পদোন্নতিতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ

রূপালি ব্যাংকে ব্যাপক ঋণ জালিয়াতি

Sanchoy Biswas
এম মনিরুল আলম
প্রকাশিত: ৫:০৬ পূর্বাহ্ন, ১৪ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৬:৪২ পূর্বাহ্ন, ১৪ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সরকারের মালিকানাধীন রূপালী ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির নতুন আরও তিনটি ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একটি ঋণে খোদ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম সরাসরি জড়িত বলে তথ্য প্রমানাদি পাওয়া গেছে। অপর ঘটনায় ব্যাংকটির দীর্ঘ সময়ের কর্মকর্তা পারসুমা আলম (বর্তমানে অগ্রনী ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক-ডিএমডি-১ পদে কর্মরত) একজন গ্রাহককে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার নিয়ম-বহির্ভূত ঋণ সুবিধা দিয়েছেন। অনুসন্ধানে তৃতীয় ঘটনাটিতে ব্যাংকটির পল্লবী শাখার ব্যবস্থাপক  রাজ্জাকুল হায়দারসহ আরও কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক দুই গ্রাহককে ২০ কোটি ও ১১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শন টীমের সদস্যরা।

গত এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট থেকে রুপালি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের অডিট কমিটিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ করে করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই পত্রে বলা হয়, বিগত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অভিযোগ পাওয়ার পর অক্টোবরের ৩০ তারিখে পৃথক পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ওই পরিদর্শনে রুপালি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় শীর্ষ পদে আসীন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কয়েকজন শাখা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঋণ জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং এবং পদোন্নতিতে অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়। পরিদর্শনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ প্রশাসনে গুরুতর অসঙ্গতি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: চার দফা কমার পর ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

পারসুমা আলমের ঋণ জালিয়াতি ও গ্রাহককে নিয়ম-বহির্ভুত আর্থিক সুবিধা প্রদান

পরিদর্শনে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের এস.কে. রোড শাখার গ্রাহক অবন্তী কালার টেক্স লিমিটেড ও ক্রোনি অ্যাপারেলস লিমিটেডকে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ ও এলসি সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থাপিত বহু ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত সরবরাহ, রপ্তানি আয় প্রত্যাবর্তন, ক্রেডিট রিপোর্ট, পিআরসি, এক্সপোর্ট ডকুমেন্ট এবং বিল অব এন্ট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া যায় নি। ওই প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সহ-সভাপতি আসলাম সানি। বর্তমানে সানি পরিবারসহ পলাতক বা আত্মগোপনে রয়েছেন।

আরও পড়ুন: ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে পণ্যের দামে খুব একটা হেরফের নেই

পরিদর্শন দল অনুসন্ধানে জানতে পারে, ব্যাংকের ক্রেডিট ম্যানুয়ালে নির্ধারিত পর্যাপ্ত জামানত গ্রহণ ছাড়াই একই গ্রাহকের ওই দুটি প্রতিষ্ঠানকে শত শত কোটি টাকার ঋণ সুবিধা অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জমি, ভবন ও যন্ত্রপাতিকে জামানত হিসেবে দেখানো হলেও মূল্যায়ন প্রতিবেদন, মালিকানা যাচাই কিংবা আইনগত দলিল পাওয়া যায়নি। এতে জামানতের মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত বা ভুয়া উপায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।

একই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৩০০টি এলসি স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় এক দশমিক ৫৮ কোটি মার্কিন ডলারের লেনদেন সংঘটিত হয়, যা প্রকৃত বাণিজ্যের পরিবর্তে কৃত্রিম বা অ্যাকোমোডেশন বিল তৈরির মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে বলে পরিদর্শন দল মত দেয়। এসব অনিয়মের ফলস্বরূপ অবন্তী কালার টেক্সের অনুকূলে ৩০০ কোটিরও বেশি টাকার ফোর্সড লোণ (ঋণ) সৃষ্টি হয়েছে।

পারসুমা আলম ব্যাংকটির এসকে রোড শাখায় প্রায় ৬ বছর ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ওই ঋণ সুবিদা দেন। এরপর নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিনি পদোন্নতি পান এবং এক পর্যায়ে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আসীন হন। এরপরই তিনি রাষ্ট্র মালিকানাধীন অপর ব্যাংক অগ্রনীতে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি অগ্রনী ব্যাংকে ডিএমডি-১ হিসেবে কর্মরত। পরদির্শন দল ঘনিষ্ঠ সুত্রে জানা গেছে, পারসুমা আলমের ওইসব ঋণ জালিয়াতিতে ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহিসহ পর্ষদের কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। তা না হলে এতো অপকর্ম করেও তিনি শিাস্তি না পেয়ে পুরস্কার হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এক পর্যায়ে তাকে ব্যাংক থেকে নিরাপদে সরিয়ে অন্য ব্যাংকে দেয়া হয়েছে। সুত্র জানায়, পারসুমা আলম ব্যাংক খাতের দুর্ধর্ষ লুটেরা এস আলমের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় পার পেয়ে গেছেন।      

