আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন: ক্ষমতার পালাবদল নয়, গণতন্ত্রের জবাবদিহির পরীক্ষা

Sadek Ali
কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশিত: ১০:১৯ পূর্বাহ্ন, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:১৯ পূর্বাহ্ন, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি ও সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা। ৩ নভেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Elections) তাই শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর আসনসংখ্যার লড়াই নয়; এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের প্রতি মার্কিন জনগণের মূল্যায়ন এবং দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়েরও এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের (House of Representatives) ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও আইনসভায়ও নির্বাচন হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ নির্বাচন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের নীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর এক ধরনের মধ্যবর্তী গণরায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও পড়ুন: কবিতা ও প্রকাশ

এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেছে। ফলে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপরীতে আইন প্রণয়নকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান কংগ্রেসের উভয় কক্ষই বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিভাষায় এ অবস্থাকে বলা হয় ‘Divided Government’ বা বিভক্ত সরকারব্যবস্থা। সাধারণভাবে প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিরোধী দল একটি অথবা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। তবে এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করায় ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে। নতুন কংগ্রেসের মেয়াদ শুরু হবে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে।

নির্বাচনের ফলাফলে জনগণের অর্থনৈতিক উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, শুল্কনীতি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। মার্কিন রাজনীতিতে বিল ক্লিনটনের ১৯৯২ সালের নির্বাচনী স্লোগান—“It’s the economy, stupid”—আজও ভোটারদের অগ্রাধিকার বোঝার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। অর্থনীতির প্রশ্নে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা যে নির্বাচনী ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে, এবারের নির্বাচনও তার প্রমাণ।

আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য

ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে শুধু ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব নয়, বরং মধ্যপন্থী, প্রগতিশীল ও স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন অর্জনের কৌশলও ভূমিকা রেখেছে। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত কিছু এলাকায় ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি রাজনৈতিক মানচিত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে নির্বাচনী বিজয় ধরে রাখা এবং কার্যকর শাসন পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। ডেমোক্র্যাটদের এখন কেবল বিরোধিতা নয়, বিকল্প নীতি, বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও দায়িত্বশীল আইন প্রণয়নের সক্ষমতাও প্রমাণ করতে হবে। দলটির মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল অংশের মতপার্থক্য দূর করে ঐক্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। Chatham House-এর আলোচনায় ‘Big Tent Strategy’ বা বিস্তৃত রাজনৈতিক জোটের ধারণা এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের জন্য এ ফলাফলকে কেবল পরাজয় হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক আত্মসমীক্ষা ও ভবিষ্যৎ কৌশল পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে দলটি গত এক দশকে মার্কিন রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। নিজস্ব সমর্থকদের আস্থা বজায় রাখার পাশাপাশি মধ্যপন্থী ও স্বতন্ত্র ভোটারদের প্রত্যাশাও বিবেচনায় নিতে হবে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দলটির নেতৃত্ব, নীতি ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বিভক্ত সরকারব্যবস্থা নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের সময়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষই ছিল রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। আবার ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষাংশে প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সিনেট ছিল রিপাবলিকানদের হাতে। এসব উদাহরণ দেখায়, বিভক্ত সরকারব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাস্তবতা।

এ ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম জেমস ম্যাডিসন ‘The Federalist Papers’-এর ৫১ নম্বর প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “Ambition must be made to counteract ambition”—অর্থাৎ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাকে দিয়েই ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। একই প্রবন্ধে তাঁর আরেকটি বিখ্যাত উক্তি, “If men were angels, no government would be necessary”—মানুষ যদি ফেরেশতা হতো, তাহলে সরকারের প্রয়োজনই হতো না। এ বক্তব্যের মধ্যেই ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের দর্শন নিহিত রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ লাভ করায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল স্পিকার নির্বাচন, কমিটির নেতৃত্ব, শুনানি ও তদন্তের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের পাশাপাশি নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে সরকারি ব্যয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিতর্কিত নীতির বিষয়ে হোয়াইট হাউসকে কংগ্রেসের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তবে এর অর্থ প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বিলুপ্ত হওয়া নয়। তাঁর হাতে নির্বাহী আদেশ, ভেটো এবং পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করতেও কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। ফলে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে সহযোগিতা, দর-কষাকষি ও মতবিরোধ—সবই দেখা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এ নির্বাচনের প্রভাব পড়তে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান, মধ্যপ্রাচ্য, ন্যাটো, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থান ও নজরদারি নতুন গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে সামরিক ব্যয়, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রশ্নে কংগ্রেসের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি শুধু প্রেসিডেন্ট বা কংগ্রেসের একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না; জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও কূটনৈতিক বাস্তবতাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই নির্বাচনের ফলাফলে তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক পররাষ্ট্রনীতিগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশের জন্যও এ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার ও কূটনৈতিক অংশীদার। তৈরি পোশাক রপ্তানি, শুল্কনীতি, শ্রম অধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রোহিঙ্গা সংকট এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে দেশটির নীতি বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে এসব বিষয়ে আলোচনা, শুনানি ও নীতিগত তৎপরতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কোনো দলের জয়-পরাজয়ের দৃষ্টিতে না দেখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী কূটনীতিই হওয়া উচিত আমাদের নীতি।

আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের বিখ্যাত উক্তি—“Government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth”—গণতন্ত্রের মূল দর্শনকে ধারণ করে। জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত সরকার—এই আদর্শ তখনই অর্থবহ হয়, যখন ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় রাখার মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো একক নেতা বা দলের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বে নয়; বরং সংবিধান, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের সম্মিলিত নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন করে না, প্রয়োজনে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার সীমাও স্মরণ করিয়ে দেয়। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, শক্তি ও স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি।

কাজী জিয়া উদ্দিন, কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি