স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

Sanchoy Biswas
মেজর মো. শাহরিয়ার হাসান, পিএসসি
প্রকাশিত: ৬:১০ অপরাহ্ন, ২২ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৭:৫০ অপরাহ্ন, ২২ এপ্রিল ২০২৬
মেজর মো. শাহরিয়ার হাসান, পিএসসি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেজর মো. শাহরিয়ার হাসান, পিএসসি। ছবিঃ সংগৃহীত

স্বাস্থ্য খাত একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনের মান বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বাংলাদেশে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন করছে।  একটি  ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়াতে, স্বাস্থ্যসেবা খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা, জরুরি চিকিৎসা সেবা এবং আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে সেনাবাহিনী স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত সরকারি, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী খাতের সমন্বয়ে গঠিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭২২ টি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে, যেখানে ৭২,০০০ শয্যা রয়েছে। এর বিপরীতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক সহ প্রায় ৬,০৪৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে ১২৬,৩৫৩ শয্যা আছে। এছাড়া বেসরকারি ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রগুলোও প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী পরিচালিত সিএমএইচ (Combined Military Hospital) ও অন্যান্য মডেল হাসপাতাল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অতিরিক্ত লাইন হিসেবে কাজ করছে।

আরও পড়ুন: গ্রামীণ হাট-বাজারের কথা

সেনাবাহিনীর পরিচালিত সিএমএইচগুলো কেবল সামরিক কর্মীদের জন্য নয়, সাধারণ রোগীরাও এখানে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, সেনাবাহিনীর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা বিভিন্ন অঞ্চলে ৫০,৮৩১ জনকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন, এবং ১৪,৬৪৭ জন গর্ভবতী মাতাকে বিশেষ স্বাস্থ্য সেবা দিয়েছেন। এ ছাড়া সেনাবাহিনী চালিত হাসপাতালগুলো অনেক দুর্গম এলাকায় সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে থাকে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সহায়তা। সেনাবাহিনী শুধু চিকিৎসা সেবা নয়, স্বাস্থ্য সচেতনতা, পুষ্টি, মা ও শিশু স্বাস্থ্য উন্নয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক স্বাস্থ্য কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে থাকে। বিশেষত বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প ও জরুরি স্বাস্থ্য সেবা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করছে। সেনাবাহিনী পরিচালিত বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্পগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য মানুষকে সাধারণ চিকিৎসা, ঔষধ, ও স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রদান করে থাকে। এর ফলে দুঃস্থ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীও চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে।

কোভিড-১৯ মহামারী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী “অপারেশন কোভিড শিল্ড”-এর আওতায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে সেনাবাহিনী শুধু টহল বা নিরাপত্তা দেয়নি, বরং কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা করেছিল। সেনাবাহিনী ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাজারের বেশি কোয়ারেন্টিন শয্যাসহ প্রয়োজনীয় স্থাপনা দিয়েছে।  সেনাবাহিনীর  প্রায় ৭০০০+ সদস্য সারাদেশে মাঠপর্যায়ে নেমে জনসাধারণের সেবা ও সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে, পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে অনেক এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অন্যান্য সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে টিকাদান কার্যক্রমে সহায়তা করেছে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনাতে ভূমিকা রেখেছে।

আরও পড়ুন: আমের শহর কেন রাজশাহী, স্বাদে গুণে দেশ সেরা

এছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিম্নোক্ত কার্যক্রমসমূহ পরিচালনা করছে:

