মুল দর্শন ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরন’
বিএনপি’র ৩১ দফা’র বাজেট অধিবেশন বসছে আজ
বিনিয়োগে স্থবিরতা, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে, ভর্তূকি কমাতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মুল্য বৃদ্ধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং উচ্চ মুল্যস্ফীতিসহ দেশের অর্থনীতি যখন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ঠিক এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে একটি নতুন বাজেট নিয়ে আসতে হচ্ছে। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আজ রবিবার বিকেল ৩ টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন বসছে। তিনদিন পর বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী জুলাইয়ে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবেন।
জানা গেছে, বিএনপি’র এই বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফার প্রতিফলন থাকছে। এর মধ্যে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি মাথায় রেখে একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক বাজেট চুড়ান্ত করা হয়েছে। মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের উন্নয়নের জন্য থাকছে বিশেষ তহবিল। এছাড়াও বিশেষ কর্মসুচি ও আর্থিক বরাদ্দ থাকছে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে। এই সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মসুচির অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে শহরে ও গ্রামে সংগীত, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, কারুশিল্প ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিক বিকাশ কার্যক্রম।
আরও পড়ুন: ঈদের পর স্বর্ণের দামে বড় ধাক্কা
২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি’র জন্য প্রথম বাজেট
উল্লেখ্য, বিএনপি ২০০৬ সালের পর দীর্ঘ ২০টি বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য ২০০৮ সালে একটি সামরিক সরকার এবং ২০২৫ সালে একটি অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় সংসদের বাইরে বাজেট দিয়েছে। মধ্যবর্তী ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। তারাই এই দীর্ঘ সময়ে বাজেট প্রণয়নের কাজ করেছে।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে ধস
এবারের বাজেট ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি’র জন্য প্রথম বাজেট। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও কৃষি, শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। মুল চ্যালেঞ্জ চাহিদার তুলনায় সীমিত সম্পদ । এর বাইরে রয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশেক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধের চাপ। এছাড়াও নতুন করে বৈদেশিক ঋণ পেতে লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যাংক-ইন্সুরেন্স খাত, রাজস্ব বিভাগ, প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কর্মসুচি বাস্তবায়ন করার মতো চাপও আছে।
বাজেটের মুল দর্শন হলো ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে সাংবাদিকদের বলেছেন, এবারের বাজেটের মুল দর্শন হলো ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’। তিনি বলেন, আগামী বাজেট এমনভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে বাজেটের সুফল যাতে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের প্রতিটি মানুষের কথা চিন্তা করেই আগামীর বাজেট দেওয়া হচ্ছে। এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে অর্থনীতি দুর্বল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তবে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার কাজ শুরু করেছে।
সম্ভাব্য বাজেট (অর্থবছর ২০২৬-২৭)
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি খসড়া থেকে জানা গেছে, সরকার মোট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে চায়। এই অর্থ মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি’র ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটের এই পরিমান চুড়ান্ত হলে রাজস্ব সরকার আদায়ের লক্ষমাত্রা ঠিক করেছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা (জিডিপি’র ১০ দশমিক ২ শতাংশ।)। এরপর ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি পুরণে সরকার ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিতে চায়। অবশিষ্ট ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকার সংস্থান করা হবে অভ্যন্তরীণ উৎস বিশেষ করে ব্যাংক, বন্ড ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে।
সর্বোচ্চ বরাদ্দ যাচ্ছে শিক্ষা খাতে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় ৫০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ৪২ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় ১৫ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে স্বাস্থ্যখাত (৪৩ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা), প্রতিরক্ষা (৪২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা), স্বরাষ্ট্র (৩১ হাজার ৯ কোটি টাকা), বিদ্যুৎ বিভাগ (১৯ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা), সমাজকল্যাণ (১৪ হাজার ২৭ কোটি টাকা)। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সম্ভাব্য বরাদ্দ পাচ্ছে ৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সুত্র জানায়, নতুন বাজেটের দর্শন ও কাঠামোগত বিষয়গুলোর মধ্যে আরও রয়েছে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে সামাজিক খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো যাতে বৈষম্য কমে। কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে দুর্বল ব্যাংক খাত সংস্কার, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনা এবং রাষ্ট্রের কোষাগারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। গ্রামে ও শহরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (এমএসএমই) শক্তিশালী করা।
রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অধিবেশন আহবান্
এদিকে, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো.
শাহাবুদ্দিন ৭ জুন রোববার বেলা তিনটা থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন (২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট) আহ্বান করেছেন। সাধারণত বাজেট অধিবেশন দীর্ঘ হয়। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে সংসদ কত দিন চলবে।
বাজেট অধিবেশন ঘিরে ডিএমপি’র নিষেধাজ্ঞা
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন সামনে রেখে রাজধানীর সংসদ ভবন ও এর পাশ ঘেঁষা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গণপরিবহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়িয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। শুক্রবার (৫ জুন) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা জানানো হয়।
অধিবেশন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সংসদ এলাকায় যেকোনো ধরনের অশান্তির আশঙ্কা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। শনিবার (৬ জুন) দিবাগত রাত ১২টা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে বলে গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ময়মনসিংহ রোডের মহাখালী মোড় থেকে পুরাতন বিমানবন্দর হয়ে বাংলামোটর মোড় পর্যন্ত সড়ক, বাংলামোটর লিংক রোডের পশ্চিম প্রান্ত থেকে হোটেল সোনারগাঁওয়ের সার্ক ফোয়ারা, পান্থপথের প্রাচ্য প্রান্ত থেকে গ্রিন রোডের সংযোগস্থল হয়ে ফার্মগেট, মিরপুর রোডের শ্যামলী মোড় থেকে ধানমন্ডি-১৬ নম্বর সড়কের জংশন, রোকেয়া সরণির মোড় থেকে সাবেক নবম ডিভিশন মোড় হয়ে বিজয় সরণি পর্যটন মোড়, ইন্দিরা রোডের পূর্বপাশ থেকে মানিক মিয়া এভিনিও’র পশ্চিম প্রান্ত এবং জাতীয় সংসদ ভবনের বিশেষ নিরাপত্তা অঞ্চল—এই সীমানার ভেতরের সব সড়ক ও গলিপথ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় উল্লিখিত এলাকায় সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র, বিস্ফোরক ও ক্ষতিকারক দ্রব্য বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইসঙ্গে এই সীমানার ভেতরে যে কোনো ধরনের জনসভা, মিছিল, শোভাযাত্রা বা বিক্ষোভ প্রদর্শনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ডিএমপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে বলে গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।





