শিশু নির্যাতন বন্ধে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন জরুরি: ডেপুটি স্পিকার

Sadek Ali
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৮:২৫ অপরাহ্ন, ০৬ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১০:১৩ অপরাহ্ন, ০৬ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন এবং নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে সামনে আসছে। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের খবর সমাজকে নাড়া দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ পাচ্ছে, আবার অনেক ভুক্তভোগী পরিবার সামাজিক চাপ, ভয় কিংবা প্রভাবশালীদের কারণে বিচারপ্রক্রিয়ায় এগোতে পারে না। এমন বাস্তবতায় জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “শিশু নির্যাতন একটি গুরুতর সামাজিক ব্যাধি, যা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব নয়।”

শিশু নির্যাতন এখন জাতীয় সংকট

আরও পড়ুন: এরদোগানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নির্যাতন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। শারীরিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অনলাইন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিপীড়ন এবং শিশু পাচারের মতো অপরাধ নতুন নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

শনিবার রাজধানীর শাহবাগে এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজেরও সমান দায়িত্ব।

আরও পড়ুন: অবর্ণনীয় দুর্ভোগে ঢাকায় ফিরছে কর্মজীবী মানুষ

তিনি বলেন, “আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।”

ধর্ষণের পর হত্যা: সবচেয়ে নৃশংস অপরাধ

দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশু ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে দেখা গেছে, অনেক অপরাধী ধর্ষণের প্রমাণ গোপন করতে ভুক্তভোগীকে হত্যা করে। এতে অপরাধের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের পর হত্যা কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে নৃশংস অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এমন অপরাধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।

রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।” তার এই বক্তব্য বিচারপ্রত্যাশী পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়নে ঘাটতি

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য একাধিক আইন রয়েছে। এর মধ্যে শিশু আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, দণ্ডবিধি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আইন থাকার পরও কেন শিশু নির্যাতন কমছে না?

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

অপরাধের অভিযোগ দায়ের করতে অনীহা বা ভয়; তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা;, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব;,সামাজিক চাপ ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ;, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি;, এবং শিশু-বান্ধব তদন্ত ও আদালত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

ডেপুটি স্পিকারও তার বক্তব্যে শিশু নির্যাতনের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে বিদ্যমান আইন, নীতি ও সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

জাতীয় শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স কেন জরুরি ?  

শিশু অধিকারকর্মীরা মনে করেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যখাত এবং সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধ বা দ্রুত প্রতিক্রিয়া সম্ভব হয় না।

অনলাইন নির্যাতন: নতুন হুমকি

বর্তমান সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের একটি বড় অংশ ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমিং প্ল্যাটফর্ম, মেসেজিং অ্যাপ এবং বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে শিশুদের টার্গেট করছে অপরাধীরা।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, “বর্তমান সময়ে শিশুদের প্রতি শারীরিক, মানসিক এবং অনলাইনভিত্তিক নির্যাতনের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদের প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রশিক্ষণ এখন সময়ের দাবি।

কঠোর বিচার ও সামাজিক প্রতিরোধ একসঙ্গে প্রয়োজন : 

শিশু নির্যাতন মোকাবিলায় শুধু কঠোর শাস্তি যথেষ্ট নয়। অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য পরিবারকে হতে হবে প্রথম নিরাপদ আশ্রয়স্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে হতে হবে জিরো-টলারেন্স জোন এবং সমাজকে হতে হবে অপরাধবিরোধী।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, “কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী হতে হবে।” তার এই বক্তব্য শিশু সুরক্ষায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করার এখনই সময়

একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। অথচ সেই শিশুরাই যদি ঘর, স্কুল, রাস্তা কিংবা অনলাইন জগতে নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সব অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

তাই শিশু নির্যাতনকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের প্রস্তাবিত জাতীয় শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স বাস্তবায়িত হলে শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন কাঠামোগত উদ্যোগের সূচনা হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সমাজের সর্বস্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। কারণ নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো জাতির সম্মিলিত অঙ্গীকার।