প্রতিদিন দেশের ৬২টি জেলায় প্রায় ৬০০টি টহল পরিচালিত হয়েছে, যেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে প্রায় ৭,০০০-এর অধিক সেনাসদস্য এবং ১,১০০টি যানবাহন ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এভিয়েশন ইউনিট করোনা রোগী পরিবহনের জন্য “আইসোলেশন পড” উদ্ভাবন করেছিল এবং দুটি এমআই-১৭১ হেলিকপ্টারকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করেছিল। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন দল ও টহল ইউনিট দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসাধারণের ব্যবহৃত স্থাপনা জীবাণুমুক্তকরণ, গণসচেতনতা সৃষ্টি, চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা এবং ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আস্কোনা হাজ্জ ক্যাম্প, ব্র্যাক লার্নিং সেন্টার, দিয়াবাড়ি রাজউক প্রকল্প এবং বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সাভার)-এ প্রায় ৩,০০০ শয্যা বিশিষ্ট চারটি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছিল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগত প্রবাসী যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতকল্পে ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছিল। এছাড়াও, মোহাখালী ডিএনসিসি মার্কেটে ১,৫০০ শয্যা বিশিষ্ট একটি আইসোলেশন সেন্টার সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আগত যাত্রীদের জন্য যশোর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায়  কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছিল। জনগণের সহজ ও নিরাপদভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহের সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ‘এক মিনিটের বাজার’ স্থাপন করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর টহল দল দেশের বিভিন্ন স্থানে অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে মানবিক সহায়তা বিতরণ করেছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ক্যান্সার হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগীদের উন্নত সেবা প্রদান করা হয়। প্রতিবছর আনুমানিক ৮,০০০–১২,০০০ জন ক্যান্সার রোগী বহির্বিভাগ (OPD) সেবা গ্রহণ করে। প্রায় ৩,০০০–৫,০০০ জন রোগী নিয়মিত কেমোথেরাপি গ্রহণ করে।  বছরে গড়ে ১,০০০+ ক্যান্সার সার্জারি সম্পন্ন করা হয়।  উন্নত রেডিওথেরাপি সুবিধা দ্বারা প্রতিদিন বহু রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করছে।  সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি বেসামরিক রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য (প্রায় ৬০–৭০%)।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বার্ন ইউনিট গুরুতর দগ্ধ রোগীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র। বছরে প্রায় ১,৫০০–২,৫০০ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করে।  এর মধ্যে প্রায় ৩০–৪০% গুরুতর বার্ন কেস, যাদের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়।  বছরে গড়ে ৫০০+ স্কিন গ্রাফটিং অপারেশন সম্পন্ন করা হয়।  জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ২৪/৭ ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম সক্রিয় থাকে।  অগ্নিকাণ্ড বা শিল্প দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসায় এই ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আর্মড ফোর্সেস ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি (AFIP) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, যা দেশের রোগ নির্ণয়, গবেষণা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এএফআইপি- এ অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধার মাধ্যমে বিভিন্ন জটিল রোগ যেমন ক্যান্সার, সংক্রামক রোগ এবং জেনেটিক সমস্যার সঠিক ও দ্রুত নির্ণয় করা হয়। হিস্টোপ্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, হেমাটোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি ইত্যাদি বিভাগে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এএফআইপি বিভিন্ন মেডিকেল অফিসার, প্যাথলজিস্ট ও টেকনোলজিস্টদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এখানে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ও বিশেষায়িত কোর্সের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা হয়। এএফআইপি শুধু সেনাবাহিনীর সদস্যদের নয়, বেসামরিক জনগণকেও উন্নত মানের ডায়াগনস্টিক সেবা প্রদান করে। ফলে দেশের সাধারণ মানুষও আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছেোর

চিকিৎসা ক্ষেত্রে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একদল উৎসাহী ও নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, চিকিৎসা শিক্ষার বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ  এর একাডেমিক কার্যক্রম ২০ জুন ১৯৯৯ সালে ৫৬ জন মেডিকেল ক্যাডেট নিয়ে শুরু হয়। কলেজটি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালস এর সাথে অনুমোদিত এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল দ্বারা স্বীকৃত। উল্লেখযোগ্যভাবে, আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল থেকে প্রতি বছর প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী মেডিকেল স্নাতকের সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যমে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছে। বাংলাদেশে বেসরকারি এবং সরকারি সহ প্রায় ৮৩টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। প্রতি বছর মোটামুটি (৮৩ x ১৫০) ১২,৪৫০ জন মেডিকেল স্নাতক পাস করে। অন্যদিকে, এএফএমসি  এবং সারা দেশে অন্য পাঁচটি সেনা মেডিকেল কলেজ থেকেও প্রতি বছর প্রায় ৪০০ জন যোগ্য ডাক্তার তৈরি করছে। অতএব, গাণিতিকভাবে বলতে গেলে, প্রতি বছর প্রায় ৩% ডাক্তার সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর্মড ফোর্সেস নার্সিং সার্ভিস  এর মাধ্যমে নার্স নিয়োগ করে। সাধারণত প্রতি ব্যাচে প্রায় ৪০–৮০ জনের মতো নার্স, নার্সিং অফিসার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। এছাড়াও আর্মি নার্সিং কলেজ রংপুর  নার্সিংয়ে বিএসসি (বিএসসি ইন নার্সিং ) কোর্স পরিচালনা করে। আর্মি মেডিকেল কোর সেন্টার অ্যান্ড স্কুল মেডিকেল ক্ষেত্রে সৈনিকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে, যেখানে মেডিকেল টেকনোলজি (DMT) এবং হেলথ টেকনোলজি (DHT)-এর ডিপ্লোমা কোর্স অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একটি প্রশিক্ষণ ব্যাচে বিভিন্ন মেডিকেল সহকারী ও টেকনিশিয়ান পদে ৮০০-এরও বেশি নারী সৈনিক অংশগ্রহণ করেছিল।

