সোয়েব আল হাসানের এক গুচ্ছ কবিতা

Shahrier Islam Pallab
সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:১৩ অপরাহ্ন, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:১৩ অপরাহ্ন, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
সোয়েব আল হাসান। ছবিঃ সংগৃহীত
সোয়েব আল হাসান। ছবিঃ সংগৃহীত

কী হল 

হুট করে একদিন 

আরও পড়ুন: ৬ দশক পর শিকড়ের টানে কেন্দুয়ায় বেলা দত্ত, কাশফুলের শুভ্রতায় মাতালেন সাহিত্য আসর

ফোন অফ করে দিয়ে বললে, সব শেষ। 

আমি নিরুপায় হয়ে 

আরও পড়ুন: বিনয় মজুমদার ও তাঁর কবিতা

তোমার ফোন নম্বরের দিকে চেয়ে রইলাম। 

ফিরতি প্রশ্ন করার কোন অপশন থাকল না। 

আমি অবুঝ শিশুর মতো এখনও ভেবেই যাচ্ছি

কোন এক মিরাকল ঘটিয়ে তুমি ফিরবে। 

আমার অপেক্ষা পাঁজরের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে

হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত ওঠে, আবার নামে। 

ওঠানামা চলতেই থাকে। 

আমি জাফরান ভোরে চিলেকোঠায় উঠে

এখনও সদ্যপ্রসূত সূর্যকে 

তোমার কপালের টিপ ভেবে নেই। 

বিষুবরেখায় বিষাদ জমেছে 

অগ্রহায়ণের কাকেরা হাসছে অট্টহাসি 

তবু আমি শিশুদের মতো ভাবছি 

কোন এক মিরাকল ঘটিয়ে তুমি ফিরবে। 

মাঝেমাঝে ঘুমের ভেতর ঘুম ভেঙে যায় 

আবছা ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে তোমাকে দেখি

হেলিওট্রোপের মতো নীল মুখ করে দাঁড়িয়ে আছো 

তোমার বুক হাঁফরের মতো উঠছে নামছে

একটা আলো কোথা থেকে এসে 

আমাকে অন্ধ করে দেয়। 

কিছুই দেখা যায় না আর

তুমি কি আছো নাকি নেই? 

আমি কি ঘুমিয়ে নাকি জেগে?

বহু বছর হলো কিছুই টের পাচ্ছি না আর!

 

খেয়াল 

খেয়াল রাখা দরকার 

কারো চোখে চোখ পড়ার আগেই 

শুকিয়ে যাচ্ছে কত বেমক্কা জল। 

খেয়াল রাখা দরকার 

কারো কাদার মতো নরম বুক 

হয়ে উঠছে খরখরে কবরখানা। 

সেখানে বাতাসে দোল খাচ্ছে ছাপোষা ছাতিম ফুল। 

খেয়াল রাখা দরকার 

কারো ফুসফুসে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ 

পালমোনারি ডিজিজ এর বদলে 

ভরতি হয়ে থাকছে দীর্ঘশ্বাস। 

যে শ্বাস নেওয়া বড় কঠিন। 

খুব খেয়াল রাখা দরকার, খুউব! 

মৃত্যু একবার আসে। বারবার না।


কবর 

আমার কবরের উপর 

তুমি শেফালী ফুল হয়ে ফুটে আছো। 

হিলহিল করে দোল খাচ্ছ

ঘ্রাণ ছড়াচ্ছ

এদিক সেদিক ঘাড় ঘোরাচ্ছ

অভিমান করছ 

হাঁটছ 

গল্প করছ - 

তোমার শেকড় দিয়ে 

আটকে রেখেছ আমার হাড়গোড়। 

আমি স্প্রিচুয়াল হ্যালুসিনেশনেও বুঝতে পারি 

ভালোবাসা কি ভয়ঙ্কর সুন্দর!


আমাকে নাও

তোমার মুখের হাসি ক্ষীণ হয়ে আসলে 

আমার শহর গুমোট হয়ে থাকে। 

বুকের উঠোনে গুড়গুড় করে 

আবহাওয়ার পূর্বাভাস। 

বাউল বাতাস বেহিসেবী বাহাসে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। 

তোমার অভিমান ভাঙাতে 

এক পশলা বৃষ্টি আর রুপেলিয়া ফুল নিয়ে 

শাহবাগ থেকে ফিরছি। 

আমার এ মনোগ্যমাস মনে 

তোমাকে ভালোবাসা ছাড়া 

আর দ্বিতীয় কোন অপশন নেই। 

প্লিজ, চাঁদ ভাসা আলোর মতো আমাকেও 

তুমি ভালোবেসো একটা জীবন।


যত্ন 

প্রতি বৃহস্পতিবার কেন জ্বর আসে?  

বুঝতে না পেরে ডাক্তারের দ্বারস্থ 

হয়ে জানতে পারলাম, 

আমার আসলে প্রতিদিনই জ্বর আসে। 

প্রেমিক কাতর চোখে ডাক্তারকে 

জিজ্ঞেস করলাম, কেন জ্বর আসে? 

