নরসিংদী ড্রিম হলি ডে পার্কের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলা
ক্ষুব্ধ সাংবাদিক সমাজ, আসামি গ্রেপ্তারে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
নরসিংদীতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আল্টিমেটাম দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)। সংগঠনের সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল এই আল্টিমেটাম দিয়ে বলেছেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে এজাহারনামীয় আসামিদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছবি প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় নরসিংদী জেলার এসপি ও মাধবদী থানার ওসির অপসারণের দাবিতে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) চত্বরে ক্র্যাবের আয়োজনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। পাশাপাশি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইজিপি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে বলে জানান ক্র্যাব সভাপতি।
আরও পড়ুন: পিমার উদ্যোগে বনভোজন ২০২৬ অনুষ্ঠিত, পেশাগত ঐক্য ও মর্যাদা রক্ষার আহ্বান
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম, বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ), ডিফেন্স জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (ডিজাব), রিপোর্টার্স এগেইনস্ট করাপশন (র্যাক), পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরাম, ঢাকা মেডিকেল রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ট্রান্সপোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা জার্নালিস্ট কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংহতি প্রকাশ করেন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) পিকনিকের বাসে চাঁদার দাবিতে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে সাংবাদিক সমাজ। ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বা আইজিপি কেউই ক্র্যাবের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, আহতদের দেখতেও যাননি—যা খুবই দুঃখজনক। নরসিংদীতে যারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে তারা চিহ্নিত চাঁদাবাজ। তাদের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশ রয়েছে। কারণ পুলিশও ওইসব চাঁদাবাজদের কাছ থেকে ভাগ পায়। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি নরসিংদী জেলার এসপি ও থানার ওসির অপসারণের দাবি জানান।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণ নিলেন ৫০ সাংবাদিক
ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, ক্রাইম রিপোর্টাররা যখন আঘাতপ্রাপ্ত হন তখন বোঝা যায় দেশের কী অবস্থা। এ ঘটনায় কারা জড়িত তা স্পষ্ট। তাই অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন নরসিংদীর ঘটনাকে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এ ঘটনা খুবই ন্যাক্কারজনক। অবিলম্বে আসামি গ্রেপ্তার না হলে ঢাকা অচল করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তিনি বলেন, স্বাধীনভাবে কথা বলার জন্যই শেখ হাসিনাকে তাড়িয়ে দিয়েছে এ দেশের মানুষ। সরকারের সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রমে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এদের দিয়ে কিছু হবে না, যার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
প্রতিবাদ সভায় ক্র্যাব সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ্ বলেন, ভিডিও ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজে শনাক্ত হওয়া আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার না করা প্রশাসনিক গাফিলতি। ঘটনার পরপরই অভিযান শুরু না করে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে আসামিদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে পুলিশ। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানান তিনি।
ক্র্যাবের সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান কামাল বলেন, ঘটনার পর পুলিশকে অবগত করা হলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা খুবই দুঃখজনক।
ক্র্যাবের সাবেক সভাপতি মধুসূদন মণ্ডল বলেন, ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা ও এজাহার দেওয়ার পরও মাত্র কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামি ধরতে এত সময় লাগার কথা নয়।
ক্র্যাবের সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান খান বলেন, ট্রিপল নাইন নম্বরে কল করলে ১০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বাধ্য। কিন্তু এত বড় ঘটনা ঘটার পর আধা ঘণ্টা পরে পুলিশ গেছে। আগে গেলে আরও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যেত।
ক্র্যাবের সাবেক সহসভাপতি শাহীন আব্দুল বারী বলেন, এই নির্মম হামলার দায় ড্রিম হলি ডে পার্ক কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
ঢাকা জার্নালিস্ট কাউন্সিলের সভাপতি ইকরামুল কবীর টিপু বলেন, সাংবাদিকদের পিকনিকের গাড়িতে হামলার ঘটনা সরকারের নতুন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রমাণ।
জাতীয় প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মোমিন হোসেন বলেন, এটি পুলিশের চরম ব্যর্থতা। এসপি এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। এই দায় তাকেই নিতে হবে।
ক্র্যাবের সহসভাপতি জিয়া খান আগামীতে ২৬ জানুয়ারি ‘ব্ল্যাক ডে’ ঘোষণা করার দাবি জানান।
বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএসআরএফ) সভাপতি মাসুদুল হক বলেন, আসামি ধরতে কেন মানববন্ধন করতে হবে—এই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বিএসআরএফ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ বাদল বলেন, দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ক্র্যাবের প্রতিটি পদক্ষেপে তারা পাশে থাকবেন।
ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি হাসান জাবেদ বলেন, সাংবাদিকরা কোথাও নিরাপদ নন—এটাই এই ঘটনার প্রমাণ।
ডিফেন্স জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
রিপোর্টার্স এগেইনস্ট করাপশনের সভাপতি সাফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে পরিবারসহ পিকনিকে গিয়েও মানুষ নিরাপদ নয়।
পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি খোন্দকার কাওছার হোসেন বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে প্রশাসন কেন ব্যর্থ—সে প্রশ্নের উত্তর চাই।
প্রতিবাদ সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা মেডিকেল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বাবু, ট্রান্সপোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি আজিজুল হাকিমসহ অনেকে।
উল্লেখ্য, ২৬ জানুয়ারি ড্রিম হলিডে পার্কের সামনে ক্র্যাবের পিকনিকের বাসে চাঁদার দাবিতে হামলা চালায় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। এতে অন্তত ১০ জন ক্র্যাব সদস্য আহত হন, যাদের চারজনের অবস্থা গুরুতর। এ ঘটনায় নরসিংদীর মাধবদী থানায় একটি মামলা হয়েছে।





