দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:২৬ অপরাহ্ন, ১১ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৪:২৬ অপরাহ্ন, ১১ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের ইতিহাসের রেকর্ড ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার নিট ঘাটতি এবং ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় নতুন সরকারের হয়ে প্রথম এবং দেশের ৫৫তম এই মেগা বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই ঐতিহাসিক বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এটিই প্রথম বাজেট উপস্থাপন। সংসদে এই বাজেট উত্থাপনের আগে মন্ত্রিপরিষদ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট অনুমোদন দেয়।

আরও পড়ুন: কড়াইল জামাইবাজারে ঢাকা ওয়াসার গভীর নলকূপ উদ্বোধন

এবারের বাজেটে অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রেীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় কর কাঠামোয় বড় ধরনের ওলটপালট আনা হচ্ছে।

উন্নয়ন ও ভর্তুকিতে বিশাল বরাদ্দ

আরও পড়ুন: দ্বিতীয় যমুনা ও তৃতীয় মেঘনা সেতুর পরিকল্পনা

বাজেটের আয় ও ব্যয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বরাবরের মতোই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির (ADP) ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে। এই উন্নয়ন বাজেটের ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা মেটানো হবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এবং বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা প্রকল্প ঋণ বা বৈদেশিক সহায়তা তহবিল থেকে সংস্থানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হচ্ছে, যা মূলত গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য আমদানিতে ব্যয় হবে।

রাজস্ব আদায়ের মূল দায়িত্বে এনবিআর

বিশাল অংকের এই বাজেটের ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান দায়িত্বটি থাকছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের (NBR) ওপর, যাদের একাই কর হিসেবে আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

এনবিআরের আওতায় এবার সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট (VAT) খাতে—২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎস আয়কর ও মূলধনী মুনাফা থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

রেকর্ড ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা

বিশাল ব্যয়ের এই প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের তুলনায় খরচের পরিমাণ বেশি হওয়ায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার মতো নিট বাজেট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস (ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র) থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এই ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে বাজেটে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধের পেছনেই চলে যাবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেই আগামী বছরের জন্য দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

দাম বাড়ছে যেসব পণ্যের

নতুন বাজেটে কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের কারণে খুচরা বাজারে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে:

সিগারেট ও নিকোটিন পণ্য: ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের মূল্য স্তরভেদে ৬২ টাকা, ৯২ টাকা, ১৬০ টাকা এবং ২১০ টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে প্রতি প্যাকেটে অন্তত ৫ থেকে ৭ টাকা দাম বাড়বে।

মদ ও অ্যালকোহল: কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মতো দেশীয় মদের ওপর প্রতি লিটারে ৫০০ টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের পাশাপাশি বিদেশি মদ আমদানির শুল্ক আরও বাড়ানো হচ্ছে।

কাজুবাদাম ও হিমায়িত মাছ: কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং বিদেশি হিমায়িত মাছে ১৫ শতাংশ নতুন ভ্যাট বসছে।

এমএস রড: নির্মাণ খাতের প্রধান উপাদান এমএস রডের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও কর প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।

বিলাসী প্রসাধনী: ১০টিরও বেশি ক্যাটাগরির বিদেশি প্রসাধনী ও বিলাসী পণ্যের ওপর আমদানি পর্যায়ে নতুন করে ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

স্বস্তির তালিকায় ইলেকট্রনিক্স ও নিত্যপণ্য

সাধারণ মধ্যবিত্ত ও ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে বেশ কিছু পণ্যের শুল্ক ও ভ্যাট কমানো হয়েছে:

ফ্রিজ ও এসি: দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ফ্রিজ ও এসির উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট বর্তমানের ১৫ শতাংশ থেকে একলাফে অর্ধেক কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মোবাইল ও ল্যাপটপ: স্থানীয় মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ শিল্পের জন্য বিদ্যমান ভ্যাট সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য: চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের সরবরাহে বিদ্যমান উৎসে কর কমিয়ে অভিন্ন ০.৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ইলেকট্রিক গাড়ি (EV): পরিবেশবান্ধব ইভি আমদানিতে বিদ্যমান ৯৩ শতাংশের বিশাল শুল্ক-কর বড় আকারে কমানোর প্রস্তাব আসছে।

চিকিৎসা ও সৌবিদ্যুৎ: সোলার ইকুইপমেন্ট ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আমদানিতে শুল্কের হার শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট ও ওষুধের ওপর শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।

ব্যক্তি শ্রেণিতে ৫ বছরের ঐতিহাসিক আয়কর রোডম্যাপ

এবারের বাজেটের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য দেশে প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা। মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করে সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে (২০২৬-২৭ ও ২০২৭-৮ করবর্ষের জন্য)।

ভবিষ্যৎ করমুক্ত আয়সীমার রোডম্যাপ:

২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষ: ৪ লাখ টাকা।

২০৩০-৩১ করবর্ষ: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্য সুবিধা:

নারী ও প্রবীণ নাগরিক (৬৫+): করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে ৪ লাখ ২৫ হাজার থেকে শুরু হয়ে ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৫ লাখ টাকা করা হবে।

তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী: করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে ৫ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও 'জুলাই যোদ্ধা': গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং গণঅভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে ৫ লাখ ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বিশেষ ছাড়: প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রত্যেক পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা আয় করমুক্ত হিসেবে গণ্য করার সুবিধা রাখা হয়েছে।

উচ্চ আয়ের ওপর বাড়তি করের থাবা

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য বিদ্যমান প্রগতিশীল করব্যবস্থা বহাল থাকলেও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর তুলনামূলক বেশি কর আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-৮ করবর্ষে ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের জন্য সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এর বেশি আয় হলে অবশিষ্ট অংশের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে। পরবর্তী করবর্ষগুলোতে (২০২৮-২৯ থেকে) বছরে ৩ কোটি টাকার বেশি আয় হলে অতিরিক্ত অংশের ওপর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপের মাধ্যমে দেশের করব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে। তবে নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংক খাতের ওপর চাপ না বাড়িয়ে এই বিপুল ঘাটতি বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সরকারের জন্য মূল পরীক্ষা।