদিত আখ থেকেই আখের গুড় তৈরি করছে।

তিনি আরো বলেন যে, আগে অত্র এলাকায় অনেকেই আখ চাষ করতেন এবং আখ থেকে গুড় তৈরি করতেন। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আখ চাষ কমে যাওয়ায় দেশীয় পদ্ধতিতে গুড় তৈরির প্রচলনও কমে গেছে। তাই নিজে আখ চাষ করে নিজেই আখের গুড় তৈরি করে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে তিনি অর্থনৈতিক ভাবে এবং পারিবারিক ভাবেও পূর্বের চেয়ে আরও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন বলে জানান তিনি।