নানা পাটেকারের জীবনসংগ্রাম ও ব্যক্তিজীবনের ১০ গল্প

Shahrier Islam Pallab
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:৩০ অপরাহ্ন, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩৪ অপরাহ্ন, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
পরিবারের সাথে নানা পাটেকার। ছবিঃ সংগৃহীত
পরিবারের সাথে নানা পাটেকার। ছবিঃ সংগৃহীত

বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকারের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে। ৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার নিজ বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। পরে তাকে দোনা পাউলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দেওয়ার পর সকাল ৫টা ২০ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নানা পাটেকার তার শক্তিশালী অভিনয়, স্বতন্ত্র সংলাপ বলার ধরন ও চরিত্রের গভীরে প্রবেশের ক্ষমতা দিয়ে দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন। তবে পর্দার বাইরের জীবনও ছিল কম বৈচিত্র্যময় নয়। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই, থিয়েটার, সংসার, ব্যক্তিগত শোক, রান্না, কৃষিকাজ থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা—তার জীবনের অনেক অধ্যায়ই হয়তো এখনো অজানা অনেকের কাছে।

জেনে নেওয়া যাক নানা পাটেকারের ব্যক্তিজীবনের এমন ১০ তথ্য।

আরও পড়ুন: বয়স যেন শুধুই সংখ্যা, মোহময়ী জয়া আহসান

১. আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকার

নানা পাটেকারের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকার। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুড-জঞ্জিরায় জন্ম তার। ছোটবেলায় পাওয়া ‘নানা’ ডাকনামটিই পরবর্তী সময়ে তার পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়। দুই ভাই অশোক ও দিলীপের সঙ্গে শৈশব কাটে তার। পরে পরিবারের সঙ্গে মুম্বাইয়ে চলে যান। আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা নানা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখ হলেও নিজের শিকড় ও সংগ্রামের দিনগুলো কখনো ভুলে যাননি।

আরও পড়ুন: ‘অকালে চলে গেলেন আমার হিরো অভিনেতা’: নানা পাটেকরকে শাহরুখ খান

২. মাত্র ১৩ বছর বয়সেই শুরু হয় কর্মজীবন

অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার বহু আগেই জীবিকার তাগিদে কাজ শুরু করেছিলেন নানা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্কুলে পড়ার পাশাপাশি মুম্বাইয়ের চুনাভাট্টি এলাকায় সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ করতেন তিনি। সে সময় মাসে প্রায় ৩৫ রুপি আয় করতেন। কর্মস্থলে যেতে কয়েক কিলোমিটার হেঁটেও যেতে হয়েছে তাকে। পোস্টার আঁকার পাশাপাশি জেব্রা ক্রসিং আঁকার কাজও করেছেন। শৈশবের সেই অভাব, ক্ষুধা ও কঠিন অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তার অভিনয়জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন নানা।

৩. তৃতীয় শ্রেণি থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে পরিচয়

বলিউডে পা রাখার অনেক আগেই অভিনয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল নানার। পুরোনো এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই গ্রামের নাটকে অভিনয় করতেন। পরিবারে থিয়েটারের বিশেষ কোনো পরিবেশ না থাকলেও নিজের আগ্রহেই অভিনয় চালিয়ে যান তিনি। পরবর্তী সময়ে মারাঠি থিয়েটারে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। সেই মঞ্চই হয়ে ওঠে তার অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

৪. সংগ্রামের দিনে স্ত্রী ছিলেন তার পাশে

১৯৭৮ সালে নীলকান্তি পাটেকারকে বিয়ে করেন নানা। অভিনয়জীবনের শুরুর দিকে থিয়েটার থেকে তার আয় ছিল খুবই কম। এক পুরোনো সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, একটি নাটকের জন্য তিনি প্রায় ৫০ রুপি পেতেন। বিপরীতে তার স্ত্রী নীলকান্তি ব্যাংকে চাকরি করে মাসে প্রায় ২ হাজার ৫০০ রুপি আয় করতেন। অভিনয়কে পেশা হিসেবে ধরে রাখার সিদ্ধান্তে নীলকান্তির সমর্থন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে দুজন আলাদা থাকলেও তাদের আইনগতভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি।

