সব স্থানীয় নির্বাচনেও সেনা মোতায়েনের আইনি পথ চায় ইসি, প্রার্থিতা নিয়ে আসছে নতুন বিধিনিষেধ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের স্পষ্ট আইনি সুযোগ রাখতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের প্রার্থিতা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আপাতত কোনো সংশোধনী আনার পরিকল্পনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যমান আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন আইন সংশোধনের জন্য একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। জেলা পরিষদ আইন এই প্রস্তাবের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১২ নভেম্বর থেকে শুরু স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ইসি
নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির প্রস্তুত করা এসব প্রস্তাব কমিশনের সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। কমিশনের অনুমোদন পেলে তা সুপারিশ আকারে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরে সরকার সম্মত হলে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে বিল আকারে তা উত্থাপন করা হবে।
স্থানীয় নির্বাচনেও সেনা মোতায়েনের আইনি ভিত্তি:
আরও পড়ুন: কারা অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল
বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের নজির থাকলেও অধিকাংশ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তা নিয়মিতভাবে করা হয় না। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, চারটি স্থানীয় সরকার আইনে "আইন প্রয়োগকারী সংস্থা"র সংজ্ঞার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে প্রয়োজনে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে সরাসরি নির্বাচনী দায়িত্ব দেওয়া যায়।
ইসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আইনে সশস্ত্র বাহিনীর অন্তর্ভুক্তি থাকলে আলাদা প্রশাসনিক নির্দেশনার প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন এবং আইনে নির্ধারিত ক্ষমতা প্রয়োগেও কোনো আইনি জটিলতা থাকবে না।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। ফলে একই রাজনৈতিক ধারার একাধিক প্রার্থী মাঠে নামতে পারেন, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই প্রস্তাব বিবেচনায় এসেছে।
প্রার্থিতা নিয়ে নতুন অযোগ্যতার বিধান:
আইন সংশোধনের প্রস্তাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে দুটি নতুন অযোগ্যতার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর একটি হলো দ্বৈত নাগরিকত্ব। বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অধিকাংশ আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদ ছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচিত পদে দ্বৈত নাগরিকত্বধারীরা প্রার্থী হতে পারবেন না।
অন্যদিকে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান নেই।
নিষিদ্ধ দলের নেতাদের বিষয়ে অবস্থান অপরিবর্তিত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবিও বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। তবে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো বিধান সংযোজনের উদ্যোগ বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে না।
কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত না হওয়ায় কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা ও অযোগ্যতাই প্রার্থিতা নির্ধারণের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
অভিন্ন আইনি কাঠামোর পক্ষে ইসি:
নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনাকারী বিভিন্ন আইনে বর্তমানে এক ধরনের বিধান নেই। কোথাও সশস্ত্র বাহিনী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় রয়েছে, কোথাও নেই। একইভাবে প্রার্থিতার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার ক্ষেত্রেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। এসব অসঙ্গতি দূর করে চারটি আইনে অভিন্ন কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
সংসদে অনুমোদনের পরই কার্যকর:
নির্বাচন কমিশনের সুপারিশ সরকার গ্রহণ করলেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হবে না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত হবে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সংশোধন কার্যকর করতে হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা, প্রার্থিতার মানদণ্ড এবং নির্বাচন পরিচালনার আইনি কাঠামোকে আরও সুস্পষ্ট ও অভিন্ন করার লক্ষ্যেই নির্বাচন কমিশন এসব পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত আইনে রূপ পাবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকারের সিদ্ধান্ত এবং সংসদের অনুমোদনের ওপর।





