নতুন নিরাপত্তাপ্রধানের সর্তকতা বার্তা
দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি ইরানের
প্রায় ছয় মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলা যুদ্ধের পরও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি ইরান। দেশটির নতুন নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ ও অবরোধ বন্ধ, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না তেহরান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রেজাই বলেন, ‘ইরানের বার্তা স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও অবরোধ বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না। ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়তে হবে এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে।’
আরও পড়ুন: দুই সন্তানের জন্য হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ছেন লেভিট
তিনি আরও বলেন, সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। রেজাই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক যুদ্ধকালীন প্রধান কমান্ডার।
ইরানের আগের নিরাপত্তাপ্রধান মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর এবং নতুন দায়িত্ব পাওয়া সামরিক কর্মকর্তারাও একই ধরনের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে তারা প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত এবং সক্ষম।
আরও পড়ুন: ২০২৫ সালে ইয়েমেনে মার্কিন হামলায় ১৫৩ বেসামরিক নিহত
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মঙ্গলবার প্রথম বৈঠকে চীনের তেহরানস্থ রাষ্ট্রদূত কং পেইউয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন রেজাই। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৈঠকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার ওপর জোর দেন তিনি। জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত প্রস্তাবে চীনের সমর্থন না দেওয়ারও প্রশংসা করেন রেজাই।
এ সময় তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি হলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয় থেকে আলাদা থাকবে।
তবে তেহরান গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে এবং শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু এখনো সেই সমঝোতা বাস্তবায়নের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতেও সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
রোববার রাতে ওমানের উপকূলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে কোনো একটি বস্তু আঘাত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সময়ই রেজাইকে ইরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধান হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এরপর মঙ্গলবার ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতিরা লোহিত সাগরে একটি মিসরীয় মালিকানাধীন জাহাজে হামলা চালায়। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার জানিয়েছে, ওই হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন।
একই রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করতে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এপ্রিল থেকে মার্কিন বাহিনীর হামলার শিকার হওয়া জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২টিতে। প্রায় এক মাস আগে অবরোধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর এটি ছিল তৃতীয় জাহাজে হামলার ঘটনা।
এদিকে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ৬০ দিনের মেয়াদ আগামী সপ্তাহে শেষ হতে যাচ্ছে। ওই সমঝোতা একাধিকবার লঙ্ঘিত হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এখনো দুই পক্ষকে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে গত এক সপ্তাহে ইরানের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বেসামরিক অবকাঠামোতে আরও হামলার হুমকি দেওয়ার পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বুধবার বলেন, ইরানকে আবার হুমকি দেওয়া হলে বিশ্বের জ্বালানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র, মার্কিন ও অন্যান্য দেশের বিভিন্ন ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত বৈশ্বিক অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের আগে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি যুদ্ধজাহাজ ছিল। কিন্তু বর্তমানে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজও নেই।
আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দাবি করেন, যুদ্ধ চললেও ইরান যে পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি করছে, তা বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহারের চেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, যুদ্ধ কয়েক বছর ধরে চললেও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুদের লক্ষ্য করে আঘাত হানতে থাকবে।
সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন
এদিকে চলতি সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি পদে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে সামরিক নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করেছেন।
দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হোসেইন তাইবকে আইআরজিসির আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের নতুন প্রধান করা হয়েছে। এছাড়া খাতাম আল-আনবিয়া যৌথ যুদ্ধকালীন কমান্ডের প্রধান আলী আবদোল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান করা হয়েছে।
আবদোল্লাহির দায়িত্বের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ, স্থল, সাইবার ও অসম যুদ্ধের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির আশপাশে নৌবাহিনীর প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার আহমাদ ভাহিদি বলেন, ‘জায়নিস্ট-আমেরিকান ঔদ্ধত্যের’ বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে কাজ করবেন।
অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হওয়ায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বুধবার সতর্ক করে বলেন, দেশের ভেতরে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা করতে পারে বিরোধীরা।
তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধ আগের চেয়ে জটিল এবং শত্রুরা দেশের ভেতর থেকে পতন ঘটানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশের সীমান্তরক্ষী পুলিশের প্রধান আলী আকবর জাভিদান দাবি করেছেন, ইরাকভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি যোদ্ধারা ইরানের ভূখণ্ডে স্থল হামলা চালাতে পারে—যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবি ভিত্তিহীন।
প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরানে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর হওয়ার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা জামশিদ আল জাজিরাকে বলেন, ‘কী ঘটতে যাচ্ছে, তা অনুমান করাই ছেড়ে দিয়েছি। এ বছর, এমনকি হয়তো আগামী বছরও পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করি না। শুধু আশা করি, এই পরিস্থিতি যেন আর বেশি দিন না চলে।’
সূত্র: আল-জাজিরা





