পূজার তিন ছবিতেই দর্শকখরা, শোচনীয় অবস্থায় ‘স্নেহের বন্ধন’
দুর্গাপূজা উৎসবকে কেন্দ্র গত ১৬ অক্টোবর সারাদেশে মুক্তি পেয়েছে তিনটি সিনেমা—‘স্নেহের বন্ধন’, ‘কাট-পিস’ ও ‘চিরকুট’। তবে মুক্তির প্রথম দিন থেকেই দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টানতে রীতিমতো ব্যর্থ হয়েছে সিনেমাগুলো। উৎসবের দিনগুলোতে যেখানে সিনেমা হলগুলোতে দর্শকের উপচে পড়া ভিড় থাকার কথা, সেখানে হলের টিকিট কাউন্টারগুলো পার করছে অলস সময়। আর এই তিন সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সিনেমা ‘স্নেহের বন্ধন’, যেখানে দর্শকখরা চরমে। এই সিনেমার ৩৭ টিকিটের ৩৫টিই কিনেন সিনেমার প্রযোজক-নায়ক, দর্শক ২টি মাত্র টিকিট কিনেন!
পূজার আবহে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের গল্প নিয়ে হাজির হয়েছিলেন নির্মাতারা। পোশাকশিল্পের অন্ধকার জগত নিয়ে ইফফাত জাহান মমর ‘কাট-পিস’, নব্বই দশকের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্য ঘটনা ও ক্যাম্পাসের নস্টালজিয়া নিয়ে মুনতাসির আকিবের ‘চিরকুট’ এবং জয় চৌধুরী ও মৌ খান জুটির পারিবারিক মেলোড্রামা ‘স্নেহের বন্ধন’ মুক্তি পায়। কিন্তু মুক্তির প্রথম তিন দিন কোনো সিনেমাই কাঙ্ক্ষিত দর্শকখরা কাটাতে পারেনি। হল মালিকদের মতে, পূজার ছুটির মধ্যেও দর্শক উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কম।
আরও পড়ুন: বাক্স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার গান নিয়ে অ্যাবাউট ডার্কের ‘নিরাকার’
সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা কামরুজ্জামান পরিচালিত ‘স্নেহের বন্ধন’ সিনেমার। বাণিজ্যিক ঘরানার জয় চৌধুরী ও মৌ খানকে নিয়ে নির্মিত এই সিনেমাটি মুক্তির আগে রাজধানীর বুকে ছাদখোলা বাসে করে বেশ প্রচার-প্রচারণাও চালিয়েছিল। কিন্তু হল খোলার পর দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে শুরু করে মাল্টিপ্লেক্স—সবখানেই এই সিনেমার শো-গুলো ফাঁকা যাচ্ছে। ভাড়া করেও দর্শক পাচ্ছে না এই সিনেমার নায়ক! তার আগের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোও সুপারফ্লপ।
মুক্তির প্রথম দিন বরিশাল অভিরুচি সিনেমা হলে দুপুরে শোতে ‘স্নেহের বন্ধন’দেখতে গিয়েছিল ৬ জন দর্শক! সন্ধ্যার শোতে দর্শক ছিল মাত্র ৯ জন। শনিবার ১২টার শোতে চার জন এবং বিকেলে শোতে দুটি টিকিট বিক্রি হয়। তবে নাইট ও স্পেশাল শো দর্শকখরায় বন্ধ ছিল বলে হলটির ম্যানেজার কবির নিশ্চিত করেছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই চিত্র বলে জানান হল কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন: কেন রাখি সাওয়ান্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আদালতের?
ম্যানেজার কবির বলেন, ‘এখন আসলে কেউ সিনেমা দেখতে চায় না। শুক্রবার সারা দিনে ২০ জনের মতো দর্শক হয়েছিল কিন্তু সন্ধ্যায় দর্শক না থাকায় শো বন্ধ ছিল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা। যদিও এখন বরিশালে খুব একটা সিনেমা চলে না। ভালো গল্প হলে একটু দর্শক পাওয়া যায়। আর এই সিনেমার মান নিয়েও অনেকেই সমালোচনা করেছেন। বরিশালের সেল খারাপ। দর্শক আসলে শো চলে না হলে বন্ধ থাকে।’
গতকাল অভিরুচি হলের ম্যানেজারের সাথে যখন কথা হয় তখন তিনটা বেজে ৪০ মিনিট। শোয়ের নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একজন দর্শকও পাওয়া যায়নি। লায়ন সিনেমাসে শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে ‘কাট-পিস’ও ‘স্নেহের বন্ধন’সিনেমা দুটি। তবে সিনেমা দুটির মান নিয়ে বিরক্ত হলটির কর্ণধার মির্জা আব্দুল খালেক।
তিনি বলেন, ‘আমি আসলে এখনকার সিনেমা নিয়ে কথা বলতে চাই না। কী বলব, এগুলো কী সিনেমা? এগুলো টাকা খরচ করে মানুষ কেন দেখবে? একটি সিনেমা দেখতে গেলে কমপক্ষে পাঁচশত টাকা খরচ আছে। সিনেমা দেখে সেই টাকাই যদি উসুল না হয় তাহলে দর্শক কেন সিনেমা দেখবে।’
সিনেমা দুটি নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘প্রথম দিন ‘স্নেহের বন্ধন দেখেছিল ৩৭ জন দর্শক। এর মধ্যে ৩৫টি টিকিট কিনেছেন সিনেমাটির প্রচারণায় আসা প্রযোজক, পরিচালক, নায়ক-নায়িকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অর্থাৎ সাধারণ দর্শক টিকিট কিনেছেন মাত্র দুজন। অন্যদিকে, একই দিনে ‘কাটপিস’ সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র আটটি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা। আমরা আসলে সিনেমা নামিয়ে দেই না। দর্শক না আসলে শো বন্ধ থাকে।’
উল্কা সিনেমা হলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন বলেন, ‘পূজায় যেভাবে দর্শক থাকার কথা সে রকম দর্শক নেই। প্রথম ও দ্বিতীয় দিন প্রায় ২০ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। তৃতীয় দিনে দর্শকসংখ্যা কমেছে। তবুও আমরা বাংলা সিনেমা নিয়ে আশাবাদী।’
সিনেমা হলের কর্মকর্তারা জানান, অনেক শো-তে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র দর্শক দেখছেন, যা দিয়ে সিনেমা হলের ন্যূনতম খরচ ওঠানোও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সনাতন ধাঁচের পারিবারিক গল্প ও দুর্বল নির্মাণশৈলীই দর্শকদের হলবিমুখ করার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা।
ঝুট ব্যবসার অপরাধ জগতের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘কাট-পিস’ মিরপুর সনি সিনেমা হলসহ ২৩টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও আশানুরূপ সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্যদিকে, শ্যামল মাওলা ও আজিজুন মিম অভিনীত ‘চিরকুট’ সিনেমাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নস্টালজিয়া নিয়ে তৈরি হওয়ায় তরুণদের মাঝে কিছুটা আগ্রহ তৈরি করলেও তা টিকিট বিক্রির অঙ্কে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, ঈদ ছাড়া অন্য উৎসবে বড় পরিসরে সিনেমা মুক্তি দেওয়ার সাহস ঢালিউডে কম দেখা যায়। এবার পূজাকে কেন্দ্র করে সেই চেষ্টা করা হলেও সিনেমার দুর্বল কনটেন্ট, আধুনিক মেকিংয়ের অভাব এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তনের কারণে সিনেমাগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। দর্শক এখন হলের পর্দায় লার্জার-দ্যান-লাইফ ভিজ্যুয়াল অথবা অত্যন্ত শক্তিশালী গল্প দেখতে চান। সেই জায়গায় এই তিন সিনেমা প্রথাগত ফর্মুলা থেকে বের হতে না পারায় উৎসবের আমেজেও দর্শক টানতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো।
পূজার ছুটির বাকি দিনগুলোতে এই মন্দা কাটিয়ে সিনেমাগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা, তা নিয়ে এখন বড়সড় সংশয় তৈরি হয়েছে।





