সাবহেড শূন্যরেখায় আটকে নারী-শিশু, বাড়ছে কূটনৈতিক চাপ
সীমান্তজুড়ে বিএসএফের ধারাবাহিক পুশ-ইন তৎপরতা, একের পর এক প্রতিরোধে বিজিবি
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নতুন করে পুশ-ইনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। কুড়িগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা, লালমনিরহাট ও কুষ্টিয়া সীমান্তে গত কয়েক দিনে নারী-শিশুসহ শতাধিক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার একাধিক চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর বিরুদ্ধে। বিজিবির কঠোর অবস্থান, স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিরোধ এবং পতাকা বৈঠকের পরও কয়েকটি স্থানে অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ছয়জন ব্যক্তি ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। সীমান্ত পরিস্থিতির এই নতুন বাস্তবতা শুধু মানবিক সংকটই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কূটনৈতিক সমন্বয় নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সম্প্রতি দিল্লিতে বিএসএফ ও বিজেপি বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে দ্বিপাক্ষিক কোন সমাধান হয়নি।
আরও পড়ুন: সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে: দুদক
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সম্প্রতি পুশ-ইন ইস্যুকে কেন্দ্র করে একের পর এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএসএফ বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশি বলে দাবি করা কিংবা পরিচয় যাচাইবিহীন ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালিয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজিবির সক্রিয় প্রতিরোধ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক অবস্থানের কারণে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তে। গত রোববার ভোরে আন্তর্জাতিক ১০৬০ নম্বর প্রধান সীমান্ত পিলারের ১ নম্বর সাব-পিলার এলাকা দিয়ে এক নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের বাধা এবং বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। এরপর থেকে তারা আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছে।
আরও পড়ুন: সীমান্তে নতুন চাল বিএসএফের, ১২৫ জনকে জড়ো করায় সতর্ক বিজিবি
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, খোলা আকাশের নিচে অবস্থানরত ওই ছয়জনের মধ্যে দুই শিশু ও একজন নারী রয়েছেন। মানবিক কারণে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা তাদের খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করলেও দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকায় তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বাসিন্দা দাবি করলেও তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই হয়নি।
ঘটনার পর বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজিবি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। ফলে বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সমাধান হয়নি।
এদিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-জয়নগর সীমান্তেও একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রথমে ১১ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা এবং পরে আরও ১২৫ জনকে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় জড়ো করে রাখার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্তে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়।
চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, গত ৩০ ঘণ্টায় নতুন করে কোনো পুশ-ইনের চেষ্টা শনাক্ত হয়নি। তবে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১১৩ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে থাকা বিএসএফের ৭৮টি গেট এবং সম্ভাব্য প্রবেশপথে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা পুশ-ইন ঘটতে না পারে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার কালীরহাট সীমান্তেও রবিবার রাতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিএসএফ সীমান্তের ফ্লাডলাইট বন্ধ করে কয়েকজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। তবে বিজিবি সদস্য ও স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক অবস্থানের কারণে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একপর্যায়ে সীমান্ত এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। যদিও বিজিবি কেবল পুশ-ইনের চেষ্টার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফজলে মুনীম জানান, বিজিবির সক্রিয় অবস্থানের কারণে কোনো পুশ-ইন সফল হয়নি এবং সীমান্তে নজরদারি আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তেও কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। নারী-শিশুসহ ১২ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা নিয়ে সেখানে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একাধিক দফা যোগাযোগ ও পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিজিবির কঠোর অবস্থান এবং স্থানীয় সীমান্তবাসীর প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের নিয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের ভেতরে সরে যায় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি মিল রয়েছে—প্রায় সব ক্ষেত্রেই পরিচয় যাচাই ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সীমান্তে লোকজনকে নিয়ে আসা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হন, তবে প্রচলিত কনস্যুলার ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু সীমান্তে সরাসরি ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার স্বীকৃত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে ধারাবাহিকভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া শুধু আইনশৃঙ্খলা বা সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি মানবিক ও কূটনৈতিক—উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিচয় যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে সীমান্তে ফেলে রাখা যেমন মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করে, তেমনি দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
এদিকে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন স্থানে গ্রামবাসীরা বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছেন। অনেক এলাকায় রাতভর পাহারা দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
বিজিবি সূত্র বলছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্তে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের পুশ-ইন প্রতিরোধে সব ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সীমান্তজুড়ে টানা কয়েক দিনের এই ঘটনাপ্রবাহে আপাতত বড় ধরনের কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেনি। তবে রৌমারীর শূন্যরেখায় এখনও নারী-শিশুসহ ছয়জনের অবস্থান, দর্শনা সীমান্তে শতাধিক ব্যক্তিকে জড়ো করার ঘটনা এবং বিভিন্ন সীমান্তে ধারাবাহিক পুশ-ইনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দ্রুত কূটনৈতিক যোগাযোগ ও যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ সংকটের টেকসই সমাধান না হলে সীমান্তে মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ আরও বাড়তে পারে।