ডাক্তার বললেন, যা ভাবছেন সেসব না। 

জ্বরের সাথে হৃদয়ঘটিত ব্যাপারের 

কোন সংযোগ নেই। 

পাইরোজেন এক ধরণের পদার্থ নিঃসরণ করে 

আপনার গায়ের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। 

ইনফ্যাক্ট, নিজের যত্ন না নিয়ে 

একটা ব্যমো বাঁধিয়ে ফেলেছেন আর কি! 

আমি আয়েশ করে সিগারেটের ধোঁয়া 

ছাড়ার মতো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। 

আসলে জীবনে সবকিছুই করি 

শুধুমাত্র নিজের যত্ন নেওয়া ছাড়া। 

অথচ আমি যত্ন বলতে বুঝতাম 

প্রতি বৃহস্পতিবার আমার 

বাড়ি ফেরার পথে তোমার বলা একটি বাক্য - 

'রাতের বেলা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো না প্লিজ'।


কে জানত 

কে জানত 

এমন হব আমি

একটা দুপুর ঘুঘুর মতো একা,  

ব্যকুল হয়ে ফোনটা নেব হাতে

দেখব তোমার ফেসবুকে কি লেখা! 

কে জানত 

হেমন্ত দিন শেষে 

নীলিম নয়ন হবে এমন ভার, 

বুজরুকি ভাব জানা হয়ে গেলে

ফিলিংস পুড়ে সব হবে ছারখার। 

কে জানত 

সাগর হবে দুখী  

শেষ রাত্রির ফালি চাঁদের মতো, 

ঝুঁকে পড়া মেঘরা দেখে শুধু 

কার উঠোনে জল জমেছে কত। 

কে জানত 

বলবে খারাপ লোকে

তুলবে আঙুল আমার দিকে সব, 

আমি আবার ভেতর আঁটা মানুষ

খুব সহজে বলি না ‘কাট অফ’।


বাহানা 

যখনই তোমাকে দেখতে চেয়েছি 

ঠিক যখনই -  

তখনই আমার ঘাড়ের উপর উপচে এসে পড়েছে 

দূরত্বের দূরবীন। 

আমি যতবারই বলতে চেয়েছি তোমাকে ভালোবাসি 

ঠিক ততবারই বলতে হয়েছে ভালো না বাসার হাজার বাহানা 

আমি যতবারই পৌষে পাপ পঙ্কিলতা মুছতে চেয়েছি 

ঠিক ততবারই আমার শরীরে ঢুকে পড়েছে সুরিয়ালিজম।  

আসলে পৃথিবীটা এমনই 

আমরা বাঁধা পড়লে বাহানা বানাই 

বাহানা সাজাই 

কর্তব্যের করাতকলে নিজেদের দ্বিখণ্ডিত করে 

হারিয়ে ফেলি স্ফটিক রোদের মত ভালোবাসা। 

 

ছাড় 

ছাড় দিতে দিতে আমরা 

এক সময় সস্তা হয়ে পড়ি। 

খুচরো পয়সার মতো নামে থাকি, 

কিন্তু মূল্যে থাকি না। 

আবেগকে আয়ত্বে না আনতে পারার 

অনেক বিপদ। 

প্রথম ও প্রধান বিপদ হচ্ছে 

অন্যরা আপনার 

মগজের মাফকাঠি বুঝে নিয়ে 

আপনাকেই ছুঁড়ে ফেলবে আস্তাকুঁড়ে। 

আপনি খাবি খাবেন, 

খেই হারিয়ে ফেলবেন,  

অন্যরা হারাবে অপার আনন্দে। 

ছাড় দিলেও ছেড়ে দিতে নেই সবটা। 

কিছুটা নিজের কাছেও রাখতে হয়। 

জানান দিতে হয় নিজের ব্যতিহার ব্যক্তিত্ব।


একটু থাকি 

দুইটা বাজার ঘন্টাখানেক বাকি

আর একটু আমি থাকি? 

একটু দেখি চোখের ভেতর রোদের আদর 

দুঃখ দু হাত 

আলসেমি রাত একটা ছবি আঁকি 

আর একটু আমি থাকি? 

একটু বলি মনের কথা রাত্রিলতা 

আকাশ সমান 

হয় অভিমান 

বলব কাকে? 

একটু আমি থাকি? 

সন্ধে হবার অনেক আছে বাকি!


মধ্যবিত্ত 

এই মধ্যবিত্ত জীবনে 

তুমি আমার মধ্যবর্তী টানাপোড়েন। 

কেউ আমাকে টানছে 

অথবা কাউকে আমি টানছি। 

টেনেটুনে গোটা কয়েক হা-হুতাশ নিয়ে 

বাড়ি ফিরছি প্রতিটা দিন। 

নালিশ করছি নিয়তিকে। 

নিয়তি পাশা খেলতে বসেছে 

পাশের বাড়ির বালিকার সাথে। 

সে তার আধ খাওয়া বুকের উঠোনে 

শুকোতে দিয়েছে ভিজে যাওয়া চৈত্র মাস। 

এইসব গ্রীষ্মকালীন উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে 

অর্ধবৃত্তের চক্করে বেদম মারা খাচ্ছে 

আমার মধ্যবিত্ত জীবন।