বাংলাদেশে বেকারত্বের ‘নীরব বিস্ফোরণ’: প্রবৃদ্ধির আড়ালে কর্মসংস্থানের গভীর সংকট
যুবসমাজে দ্বিগুণ বেকারত্ব, বছরে ৬–৭ লাখ গ্র্যাজুয়েটের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সমাধানে দক্ষতা, SME ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সমন্বিত পথের তাগিদ বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চিত্র যতই উজ্জ্বল করে তুলে ধরা হোক, বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন এখন সামনে—এই প্রবৃদ্ধি কি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পেরেছে? অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকদের মতে, এর উত্তর স্পষ্ট—“না”। বরং শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব এক গভীর কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে, যা অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
গত এক দশকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬–৭ শতাংশের ঘরে থাকলেও শ্রমবাজারে তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, কাগুজে উন্নয়ন এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
আরও পড়ুন: সমৃদ্ধি নাকি অনিশ্চয়তা
সংখ্যার আড়ালে বাস্তব সংকট
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ৪.৩% থেকে ৪.৭%। তবে এই গড় চিত্র প্রকৃত পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করে না—
আরও পড়ুন: ২০২৬ এ এসেও কেনো গুপ্তভাবে রাজনীতি করতে হচ্ছে?
১৫–২৪ বছর বয়সী যুবসমাজে বেকারত্ব প্রায় ১০–১২ শতাংশ
প্রতি বছর ৬–৭ লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও বড় অংশ কর্মহীন
প্রায় ২.৫–৩ কোটি মানুষ অপূর্ণ কর্মসংস্থানে (underemployment) নিয়োজিত
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল কাজের অভাব নয়—কাজের মান, দক্ষতা ও বাজারের চাহিদার মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্যের প্রতিফলন।
কৃষি থেকে শিল্পে রূপান্তর, তবুও সংকট কাটেনি
স্বাধীনতার পর যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর ছিল, বর্তমানে তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তৈরি পোশাক খাত (RMG) প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও এই খাত মূলত স্বল্পদক্ষ শ্রমিকদের জন্য উপযোগী। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত চাকরির সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: পথ দেখাচ্ছে সফল দেশগুলো
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়—সঠিক নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পায়নের সমন্বয় কর্মসংস্থানের চিত্র বদলে দিতে পারে—
দক্ষিণ কোরিয়া: শিক্ষা ও শিল্পের সরাসরি সংযোগ, কারিগরি প্রশিক্ষণে জোর
তাইওয়ান: SME খাতে ৯৭% প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থানের ৮০%
থাইল্যান্ড: কৃষি, পর্যটন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ভারসাম্য
চীন: গ্রামভিত্তিক শিল্প ও ক্ষুদ্র উৎপাদনে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান
বৈদেশিক কর্মসংস্থান: সম্ভাবনার বড় ক্ষেত্র
বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত, যারা বছরে ২০–২৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রস্তাবিত উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে—
আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ
ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন (ইংরেজি, আরবি, কোরিয়ান, জাপানিজ)
job-ready কর্মী তৈরি
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি
সমাধানের রূপরেখা: এখনই সময় বাস্তব পদক্ষেপের
শিক্ষা সংস্কার:
মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে সরে এসে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা
মানসিকতার পরিবর্তন:
চাকরিনির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহ প্রদান
শিক্ষাজীবনে প্রস্তুতি:
ইন্টার্নশিপ, পার্ট-টাইম কাজ ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম চালু
গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ:
কৃষি, কুটির শিল্প ও উৎপাদনমুখী গ্রামীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণ
SME ও শিল্পায়ন:
স্বল্প পুঁজিতে শিল্প স্থাপন, রপ্তানিমুখী উৎপাদন বৃদ্ধি
সরকারের ভূমিকা:
স্বল্প সুদের ঋণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাজারজাত সহায়তা ও শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ
অতীতের উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ
শহীদ রাষ্ট্রপতি Ziaur Rahman গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্বনির্ভরতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের পথ সুগম করেছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী Khaleda Zia কারিগরি শিক্ষা ও নারী শিক্ষার প্রসারে জোর দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিজ্ঞতাকে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করেই টেকসই কর্মসংস্থানের নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের বেকারত্ব সংকট কোনো একক কারণে নয়—এটি শিক্ষা, দক্ষতা, নীতি ও মানসিকতার দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্যের ফল।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়—
“দক্ষতা + ক্ষুদ্র শিল্প + সঠিক নীতি + বৈদেশিক কর্মসংস্থান = টেকসই সমাধান”
সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে “কাউকে বেকার রাখা যাবে না”—এই লক্ষ্য আর স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হতে পারে।
লেখক: শামসুল আলম
(সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এপিএস ও সাবেক সচিব)





