উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয়, মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল
- ১৫৯ প্রকল্পে ভৌত অগ্রগতি শূন্য
- ২৯ প্রকল্প অসমাপ্ত অবস্থায় বন্ধ
- হস্তান্তর জটিলতায় অচল পানি শোধনাগার
- পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতে ঘাটতি
উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কোথাও অবকাঠামোও নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু সেই বিনিয়োগের সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তার হিসাব সব সময় স্পষ্ট নয়। কোনো প্রকল্পে বরাদ্দ থাকার পরও কাজ এগোয় না, কোনোটি বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর অসমাপ্ত অবস্থায় বন্ধ হয়ে যায়, আবার কোথাও নির্মাণ শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট সেবা চালু হয় না। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের হিসাব থাকলেও জনসেবায় তার বাস্তব প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সংশোধিত বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। এ সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, বিপরীতে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ, ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। অর্থবছরের শেষ মাস জুনেই ব্যয় হয়েছে সংশোধিত বরাদ্দের ১৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। এই চিত্র প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, পরিকল্পনা এবং অর্থবছরজুড়ে কাজের অগ্রগতি নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
আরও পড়ুন: কওমি মাদরাসার আদর্শিক সংকট ও উত্তরণের পথ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও বাস্তবায়নের গতি আশাব্যঞ্জক নয়। আইএমইডির প্রকাশিত জুলাই-আগস্টের হিসাবে, এ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তবে অর্থবছরের শুরুর দুই মাসের বাস্তবায়ন হার দিয়ে পুরো বছরের ফলাফল নির্ধারণ করা যায় না; এটি কেবল শুরুর দিকের ধীরগতির একটি নির্দেশক।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতার আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপি পর্যালোচনায়। আইএমইডির প্রতিবেদনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ১৫৯টি প্রকল্পে কোনো ভৌত অগ্রগতি হয়নি। এসব প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৩৮৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে কিছু প্রকল্পে বাস্তব কাজ না এগোলেও কর্মীদের বেতন ও দাপ্তরিক ব্যয় হয়েছে। একই অর্থবছরে ১ হাজার ১১টি প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ছিল ২৫ শতাংশের কম। আগের অর্থবছরে কোনো ভৌত অগ্রগতি না হওয়া প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ২১১। অর্থাৎ সংখ্যাটি কমলেও কাজ না এগোনো প্রকল্পের সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি।
আরও পড়ুন: প্রাচীন পুরাণ থেকে আধুনিক মানুষের অন্তর্জগৎ: নোবেলজয়ী কবি অ্যান কারসনের সাহিত্যদর্শন
একই অর্থবছরে ১২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন ২৯টি প্রকল্প অসমাপ্ত অবস্থায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এসব প্রকল্পের মোট অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা; বন্ধ হওয়ার আগে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। তালিকায় ছিল ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাকাশ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের মতো উদ্যোগ। মহাকাশ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র প্রকল্পে প্রায় ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ের পর সেটি বন্ধ করা হয়। আর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৭৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে দুর্বল সমীক্ষা, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, নকশা ও ব্যয়সংক্রান্ত সমস্যা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। তবে এসব প্রকল্পে ব্যয় হওয়া পুরো অর্থকে সরাসরি অপচয় বলা যাবে না; প্রকল্পভেদে কী কাজ হয়েছে, তার ব্যবহারযোগ্যতা কতটুকু এবং কী কারণে প্রকল্প বন্ধ হলো-এসব মূল্যায়ন করে আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করতে হবে। মূল প্রশ্ন হলো, প্রকল্প অনুমোদনের আগে যেসব ঝুঁকি যাচাই করার কথা, সেগুলো পরে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ালে পরিকল্পনা ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে।
সমস্যাটি শুধু কাগজে-কলমে থাকা প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার হাতলক্ষ্মীগঞ্জে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি পানি শোধনাগার ২০২৩ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও চালু হয়নি। প্রকল্পটির পরিকল্পনা ছিল ধলেশ্বরী নদী থেকে পানি নিয়ে ঘণ্টায় ৩ লাখ ৫০ হাজার লিটার শোধন করে সরবরাহ করা। কিন্তু স্থাপনা হস্তান্তর, নির্মাণকাজের মান এবং পানির উৎস নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, কিছু ত্রুটি সংশোধন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন না হওয়ায় তারা স্থাপনাটি বুঝে নেয়নি। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বক্তব্য, চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়েছে এবং পৌরসভা প্রস্তুত হলেই হস্তান্তর করা যাবে। ফলে প্রায় তিন বছর আগে নির্মাণ শেষ হওয়া স্থাপনাটি কার্যকর সেবা দিতে পারছে না; এর মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ পানির প্রত্যাশাও অপূর্ণ রয়েছে।
পাবনার সাঁথিয়া পৌরসভায়ও একই ধরনের সংকট দেখা গেছে। ৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগারটি ২০২১ সালে পৌরসভার কাছে হস্তান্তরের পর পরীক্ষামূলকভাবে কিছুদিন চালু থাকলেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। পৌরসভার কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থাপনাটির দৈনিক পানি শোধনের সক্ষমতা আড়াই লাখ লিটার, অথচ প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের পৌর এলাকায় দৈনিক চাহিদা সাড়ে আট থেকে নয় লাখ লিটার। শোধনাগার চালাতে মাসে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিকল্প গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা তুলনামূলক সাশ্রয়ী; তবে সেই ব্যবস্থায় প্রায় ১ হাজার ১৫০টি পরিবার বা আনুমানিক ৬ হাজার মানুষ পানি পাচ্ছেন। ফলে স্থাপনার সক্ষমতা, পরিচালন ব্যয় ও স্থানীয় চাহিদার মধ্যে পরিকল্পনাগত অসামঞ্জস্যের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ঢাকার দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারেও সক্ষমতার পুরো ব্যবহার হচ্ছে না। আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, স্থাপনাটির দৈনিক শোধনক্ষমতা ৫০ কোটি লিটার হলেও শুষ্ক মৌসুমে সেখানে শোধন করা হয় প্রায় ২৮ কোটি লিটার। নির্ধারিত এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক অসম্পূর্ণ থাকায় পর্যাপ্ত বর্জ্যপানি শোধনাগারে পৌঁছাচ্ছে না। বর্ষায় প্রবাহ বাড়লেও তার বড় অংশ বৃষ্টির পানি। অর্থাৎ, একটি বড় স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি সেটিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না।
এই উদাহরণগুলো থেকে উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু বরাদ্দ, ব্যয় বা নির্মাণ শেষ হওয়ার হিসাবের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বাস্তব চাহিদা, পানির উৎস, সংযোগ অবকাঠামো, পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যথাযথভাবে বিবেচনা করতে হবে। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর স্থাপনা হস্তান্তর ও সেবা চালুর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কাজ না হওয়া প্রকল্প, অসমাপ্ত অবস্থায় বন্ধ প্রকল্প এবং নির্মিত হয়েও অব্যবহৃত স্থাপনার জন্য আলাদা করে তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। এতে কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কী ফল পাওয়া গেছে, কেন কাজ আটকে আছে এবং কার দায়িত্বে সমাধান ঝুলে আছে- তা নাগরিকদের সামনে স্পষ্ট হবে। যেসব প্রকল্পে গুরুতর পরিকল্পনাগত বা বাস্তবায়নগত ব্যর্থতা পাওয়া যাবে, সেগুলোর স্বাধীন মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন ব্যয়ের প্রকৃত সাফল্য শুধু অর্থ ছাড় বা অবকাঠামো নির্মাণে নয়; সেই বিনিয়োগে মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো, নিরাপদ পানি বা প্রয়োজনীয় সেবা কতজন পেলেন এবং রাষ্ট্রের অর্থ কতটা কার্যকর কাজে লাগল-তার ওপরই নির্ভর করে। প্রকল্পের হিসাবের সঙ্গে জনসেবার হিসাবও প্রকাশ্য না হলে উন্নয়নের সাফল্য পরিমাপ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।