৫. আড়াই বছর বয়সেই হারান বড় ছেলে

নানার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি ছিল বড় ছেলে দুর্বাসার মৃত্যু। জন্মের পর থেকেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিল দুর্বাসা। মাত্র আড়াই বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। সন্তানের অসুস্থতা ও মৃত্যুর সেই অভিজ্ঞতা নানার জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। বহু বছর পর এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের মানসিক অবস্থার নানা দিকও তুলে ধরেছিলেন তিনি। পরে নানা ও নীলকান্তির আরেক ছেলে জন্ম নেয়। তার নাম মালহার পাটেকার।

৬. দিনে ৬০টি পর্যন্ত সিগারেট খেতেন

একসময় ভয়াবহ ধূমপানে আসক্ত ছিলেন নানা পাটেকার। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, দিনে ৬০টি পর্যন্ত সিগারেট খেতেন। এমনকি দিনের বিভিন্ন সময়ের পাশাপাশি গোসলের সময়ও সিগারেট খাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তবে ৫৬ বছর বয়সে হঠাৎ করেই ধূমপান ছেড়ে দেন নানা। ধূমপান নিয়ে তার নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির কথা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।

৭. অভিনয়ের পাশাপাশি রান্নাও ছিল প্রিয়

অভিনয়ের বাইরে রান্না করা ছিল নানার অন্যতম পছন্দের কাজ। শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের রান্না করে খাওয়াতেও আনন্দ পেতেন তিনি। শুটিংয়ের সময়ও কখনো কখনো পুরো ইউনিটের জন্য রান্না করতেন নানা। রান্নার প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই ছিল যে, এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতার চেয়ে নিজেকে ভালো রাঁধুনি বলেও মজা করেছিলেন তিনি। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও সাধারণ জীবনযাপনের প্রতি তার এই টানই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

৮. কৃষিকাজের সঙ্গে ছিল গভীর সম্পর্ক

চলচ্চিত্রের ব্যস্ততার বাইরে কৃষিকাজের প্রতিও নানার ছিল গভীর ভালোবাসা। মহারাষ্ট্রে তার বড় একটি ফার্মহাউস ছিল, যেখানে ধান, গম, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন তিনি। শুধু নিজের খামারে চাষাবাদেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না নানা। কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যার পাশে দাঁড়াতেও কাজ করেছেন। কৃষকদের সহায়তায় তার সঙ্গে যুক্ত ‘নাম ফাউন্ডেশন’ও মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ অঞ্চলে কাজ করেছে।

৯. সিনেমার বাইরেও ছিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক

সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বাস্তব জীবনেও সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নানা পাটেকার। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ সিনেমার জন্য টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি পরবর্তীতে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে কমিশনও পান নানা। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময়ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেবা দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

১০. তারকা বাবা হয়েও ছেলেকে নিজে হাতে প্রতিষ্ঠা করেননি

নানার ছেলে মালহার পাটেকারেরও চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ ছিল। তবে বাবার তারকা পরিচয় ব্যবহার করে তাকে সরাসরি অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পথে হাঁটেননি নানা। বরং মালহারকে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে দিয়েছেন। পরবর্তীতে অভিনয়ের পরিবর্তে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে আগ্রহী হন মালহার। চলচ্চিত্র নির্মাতা রামগোপাল ভার্মার সঙ্গে সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। নানার এই সিদ্ধান্ত তার নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনকেই তুলে ধরে—সন্তানের জন্য দরজা খুলে দেওয়া নয়, বরং তাকে নিজের যোগ্যতায় পথ তৈরি করতে শেখানো। শৈশবের আর্থিক সংকট থেকে শুরু করে পোস্টার আঁকার কাজ, থিয়েটারের মঞ্চ, ব্যক্তিজীবনের গভীর শোক, অভিনয়ের সাফল্য, রান্না ও কৃষিকাজের প্রতি ভালোবাসা কিংবা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা—নানা পাটেকারের জীবন ছিল বহু বৈচিত্র্যে ভরা।

পর্দায় তিনি যতটা তীব্র ও শক্তিশালী ছিলেন, ব্যক্তিজীবনে ততটাই সাধারণ থাকতে চেয়েছেন। খ্যাতি তাকে বদলে দিতে পারেনি; বরং সংগ্রামের দিনগুলোর অভিজ্ঞতাই তাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়েছে মাটি ও মানুষের কাছে। তাই নানা পাটেকারের জীবন শুধু একজন সফল অভিনেতার গল্প নয়, বরং নিজের শিকড় আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলা এক মানুষের গল্পও।