৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে একমাত্র প্রতিষ্ঠান ‘প্রশিকা’, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজমে এখনও আক্রান্ত

Sanchoy Biswas
একে এম মহসিন
প্রকাশিত: ৯:৪৬ অপরাহ্ন, ০৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩৪ অপরাহ্ন, ০৮ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ড. কাজী ফারুক আহমেদ নিজ আদর্শে একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন এবং ২০০৮ সালে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজ দলের ১৫০ জন প্রার্থী নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যার ফলে ক্ষমতায় আসার পর সর্বপ্রথম ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের রোষানলের মুখে কবলিত ব্যক্তি ছিলেন স্বাভাবিকভাবেই ড. কাজী ফারুক আহমেদ এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রশিকা।

১৯৭৬ সালে ড. কাজী ফারুক আহমেদ প্রশিকা প্রতিষ্ঠা করেন। সূচনালগ্ন ১৯৭৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনিই প্রশিকার গভর্নিং বডি পরিচালনা করে এসেছেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অসংখ্য কর্মসূচির মাধ্যমে ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি দরিদ্র নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে প্রশিকা। ২০০০ সালের পূর্বে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ উন্নয়নমুখী বেসরকারি সংস্থা ছিল প্রশিকা। জন্মলগ্ন থেকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শুধুমাত্র ড. ফারুকের নেতৃত্বেই সফলতার শীর্ষে পৌঁছেছিল প্রশিকা।

আরও পড়ুন: খামেনি: যুগের প্রতীক এক বিশ্বনেতার বিদায়!

কিন্তু ২০০৯ সালে প্রশিকার প্রতিষ্ঠাতা ড. কাজী ফারুককে ষড়যন্ত্রমূলক, জোরপূর্বক ও নিয়মবহির্ভূতভাবে অপসারণের মাধ্যমে এই রীতির পরিবর্তন হয়। ড. কাজী ফারুকের ব্যক্তিগত আইনজীবী ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আওয়ামী-সমর্থিত প্যানেলের নেতা এম. এ. ওয়াদুদকে চেয়ারম্যান দেখিয়ে প্রশিকার একটি নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়, যা আইনিভাবে ছিল ভিত্তিহীন। এম. এ. ওয়াদুদ শুধুমাত্র চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত আইনজীবী ছিলেন; প্রশিকার জন্মলগ্ন থেকে কোনো পরিচালনা পর্ষদে বা কোনো কর্মকাণ্ডে তিনি সংযুক্ত ছিলেন না।

এম. এ. ওয়াদুদের আকস্মিক মৃত্যুর পর হঠাৎ চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১০ সালে আবির্ভূত হন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের একজন দাপুটে উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমামের আত্মীয় (ভায়রা ভাই) এম. এ. মোয়াজ্জেম হোসেন। জন্মলগ্ন থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনিও প্রশিকার কোনো পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন না। এমনকি প্রশিকার কোনো ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন না। তৎকালীন ঢাকা মহানগর যুবলীগের সভাপতি এবং পরবর্তী সময়ে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মইনুল হোসেন খান নিখিল ও স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের ঢাকা-১৬ আসনের স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দীন মোল্লার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় প্রশিকা ভবনের দখল টিকিয়ে রাখা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: ঢাকা-ওয়াশিংটন-বেইজিং-আঙ্কারা অক্ষ এবং দিল্লির কৌশলগত বাধ্যবাধকতা

মোয়াজ্জেম হোসেন চেয়ারম্যান হিসেবে আসার পর প্রশিকার কর্মসূচিগুলোর ব্যাপ্তি ও উন্নয়নের পরিবর্তে ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশিকার শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি ও জমি একের পর এক নামমাত্র মূল্যে বিক্রি শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার আলাউদ্দিন চৌধুরী।

একটানা সাত বছর প্রশিকার প্রথম ধাপের লুটপাটের পর ২০১৮ সালে প্রশিকার আরেক চেয়ারম্যান রোকেয়া ইসলামের আগমন হয়। নিজেকে একজন কবি হিসেবে পরিচয় দিলেও মূলত সাবেক মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও এমপি সাফিয়া খাতুনের বাল্যবন্ধু এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সান্নিধ্য ও সখ্যতার কারণেই তিনি প্রশিকার চেয়ারম্যান হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। অপরদিকে প্রশিকার কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভবনের দখল টিকিয়ে রাখতেন সেই দুটি চরিত্র—ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস উদ্দীন মোল্লা ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নিখিল।

সম্প্রতি প্রশিকাকে ঘিরে প্রকাশিত কিছু সংবাদ এবং স্বনামধন্য একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত তদন্তমূলক ভিডিও প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক দুর্নীতি, অনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োগ এবং নেতৃত্বের অবৈধতা নিয়ে গুরুতর কিছু অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

আদালতের রায় অমান্য করে প্রশিকাকে এখনও যারা অবৈধভাবে ভোগদখল করছে, ৫ আগস্টের পূর্বে তাঁদের অবস্থান ছাত্র ও গণআন্দোলনের বিপক্ষে ছিল। ৫ আগস্টের পূর্বে প্রশিকার বর্তমান অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সিইও সারা বাংলাদেশে প্রশিকার সকল সদস্যকে আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জুলাই মাসের ২৯ তারিখ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন প্রশিকার সিইও সিরাজুল ইসলাম, পরিচালক কামরুল হাসান কামাল, পরিচালক আব্দুল হাকিম, পরিচালক শেখ শাহীদ, পরিচালক মিজানুর রহমান খানসহ প্রশিকার নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তারা ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস মোল্লা ও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মইনুল হোসেন নিখিলের গাড়িবহরে উপস্থিত থেকে সরাসরি ছাত্র নিধনে ব্যস্ত ছিলেন।

ছাত্র হত্যাকাণ্ডে সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার কারণে সম্প্রতি প্রশিকার পরিচালক শেখ শাহীদকে গ্রেপ্তার করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। প্রশিকার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন।

সম্প্রতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এনজিও নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তর—এমআরএ (মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি)—প্রশিকার চলমান দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করেছে।

বর্তমান দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান রোকেয়া ইসলামের বিরুদ্ধে বছরে আপ্যায়ন খাতে ৯৭ লাখ টাকা এবং সাংস্কৃতিক খাতে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ের কারণ জানতে চেয়ে কোনো উত্তর না পেয়ে এমআরএ দুদককে অবগত করে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রোকেয়া ইসলামের অধীনস্থ সিইও সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৮১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের সত্যতা মিলেছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আদালতের রায় প্রাপ্তির পরও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না, ফলে প্রতিষ্ঠানটির সুশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত। প্রশিকার অবশিষ্ট সম্পদ ও বন্ধ থাকা কার্যক্রমগুলো চালু করতে অবিলম্বে আদালতের রায় বাস্তবায়ন এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সব অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনের জন্য তিনি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান।