যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে পদোন্নতির অভিযোগ

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:০২ পূর্বাহ্ন, ০৮ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৬:২৪ অপরাহ্ন, ০৯ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের গত ০৪ মার্চ ২০২৬ তারিখের ৩৪.০০.০০০০.০০০.০৫১.১২.০০৩৬.২৪.৯৪ সংখ্যক স্মারক মোতাবেক গ্রেড–১৪ থেকে একলাফে গ্রেড–৯ এ পদোন্নতি নিয়ে বিতর্ক। 

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে সম্প্রতি উচ্চমান সহকারী ও সার্ট মুদ্রাক্ষরিক  কাম কম্পিউটার অপারেটর(গ্রেড-১৪) পদ থেকে সরাসরি গ্রেড–৯ম গ্রেডের সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনায় তীব্র অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিদ্যমান নিয়োগবিধি অনুযায়ী এ ধরনের পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই এবং পুরো প্রক্রিয়াটি বিধিবহির্ভূতভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: প্রথম সংসদ অধিবেশনেই তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ আইন পাস হবে : তথ্য মন্ত্রী

জানা গেছে, এই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে মূলত একটি রিট মামলার প্রেক্ষাপটে, যেখানে ১৯৯৩ সালের পুরোনো নিয়োগবিধির বিধানকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কার্যকর রয়েছে ২০১২ সালের নিয়োগবিধি, যেখানে গ্রেড–১৪ থেকে সরাসরি গ্রেড–৯ এ পদোন্নতির কোনো বিধান নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে বিদ্যমান বিধি উপেক্ষা করে এ ধরনের পদোন্নতি কার্যকর করা হলো।

পদোন্নতির জন্য শূন্য পদ নেই

আরও পড়ুন: জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামানো হচ্ছে মোবাইল কোর্ট

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালকের মোট অনুমোদিত পদ সংখ্যা ১৫৫টি। পূর্ববর্তী নিয়োগবিধি অনুযায়ী এই পদগুলোর একটি অংশ পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত ছিল।

১৯৯৩ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী মোট পদের এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৫২টি পদ ছিল পদোন্নতির জন্য সংরক্ষিত। পরে ২০০৪ সালের নিয়োগবিধিতে তা বৃদ্ধি করে মোট পদের অর্ধেক, অর্থাৎ ৭৩টি পদ পদোন্নতির জন্য নির্ধারণ করা হয়।

বর্তমানে কার্যকর ২০১২ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী সহকারী পরিচালক পদের ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১০টি পদ পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত। কিন্তু অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ইতোমধ্যে ১১২ জনেরও বেশি কর্মকর্তা পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন। ফলে নির্ধারিত পদসংখ্যা পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত কর্মকর্তাও কর্মরত থাকায় বর্তমানে পদোন্নতির জন্য কোনো শূন্য পদ অবশিষ্ট নেই।

শূন্য পদ বর্তমানে সরাসরি পদায়নযোগ্য

অন্যদিকে সহকারী পরিচালক পদের যেসব শূন্য পদ রয়েছে, সেগুলো পদোন্নতির জন্য নয় বরং ২০১২ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী সরাসরি নিয়োগের জন্য নির্ধারিত। এ পদগুলোতে নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সুপারিশও করেছে।

তবে পিএসসি’র সুপারিশকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে একটি রিট মামলা চলমান রয়েছে। কারণ বর্তমানে চলমান নতুন নিয়োগবিধি-২০২৩ অনুযায়ী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদ ও  সহকারী পরিচালক সমগ্রেড হওয়ায় সহকারী পরিচালক  পদে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের থেকে পদায়ন যোগ্য ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব শূন্য পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়ারও সুযোগ নেই। ফলে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় একই পদে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

পুরোনো নিয়োগবিধির প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল

১৯৯৩ সালের নিয়োগবিধিতে গ্রেড–১৪ থেকে গ্রেড–৯ এ পদোন্নতির বিধান থাকলেও তখন গ্রেড–১৪ এবং গ্রেড–৯ এর মধ্যবর্তী কোনো পদ ছিল না। তাই সে সময় এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

পরবর্তীতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে প্রায় ১৫০০টির বেশি ১১তম গ্রেডের পদ এবং প্রায় ৫০৫টির বেশি ১০ম গ্রেডের পদসহ নতুন তিন হাজারেরও বেশি পদ সৃষ্টি করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে নতুন নিয়োগবিধি প্রণয়ন করা হয় এবং পরে আরও কিছু নতুন পদ সৃষ্টির কারণে ২০১২ সালে সংশোধিত নিয়োগবিধি কার্যকর করা হয়।

২০০৪ ও ২০১২ সালের উভয় নিয়োগবিধিতেই সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতির জন্য উপজেলা বা থানা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদেরকে ফিডার পদ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

আদালতের মামলার পটভূমি

১৪তম গ্রেডভুক্ত কিছু কর্মচারী এই বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেন। তাদের দাবি ছিল, ১৯৯৩ সালের নিয়োগবিধির মতো নতুন নিয়োগবিধিতেও তাদের পদোন্নতির সুযোগ রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মামলার সময় সরকার পক্ষ আদালতে প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে ১৯৯৩ সালের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তীতে নতুন পদ সৃষ্টির বিষয়টি তুলে ধরা হয়নি। ফলে মামলার রায়ে সরকার পক্ষ পরাজিত হয়।

এ বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে যে, রিটকারীদের অন্যতম একজন—প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত থেকে  সাঁট মুদ্রাক্ষরিক জনাব শহীদুল ইসলাম—ব্যক্তিগতভাবে মামলার বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করেছেন এবং আদালতের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করেছেন ও সরকার পক্ষের উকিলের সাথে লিয়াজো রক্ষা করে সঠিক তথ্য গোপন করেছেন।

আপিলেও সফল হয়নি সরকার

হাইকোর্টের রায়ের প্রায় ২২৫ দিন পর আপিল দায়ের করা হয় বলে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় পর আপিল করায় তা খারিজ হয়ে যায়। একইভাবে রিভিউ আবেদনেও সরকার পক্ষ সফল হতে পারেনি।

আদালতের রায় উপেক্ষার অভিযোগ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের রায়ে মূলত রিটকারীদেরকে ভবিষ্যৎ নিয়োগবিধিতে সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতির ফিডার পদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগবিধিতে সংশোধন না এনে, পদোন্নতির শূন্য পদ আছে কি না তা যাচাই না করে, সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা তৈরি না করেই সরাসরি পদোন্নতির প্রস্তাব তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যা অনেকের মতে আদালতের রায়েরও পরিপন্থী।

কর্মকর্তাদের মাঝে হতাশা ও কর্ম অনীহা বিরাজমান 

সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই বিতর্কিত পদোন্নতির কারণে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে দীর্ঘ ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে একই পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও কর্ম অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার যথাযথ মূল্যায়ন না হলে প্রশাসনিক কাঠামোয় অসন্তোষ আরও বাড়বে।

এছাড়া অভিযোগ উঠেছে, পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এখনও অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত থেকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ইচ্ছেকৃতভাবে তথ্য গোপন করে এই মামলা পরাজয়ের মাধ্যমে দাপ্তরিক কোন্দল সৃষ্টি করছেন ফলে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক শৃঙ্খলার রক্ষা উদ্বেগজনক।

তাছাড়া শহীদ প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকারের যুব সমাজ সংক্রান্ত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে অগ্রগামী ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন,কিন্তু পদোন্নতি জনিত এই অনিয়ম যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে  মারাত্মক ভাবে দাপ্তরিক জটিলতা সৃষ্টি হবে এবং বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ও উদ্দেশ্য ক্ষুন্ন হবে।

 তাই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ও দেশ নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে সঠিক ব্যবস্থা নিতে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।