মৃত্যুফাঁদে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক
বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সরু ও আঁকাবাঁকা পথ, মোড়ে মোড়ে দৃষ্টিসীমানার বাইরে থাকা বিপজ্জনক বাঁক, মহাসড়ক দখল করে গড়ে ওঠা হাটবাজার এবং অবৈধ যানবাহনের অবাধ চলাচলের কারণে এই সড়কে বেড়েই চলেছে প্রাণহানি। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই রুটে যানবাহনের চাপ বহুগুণ বাড়লেও সড়ক প্রশস্তকরণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ এখনো প্রস্তাবনার কাগজে আটকে রয়েছে।
বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (বিআরএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে বরিশাল বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় দুই হাজার চারশ মানুষ নিহত হয়েছেন, যার একটি বড় অংশ ঘটেছে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে। ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২১ সালে ৫২৪টি দুর্ঘটনায় ৫৮৭ জন, ২০২২ সালে ৪৩০টি দুর্ঘটনায় ৫১১ জন, ২০২৩ সালে ৪৩৬টি দুর্ঘটনায় ৪শিল্প জন, ২০২৪ সালে ৪৩৯টি দুর্ঘটনায় ৪৫৭ জন এবং গত বছর ৪৪৮টি দুর্ঘটনায় ৪২১ জন নিহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ২০ সেপ্টেম্বর, পটুয়াখালী সদরের বসাক বাজারের পাশে ধুলু গাজীর মোড়ে 'ইমরান ট্রাভেলস'-এর একটি বাসের সঙ্গে অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হন।
আরও পড়ুন: কাউনিয়ায় পুকুরে মিলল নারীর মরদেহ
বিআরএসএফ-এর নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান জানান, পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর ঢাকা থেকে আসা বাসগুলো মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত একটি মহাসড়কে প্রবেশ করে এবং চালকরা আগের গতি বজায় রেখে গাড়ি চালানোর ফলে বাঁকগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বাঁক প্রায় ইউ-আকৃতির এবং পরিবহন সংস্থাগুলোর প্রতিযোগিতা ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বিপদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ছয় লেনের সড়ক নির্মাণ করা হলেও ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রায় ২০৫ কিলোমিটার সড়কটির বড় অংশের প্রস্থ মাত্র ২৪ ফুট এবং কিছু অংশ মাত্র ১৮ ফুট।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বরিশাল সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাসুদ খান জানান, ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের প্রায় ৭০টি বাঁক এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পটুয়াখালী বাস মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ বশির মৃধা জানান, ১৯৭০-এর দশকে রাস্তাটি ১২ ফুট চওড়া ছিল এবং পাঁচ দশকে তা প্রসারিত হয়ে মাত্র ২৪ ফুট হয়েছে, অথচ যানবাহনের সংখ্যা শতগুণ বেড়ে গেছে। তিনি পটুয়াখালীর সাখরিয়া থেকে বরগুনার আমতলীর বান্দরা পর্যন্ত ৩৭ কিলোমিটার অংশকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেখানে অন্তত ১৭টি তীক্ষ্ণ বা বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে।
আরও পড়ুন: দূর্গাপুরে সাংবাদিক আলিফ হত্যা, গ্রেফতার ১
বাসচালক আশরাফ আলী খান জানান, খায়রাবাদ ব্রীজ, দাপদাপিয়া, নলছিটি জিরো পয়েন্ট, লক্ষ্মীপাশা, বোয়ালিয়া, ভোরপাশা, চরামদ্দি, ধুলু গাজীর মোড়, সাখারিয়া, কেওড়াবুনিয়া, মহিষকাটা, আমড়াগাছিয়া, খুরিয়া ফেরিঘাট, মানিকঝুরি ও বান্দরা এলাকায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই এই সড়কে যানবাহন চাপ বেড়েছে। সওজের টোল প্লাজার তথ্য অনুযায়ী, সেতু খোলার আগে ভূরঘাটা-কুয়াকাটা অংশে প্রতিদিন ১৬ হাজার থেকে ১৯ হাজার যানবাহন চলাচল করলেও এখন তা দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজারটিতে এবং ঈদসহ অন্যান্য ছুটির দিনে তা আরও বৃদ্ধি পায়। পায়রা বন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কুয়াকাটার মহিপুর ও আলিপুরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কারণেও যানবাহন চলাচল বহুলাংশে বেড়েছে। বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১১৯ কিলোমিটার রাস্তার পাশে গড়ে উঠেছে ৬০টিরও বেশি হাটবাজার। পটুয়াখালী গোল চত্বর, হেতালিয়া, সাখরিয়া, ব্রিক ফিল্ড, মহিষকাটা, আমতলী মোড়, বান্দরা, নাচনাপাড়া, কলাপাড়ার পাখিমারা এবং মহিপুরে মহাসড়কের দুই পাশেই নিয়মিত বাজার বসে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির বরিশাল বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক ও পটুয়াখালী জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার ইমাম হোসেন নাসির বলেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় অননুমোদিত থ্রি-হুইলার, নসিমন, করিমন এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড যান চলাচলকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
পটুয়াখালী সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জামিল আক্তার লিমন জানান, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোতে সতর্কীকরণ চিহ্ন বসানো হলেও চালকদের সচেতনতার অভাব ও বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। তিনি আরও জানান, মহাসড়কটি ২৪ ফুট থেকে ৩৪ ফুট প্রশস্ত করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং অনুমোদন পেলে সম্প্রসারণের সময় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো যতদূর সম্ভব সোজা করা হবে। এছাড়া মহাসড়ক প্রশস্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সোজা করা, পরিকল্পিতভাবে রাস্তার পাশের বাজারগুলো স্থানান্তরিত করা এবং অননুমোদিত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করা অপরিহার্য বলে সংশ্লিষ্টরা মত প্রকাশ করেছেন।