অন্যদিকে গুলশান কর্পোরেট শাখার গ্রাহক মাসটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে অনুমোদিত সীমার বাইরে এলসি সুবিধা প্রদান, যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া বন্ধক গ্রহণ, জাল বা সন্দেহজনক রপ্তানি চুক্তির বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা এবং প্রকৃত ডাউন পেমেন্ট ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল করার মতো গুরুতর অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থ জমা না দিয়েই ঋণ হিসাব সমন্বয়ের মাধ্যমে ঋণের স্থিতি কম দেখানোর প্রমাণও পাওয়া গেছে, যা সরাসরি আর্থিক জালিয়াতির পর্যায়ে পড়ে। আর এসব ঘটনায় ব্যাংকের বর্তমান এমডি কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম সরাসরি জড়িত বলে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন দল জানতে পেরেছে।

এছাড়াও এমডি ঘুষ আদায় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ২০২৪ সালের সুপারনিউমারারি পদোন্নতি কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন। এর ফলে যোগ্যতর অনেকেই প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এত করে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনে চেইন-অব-কমান্ডও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শন দল এসব  অভিযোগেরও আংশিক সত্যতা পাওয়া গেছে উল্লেখ করে জানায়, মোট ১,৩৭০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার ও মূল্যায়ন কমিটির হাতে উল্লেখযোগ্য নম্বর প্রদানের ক্ষমতা থাকলেও কোনো সুস্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়নি।

তদন্তে দেখা যায়, তুলনামূলক কম যোগ্যতা বা কম নম্বরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সাক্ষাৎকারে অস্বাভাবিকভাবে বেশি নম্বর পেয়েছেন, অন্যদিকে অধিক যোগ্য ও উচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কম নম্বর পেয়েছেন। এর ফলে পদোন্নতি-পরবর্তী জ্যেষ্ঠতা তালিকায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং অনেক যোগ্য কর্মকর্তা তাদের প্রাপ্য অবস্থান হারান। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, নিরীক্ষা আপত্তি কিংবা শাস্তিমূলক ইতিহাস থাকা কিছু কর্মকর্তাকে উচ্চ নম্বর প্রদান করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। আবার একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আচরণও লক্ষ্য করা গেছে। এসব ঘটনা পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং ঘুষ, পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।

এদিকে, পল্লবী শাখার ব্যবস্থাপক রাজ্জাকুল হায়দারের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ তদন্তে সরাসরি প্রমাণিত হয়নি। তবে তদন্তে দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি মূল্যায়ন স্কোর গ্রহণযোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়া ঋণের অর্থ অন্য একটি ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়ে পূর্ববর্তী দায় পরিশোধে ব্যবহৃত হয়েছে বলে সন্দেহের উদ্রেক হয়। পরিদর্শন দল উল্লেখ করে যে, বিধি-বিধান উপেক্ষা করে এবং তথ্যের অপব্যাখ্যা করে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হয়েছে। ফলে সরাসরি ঘুষের প্রমাণ না মিললেও অবৈধ সুবিধা গ্রহণ বা প্রভাব খাটানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পরিদর্শন দল আরও উল্লেখ করে, একইভাবে এস.কে. রোড শাখায় দায়িত্ব পালনকালে পারসুমা আলম কর্তৃক অবন্তী কালার টেক্সকে ধারাবাহিকভাবে বিশেষ সুবিধা প্রদান, সীমাতিরিক্ত এলসি অনুমোদন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণের ঘটনায় তার ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অভিযোগে উল্লিখিত ঘুষের অর্থ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত না হলেও অনিয়মিত সুবিধা প্রদানের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পরিদর্শনে উদঘাটিত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে রূপালী ব্যাংকের একাধিক শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকের নীতিমালা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো উপেক্ষা করে ঋণ ও এলসি সুবিধা প্রদান করেছেন। এর ফলে বিপুল অঙ্কের ফোর্সড ঋণ সৃষ্টি হয়েছে এবং সম্ভাব্য ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ঘুষের অভিযোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত না হলেও ঋণ অনুমোদন ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্বচ্ছতা এবং পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের যথেষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সুপারনিউমারারি পদোন্নতির ক্ষেত্রে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অসঙ্গতি এবং কর্মকর্তাদের অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়নের মাধ্যমে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার স্বাভাবিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উদ্ঘাটিত আর্থিক অনিয়মের প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয়, নিয়ন্ত্রক এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি তদন্ত গ্রহণ করা সমীচীন বলেও পরিদর্শন দল সুপারিশ করেছে। 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রূপালী ব্যাংকের এমডি কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। হোয়াটঅ্যাপের টেক্সট মেসেজে তিনি তিন দফা তিনরকম বক্তব্য দিয়েছেন। প্রথমবার তিনি ‘দেখা করে বিস্তারিত জানানোর জন্য’ কথা বলবেন বলে জানান এবং সাক্ষাতের সময় পরবর্তীতে জানাতে চান। দ্বিতীয়বার তিনি দাবী করেন, ’অভিযোগের সবটাই মিথ্যে।’ এবং জানান, ’পারসুমা আলম দায়ী নয়। বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।’ তৃতীয়বার (জুন ৯) তিনি আবারও এক মেসেজে বলেন, ’বাংলাদেশ ব্যাংক এই অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দিয়েছে। তাই আমার কিছু বলার নেই।’

এদিকে, রূপালী ব্যাংক পর্ষদ চেয়ারম্যান নজরুল হুদাকে ফোনে কল দিয়ে ও টেক্স্ট পাঠিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া পারসুমা আলমের বর্তমান কর্মস্থল অগ্রণী ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল-আমিনের মাধ্যমে তার সঙ্গে দেখা করে বক্তব্য চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি।