গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে শিশুসহ ৩১ ফিলিস্তিনি নিহত
গাজা উপত্যকাজুড়ে অব্যাহত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ছয়জন শিশু ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় খোলার একদিন আগে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) খান ইউনিসের উত্তর-পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের জন্য স্থাপন করা একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত হন বলে চিকিৎসা সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে। নিহতদের মরদেহ খান ইউনিসের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। খবর আল জাজিরার।
আরও পড়ুন: ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করছে: ট্রাম্প
অন্যদিকে গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের রেমাল এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জরুরি সেবা বিভাগ।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ জানান, “বিস্ফোরণের তীব্র ধাক্কা অনুভূত হয়, এরপর ঘন ধুলাবালির মেঘ পুরো এলাকা ঢেকে ফেলে। ওই ফ্ল্যাটের ভেতরে এক মা ও তাঁর সন্তানসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হন।”
আরও পড়ুন: গাজায় প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহতের কথা স্বীকার ইসরায়েলের
এ ছাড়া গাজা সিটির দারাজ এলাকায় একটি ভবনে হামলায় আটজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
মাহমুদ বলেন, এসব হামলা ঘটেছে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর ভেতরে, যেখানে অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েলি সেনারা পিছু হটেছিল। তিনি আরও জানান, খান ইউনিসে ইসরায়েলি বাহিনী আগাম সতর্কতার পর একটি ভবনে বিমান হামলা চালিয়ে সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
যুদ্ধবিরতি ‘নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ’
ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি সর্বশেষ হামলার নিন্দা জানিয়ে যুদ্ধবিরতিকে “নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ” বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, “যুদ্ধবিরতি মানে অস্ত্রের নীরবতা এবং যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টা। গাজার মানুষ একটি প্রকৃত যুদ্ধবিরতির দাবিদার।”
যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর ও কাতারও ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। রাফাহ সীমান্ত পুনরায় খোলার আগে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে মিসর। কাতার বলেছে, এই সহিংসতা যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, শুক্রবার রাফাহ এলাকায় একটি সুড়ঙ্গ থেকে আটজন ফিলিস্তিনি যোদ্ধা বেরিয়ে আসার ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে, যা তাদের মতে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন।
তবে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য সুহাইল আল-হিন্দি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আজ যা ঘটেছে তা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ। এই অপরাধী শত্রু কোনো চুক্তি মানে না।”
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫২৪ জন ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন।
রাফাহ সীমান্ত পুনরায় খোলার প্রস্তুতি
রাফাহ শহরের বাসিন্দারাও শনিবার ইসরায়েলি বিমান হামলার খবর দিয়েছেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর রোববার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় খোলার কথা রয়েছে, যা গাজা ও মিসরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
এই সীমান্ত খুলে দেওয়ার বিষয়টি যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের অংশ। তবে ইসরায়েল জানিয়েছে, শুধুমাত্র নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সীমিত চলাচল অনুমোদন দেওয়া হবে। কোনো মানবিক সহায়তা বা পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ আল জাজিরাকে বলেন, গাজার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি চরম সংকটাপন্ন। দ্রুত চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশ এবং আহতদের বাইরে চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
রাফাহ সীমান্ত মিসর, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি মিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হলেও, কারা প্রবেশ বা বের হতে পারবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরায়েলের হাতে।
হামাস এই ঘোষণার পর সীমান্ত দিয়ে নিষেধাজ্ঞাহীন চলাচলের আহ্বান জানিয়ে যুদ্ধবিরতির সব শর্ত পূরণে ইসরায়েলের প্রতি অনুরোধ করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৬০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।





