জীবনঝুঁকিতে চাকরি ছেড়ে রাস্তায় নামি

ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন জানানো অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামানকে এবার চাকুরিচ্যুত করা হচ্ছে

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:২৪ অপরাহ্ন, ০৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩৪ অপরাহ্ন, ০৮ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন পুলিশের বর্বর গুলিতে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করা পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান টুকুকে এবার চাকুরিচ্যুত করা হচ্ছে। একসময়ের আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও ছাত্র আন্দোলনের সমর্থন জানিয়ে পদত্যাগ করে রাজপথে এসে আন্দোলনের সমর্থন জানানোর পরেও তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত পরবর্তীতে চাকুরিচ্যুত  করার প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  শুধু  আড়াই লাখ পুলিশ বাহিনী নয় সরকারি কর্মকর্তাদের  মধ্যে তিনিই প্রথম  একজন অতিরিক্ত ডিআইজি, আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান ও ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ নেতা হওয়া সত্ত্বেও বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করে গণমাধ্যমে ছাত্র-জনতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে রাজপথে নেমে আসেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলন সমর্থন ও পদত্যাগের ঘোষণার পর সিনিয়র কর্মকর্তারা তাকে গ্রেফতারের হুমকি-ধমকি দিলেও তিনি পুলিশের অনৈতিক ও বেআইনি কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করে রাজপথে থাকেন। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পালিয়ে যাওয়ার পরেও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তিনি কোন প্রকার সুযোগ সুবিধা নিতে চেষ্টা করেননি। তিনি স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি আবেদন করেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার তার আবেদন গ্রহণ না করে গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর  পলাতক দেখিয়ে বরখাস্ত করে। পরবর্তীতে  স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবরে তিনি আবেদন করলে আবারও চাকরিতে পুনর্বহাল করে টুরিস্ট পুলিশে পদায়ন করা হয়।  

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুল আউয়াল কমিশন  অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান টুকুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেন। সে মোতাবেক তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব বর্তমানে কারা অন্তরীণ জাহাঙ্গীর হোসেন  অতিরিক্ত ডিআইজি টুকুর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া করেন।  এরই মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন হলে এই ফাইলকে আর মিস করতে হয়নি।  পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব আব্দুল মোমেন ওই অভিযোগটি আমলে নিয়ে নতুন করে কার্যকর করার পদক্ষেপ নেন। পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন  হস্তক্ষেপে বিষয়টি থেমে যায়। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতা আসার পর নতুন আমলাতন্ত্র আবার বিষয়টিকে সামনে এনে অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামানকে চাকুরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ২০১৮ এর ২ খ বিধি মোতাবেক অসদাচরণ এর দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই বিধিমালার ৪(৩) এর উপবিধি ঘ অনুসারে চাকুরী হতে বহিষ্কারের  সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেকোনো সময় তাকে বাধ্যতামূলক অবসর অথবা গুরুদণ্ড দিয়ে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। 

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালীন পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ঠুরভাবে গুলিবর্ষণ করে গণহত্যা চালানোর প্রতিবাদে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একমাত্র মনিরুজ্জামান টুকুই জাতীয় সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে এর প্রতিবাদ করেন। ১ আগস্ট ২০২৪ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ এক প্রতিবেদন লিখে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলে নতুন নেতৃত্বে পুলিশ আবার ঘুরে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন: খুলনা রেঞ্জের নতুন ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমানের যোগদান

নতুন সরকার গঠনের পর অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান ১১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবরের স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের জন্য আবেদন করেন। আবেদনপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, পবিত্র কোরআনের জ্ঞান ও ন্যায়-অন্যায় বুঝতে পারার কারণে এই পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করা তার পক্ষে আর সমীচীন নয়, বিধায় তিনি অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ বিগত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের অবৈধ আদেশ ও অবৈধ সরকারকে সহায়তা করতে গিয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হিংস্র বর্বরাদেশে শিশু-কিশোর ছাত্র হত্যার প্রেক্ষিতে পুলিশ একটি ঘৃণিত বাহিনীতে পরিণত হয় ।

অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান টুকু বাংলাবাজার পত্রিকাকে জানান, তিনি চাকুরীতে সবসময় সততা, নিষ্ঠা ও আইন অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি লক্ষ্মীপুরে এসপি থাকাকালীন তৎকালীন বিরোধী দলীয় জামাত-বিএনপি নেতৃবৃন্দের হত্যাকাণ্ডেরও প্রতিবাদ করেছেন এবং এই জন্যই তাকে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার থেকে সরকার প্রত্যাহার করেছিল। আওয়ামী লীগ সরকার তাকে দীর্ঘদিন বরখাস্ত ও ওএসডি ও সর্বশেষ টুরিস্ট পুলিশে বদলি করে রেখেছিল। টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবেই পুলিশের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে চাকরি ছেড়ে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে নেমেছিলেন।

 তিনি বলেন, “আমি কিছু পাওয়ার জন্য ছাত্র আন্দোলনের সমর্থন করিনি এবং এখনো এর জন্য কোনো সুবিধা নিতে চাই না। নৈতিকতার কারণে ও আওয়ামী লীগের জঘন্য কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছি।

আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান টুকু ২০ ব্যাচের বিসিএস কর্মকর্তা। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। তার পিতা স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার ছোট ভাই শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার পিতা উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করা মনিরুজ্জামান টুকু ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাকে মুজিববাদী টুকু হিসেবে চিনতো। 

চাকরিতে যোগদানের পর তাকে ২০০১ সালে চাকরিচ্যুত করা হয়। এক এগারোর পর চাকরিতে যোগদান করলেও আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম দিকে ভালোভাবে চাকরি করেন। পরবর্তীতে তিনি ধর্মীয় গবেষণায় নিয়োজিত হয়ে পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ তাফসীরসহ ধর্মীয় কয়েকটি বই প্রকাশনা করেন। ট্রাফিক বিভাগে ঢাকা মেট্রোপলিটনের চাকরিকালীন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উপরে একটি বই লিখে প্রশংসিত হন।