এসিড সংকট প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান BSAMA
দেশীয় শিল্প রক্ষার্থে ভারতীয় নিম্নমানের এসিড আমদানি বন্ধ অপরিহার্য
বাংলাদেশ সালফিউরিক এসিড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSAMA) ‘Supply woes deepen sulphuric acid crisis’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, ওই প্রতিবেদনটি একপাক্ষিক, বিভ্রান্তিকর এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই প্রকাশ করা হয়েছে।
BSAMA স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দেশে কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়নি। তাদের মতে, সালফিউরিক এসিড উৎপাদন একটি নিরবচ্ছিন্ন শিল্প প্রক্রিয়া, যেখানে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করলে উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং কারখানাগুলো বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পড়বে।
আরও পড়ুন: পাঁচ মাসে ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল রেমিট্যান্স
অ্যাসোসিয়েশন দাবি করেছে, বাংলাদেশ ১০০% সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত সালফারের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, শিপিং জটিলতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের চাপের কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশে মোটামুটি সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
তবে BSAMA সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে নিম্নমানের সালফিউরিক এসিড আমদানির বিষয়টিকে। তাদের অভিযোগ, বিশেষ করে ভারত থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে নিম্নমানের এসিড আমদানি দেশীয় শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
আরও পড়ুন: এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণ, সন্ধ্যা থেকে কার্যকর
আমরা The Financial Express কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টটিতে জোর প্রতিবাদ করছি, এবং এটি একপাক্ষিক রিপোর্ট, যার মাধ্যমে আমরা যারা বর্তমানে সালফিউরিক এসিডের ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে আছি তাদের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ না করে একতরফা তথ্য দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। যে কোম্পানি বর্তমানে উৎপাদনে নেই, অর্থাৎ যাদের টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে সাময়িকভাবে প্রোডাকশন করতে পারছে না, তাদের কথা ভিন্ন। টিএসপিএসএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব ইঞ্জি. সুখেন সেন সাহেবের বরাতে বলা হয়েছে যে চায়না এবং ইন্ডিয়াতে প্রাইস কম, কিন্তু প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, ইতিমধ্যে চীন ও ভারত তাদের দেশের সিকিউরিটি মেইনটেইন করার জন্য, অর্থাৎ তাদের দেশের ফার্টিলাইজার ও এগ্রিকালচারাল সিকিউরিটি বজায় রাখার জন্য তারা ‘মে’ মাসে সালফিউরিক এসিড এক্সপোর্ট না করার প্রক্রিয়া করছে। যেখানে তারা এ ধরনের প্রক্রিয়া গ্রহণ করছে, সেখানে আমাদের দেশের কিছু ব্যবসায়ী সুপরিকল্পিতভাবে সালফিউরিক এসিড ইন্ডাস্ট্রিকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে নিম্নমানের এসিড আমদানি করে এক ষড়যন্ত্রের পাঁয়তারা করছে। এবং এই ইন্ডাস্ট্রিকে ধ্বংস করার জন্য তারা সুপরিকল্পিতভাবে ডাম্প এসিড/স্পেন্ট এসিড পিউরিফাই করে, যা এ দেশের লিড এসিড ব্যাটারি এবং অন্যান্য শিল্পকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসের মুখে ফেলবে—ওই ধরনের এসিড এনে এ দেশের প্রায় পাঁচ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান বিনষ্ট করার লক্ষ্যে এমন একটি নিকৃষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরকম হলে এ দেশের আর কোনোভাবেই সালফিউরিক এসিডের চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য থাকবে না; আমাদের জিম্মি হয়ে থাকতে হবে।
এমতাবস্থায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কাঁচামালের অনিশ্চিত যোগান গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠিত হাজারো শিল্পকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যা সার্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন একটি কন্টিনিউয়াস প্রসেস; এটা এমন নয় যে মজুদ করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দুর্ভাগ্য হলো, ভারত তাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আমদানির প্রাক্কালে সার্টিফিকেশন নিয়ে আমদানি করতে হয়, কিন্তু আমরা আমদানি করলে সেরকম বাধ্যবাধকতা নেই, যা অবিলম্বে শুরু করা প্রয়োজন।
পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী আমদানিকারক জনাব ফারুক তার বক্তব্যে কাস্টমস অফিসার সংক্রান্ত যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে তার হাত অনেক গভীরে রয়েছে বলে ধারণা করা যায়। আমরা ধারণা করছি, তিনি দেশপ্রেমিক একজন বাংলাদেশি নাগরিক; বাংলাদেশেই থাকেন ও ব্যবসা করেন; বাইরের দেশের প্রতি তার বিন্দুমাত্র টান বা প্রেম নেই—এটা প্রমাণ করবেন এবং দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পকে রক্ষা করার জন্য বিবেকবান হবেন।
বিশেষ উল্লেখ্য যে, বর্তমান বৈশ্বিক সার্বিক প্রেক্ষাপটেও আমরা দেশীয় চাহিদা পূরণে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হলেও কিছু অসাধু ও দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে না—এমন বাণিজ্যিক আমদানিকারকগণ হঠাৎ গত মার্চ ২০২৩ থেকে ভারত থেকে আমদানি শুরু করেছে। বর্তমানে আমদানির পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে দেশীয় সুপ্রতিষ্ঠিত স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিগত বছরের পর বছর আমদানির তথ্য নিশ্চিত করবে যে দেশীয় সালফিউরিক এসিড উৎপাদনকারী শিল্পগুলো সফলতার সঙ্গে নিরবিচ্ছিন্নভাবে চাহিদা অনুযায়ী দেশীয় ও রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে যোগান দিয়ে আসছে। সুদীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পার্শ্ববর্তী দেশসহ স্থানীয় ট্রেডার/আমদানিকারকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সালফিউরিক এসিড শিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। বিগত এত বছর আমদানিকারকরা কোথায় ছিল? দেশের শিল্পগুলোকে কি সালফিউরিক এসিডের পরিবর্তে হাওয়া দিয়ে চলেছে?