এছারাও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষা বাহিনী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে বেসামরিক জনগণের চিকিৎসাসেবা প্রদান করছে। কুয়েত ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় চিকিৎসক দল ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক মানবিক সহযোগিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে

তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। প্রথমত, জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসা সুবিধা এখনও সীমিত। সেনাবাহিনীর চিকিৎসা সেবা মূলত সামরিক সদস্যদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ায় সাধারণ জনগণের জন্য এর বিস্তৃতি অপ্রতুল। দ্বিতীয়ত, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ এবং যুগপুযগি রাখা ব্যয়বহুল, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, দক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তাদের ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে ভালো সুযোগ পাওয়ায় দক্ষ জনবল হারানোর ঝুঁকি থাকে। এছাড়া আরও অন্যান্য কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান, বর্তমানে সেনাবাহিনী দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য গবেষণা ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে কম সক্রিয়, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নেতৃত্ব দেয়। সেনাবাহিনী যদি গবেষনা-ভিত্তিক শাখা গড়ে তোলে তাহলে তা স্বাস্থ্য খাতকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পার্বত্য এলাকা বা উপকূলীয় অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় নিয়মিত চিকিৎসা সেবা প্রদান কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও সেনাবাহিনী এসব এলাকায় মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা করে, তবুও এটি স্থায়ী সমাওপ্রতু

সেনাবাহিনী পরিচালিত হাসপাতাল ও সেবা কেন্দ্রগুলো আরও কিছু প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে সাধারণ জনগণের নিকট পৌঁছানো যেতে পারে। সেনাবাহিনী বিভিন্ন জনসচেতনতা কর্মসূচি চালিয়ে দেশজুড়ে স্বাস্থ্যবিধি, টিকাদান, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে। সরকার ও সেনাবাহিনী যৌথ উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা, জনসচেতনতা, দুর্যোগ-পরিকল্পনা ইত্যাদি নেওয়া যেতে পারে, যাতে বিপর্যয় পরিস্থিতিতেও সেবা অব্যাহত থাকে। এছাড়াও সরকারি স্বাস্থ্য নীতি ও সামরিক স্বাস্থ্য সেবা-এর মধ্যে সমন্বয় উন্নত করা প্রয়োজন যাতে জনসাধারণের জন্য আরও কার্যকর সামাজিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা যায়। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিকিৎসা ক্ষেত্রে সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন টেলিমেডিসিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ডিজিটাল হেলথ সিস্টেম চালু করা হলে চিকিৎসা সেবার মান ও পরিসর আরও বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে দুর্গম এলাকাতেও সহজে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সেনাবাহিনী যদি বেসামরিক স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে একটি শক্তিশালী জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান শুধু প্রতিরক্ষা নয়; বরং এই প্রতিষ্ঠান মানবিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নেও পদক্ষেপ নিয়েছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী রোগীদের চিকিৎসা, কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা, চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রদানসহ জনসচেতনতা কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া বিভিন্ন বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প ও স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রোগ্রাম দরিদ্র ও অসহায়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের চিকিৎসা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। তাদের অবদান শুধু সামরিক পরিসীমায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই খাতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে। একটি সুস্থ, শক্তিশালী এবং টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সেনাবাহিনীর এই অবদান অপরিহার্য। যদিও সেনাবাহিনীর কাজের ক্ষেত্র সীমিত, তবুও দেশের চিকিৎসা খাতে এই প্রতিষ্ঠান এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।  বেসামরিক  চিকিৎসা খাতের সাথে সঠিক সমন্বয়, স্বাস্থ্য গবেষণা, শিক্ষা ও পরিষেবার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরো বেগবান করতে পারে।