রপ্তানিকারক দেশের নীতি পরিবর্তনের প্রভাব:
এভাবে যত্রতত্র আমদানি করে নিম্নমানের এসিড আমদানি করে দেশীয় শিল্পগুলো ধ্বংস হওয়ার পর যদি এসিড রপ্তানিকারক দেশ তাদের রপ্তানি নীতিতে সালফিউরিক এসিড রপ্তানি নিষেধ, স্থগিত বা বন্ধ রাখে, তাহলে দেশীয় ও রপ্তানিমুখী হাজার হাজার শিল্পের অবস্থা কী ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে, তা বিশেষভাবে ভেবে দেখা দরকার। আমদানি সময়মতো করা না গেলে এর ভয়ঙ্কর ক্ষতির দিকটি বিবেচনা করা দরকার। তাছাড়া তখন উচ্চমূল্যে ক্রয় করে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাপক অপচয় কি ট্রেডার আমদানিকারকরা বহন করবে।
সালফিউরিক এসিডকে ভিত্তি করে ইতিমধ্যে হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং আরও নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এ সকল শিল্পের ভবিষ্যৎ কি আমদানি-নির্ভরতার ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে কিনা, তা সকল সচেতন নাগরিক ভেবে দেখবে।
সালফিউরিক এসিড একটি দেশের শিল্পোন্নয়নের নির্দেশক। এটি একটি বেসিক কেমিক্যাল, যা অত্যাবশ্যকীয় সার শিল্প, জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট পানি পরিশোধন শিল্প—যথা ঢাকা ওয়াসা, চট্টগ্রাম ওয়াসা সহ নারায়ণগঞ্জসহ সকল সুপেয় খাবার পানীয় পরিশোধনে ব্যবহৃত হয়। জনগুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, ব্যাটারি শিল্প, কাগজ শিল্প, সাবান ও ডিটারজেন্ট, ঔষধ, পরিবেশ রক্ষার্থে ইটিপি, স্টিল ও রি-রোলিং মিলস, গোল্ড প্রসেসিং, রাবার, ইথার গ্রুপসহ দেশের প্রায় সকল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কেমিক্যাল সেক্টরে ব্যবহৃত হয়। এটি ছাড়াও রপ্তানিমুখী চামড়া শিল্প, গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও সহযোগী শিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানি শিল্পে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে ব্যবহার হয়। উল্লেখিত ব্যবহারে এটি স্পষ্ট যে, দেশীয় বাজারে বিপণনকারী শিল্পসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে সালফিউরিক এসিড ব্যবহৃত হয়। ফলে এটি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ পণ্য। তাহলে কিছুসংখ্যক অসাধু ট্রেডার/আমদানিকারক নিজ স্বার্থে দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পগুলোকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে।
শিল্পায়ন এবং সালফিউরিক অ্যাসিড অবিচ্ছেদ্য—সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা একটি দেশের শিল্প উন্নয়নের প্রতিফলন ঘটায়। বাংলাদেশের জন্য, আমদানির ওপর বিএসটিআই (BSTI) সনদ প্রয়োগ করা কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং এটি দেশটির শিল্প অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে রক্ষা করার বিষয়।
বাংলাদেশের জন্য সালফিউরিক এসিড আমদানি বন্ধ করা কেন গুরুত্বপূর্ণ:
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো (সুপেয় খাবার পানি পরিশোধনে, বস্ত্র, চামড়া, ঔষধশিল্প, ব্যাটারি, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, ইটিপি সহ অসংখ্য রপ্তানি ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদনে) সালফিউরিক অ্যাসিডের ওপর নির্ভরশীল। আপনার দেওয়া তৃতীয় ছবিটির টেক্সটগুলো নিচে হুবহু দেওয়া হলো:
দেশীয় উৎপাদন এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা স্থানীয় শিল্পকে নিম্নমানের আমদানি থেকে রক্ষা করে।
শিল্পনীতিতে প্রায়শই সালফিউরিক অ্যাসিডকে একটি কৌশলগত কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটিকে সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করে, কর্মসংস্থান তৈরি করে, কিন্তু ট্রেডার/আমদানিকারক আজকে আমদানি করলো, কালকে ইচ্ছে হলো করলো না। এতে তার কোনো ক্ষতি নাই, কিন্তু উৎপাদক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী বিনিয়োগ ও শতশত শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবিকার সংস্থান করে এবং দেশের অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে রক্ষা করে।
BSAMA মনে করে, জননিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং নিম্নমানের এসিড আমদানি জনস্বাস্থ্য ও শিল্পে ঝুঁকি তৈরি করছে। নিম্নমানের এসিড দেশের শিল্পগুলোর যন্ত্রপাতি নষ্ট করছে, যার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির সম্মুখীন করবে। শিল্পনীতি ও জাতীয় স্বার্থে নিয়ন্ত্রণহীন আমদানি Made in Bangladesh নীতিকে দুর্বল করে। ভূরাজনৈতিক ও সরবরাহ শৃঙ্খলা ঝুঁকির সম্ভাবনা থাকবে।
সাংবিধানিকভাবে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠিত শিল্পের টিকে থাকার স্বার্থে, জাতীয় অর্থনীতির নিরাপত্তার জন্য, দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণে ভারত থেকে নিম্নমানের সালফিউরিক অ্যাসিড অতীব জরুরি ভিত্তিতে আমদানি বন্ধকরণ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় শিল্প রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদানে সরকারের কাছে সালফিউরিক এসিড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে জোর দাবি জানানো হয়।





