বিমানবন্দরে হয়রানি চরমে, যাত্রীসেবা বেহালদশা
দেশের প্রধানতম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী সেবার মান স্মরণকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিমানবন্দরে প্রবেশ থেকে বিমানে ওঠা পর্যন্ত পদে পদে বেড়েছে চরম হয়রানি। প্রবাসী শ্রমিক বাংলাদেশিসহ যাতায়াতকারী দেশি-বিদেশি অতিথিরা অসম্মানিত হওয়ায় দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে বহির্বাংলাদেশে। নতুন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এডিয়েশন কর্মকর্তারা বারবার পরিদর্শন করে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজমান। বর্তমানে পদে পদে ভোগান্তি আর যাত্রী হয়রানির আরেক নাম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিদর্শন ও গত ১৫ দিন ধরে যাতায়াতকারী অনেক যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে কোনভাবেই বন্ধ হচ্ছে না হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী হয়রানি। দিনের পর দিন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রবাসীরা বলছেন, অব্যবস্থাপনার কারণেই ঘটছে এমনটা। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধের কঠোর নির্দেশনা দেয়া থাকলেও কাজ হচ্ছে না কিছুতেই। প্রবাস থেকে দেশে ফেরা যাত্রীদের রিসিভ করতে শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনালের পাশে তাই অপেক্ষা স্বজনদের। তবে বিমান সময় মতো অবতরণ করলেও, নানা জটিলতায় কারণে বের হতে সময় লাগে তিন থেকে চার ঘন্টা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রেমিটেন্স যোদ্ধারা।
আরও পড়ুন: নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে নতুন আলোচনা
প্রবাসীদের ভাষ্যমতে, অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণে দিনের পর দিন বাড়ছে এমন ভোগান্তি। তারা বলেন, বিশ্বের কোন বিমানবন্দরেই এতো বিলম্ব হয় না আমাদেরকে নিজ দেশের বিমানবন্দরে যতটা দেরি আর হয়রানির শিকার হতে হয়। আমরা চাই যাতে করে খুব দ্রুত এই সমস্যাটা ঠিক হয়ে যায়। কেউ একজন বাইরের কোন দেশ থেকে এলে তার সাথে যা তা ব্যবহার করা হয়। এমনকি গায়ে হাত তোলাও হয়। সব জায়গায়ই আমাদের হয়রানির শিকার হতে হয়।
প্রবাসীরা বলেন, সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ যাতে করে আমাদের এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা হয়। আর আমাদের লাগেজগুলা যাতে কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই দ্রুত দেয়া হয়।
আরও পড়ুন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনবান্ধব করতে ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ নীতি অব্যাহত থাকবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রবাসীদের ধারণা দায়িত্বরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বাড়তি কিছু পাওয়ার আশায় ঢিলেঢলাভাবে কর্তব্য পালন করে। এজন্য সর্বত্র বিশৃঙ্খলা আর হয়রানি প্রকট হয়ে উঠছে।
সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে ভিআইপি-সিআইপি যাত্রীদেরও নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বলতে গেলে বিমানবন্দরের ভেতরে বাইরে কোথাও স্বস্তি পাচ্ছেন না যাত্রীরা। দেখা যায়, কনকোর্স হল, মূল ভবন, ইমিগ্রেশন পুলিশ, কাস্টমস পোস্টসহ ঘাটে ঘাটে চলে হয়রানি ও অসাধারণ। তুই-তোকারি থেকে শুরু করে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছে যাত্রীরা। এছাড়া ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিমানবন্দরে আসা-যাওয়া যাত্রীদের টাকা-পয়সা, মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অহরহই। যাত্রীদের এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সাধ্য অনুযায়ী যাত্রীসেবার মান বাড়াতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তবে কর্তৃপক্ষের জনবল ও অন্যান্য সক্ষমতারও সংকট রয়েছে। নির্বাহী পরিচালক বলেন, ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিমানবন্দর দিয়ে বছরে ৮০ লক্ষ লোক যাতায়াতের সক্ষমতা থাকলেও ২০২৪ সালে ১ কোটি ২৫ লাখ ও ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৭ লাখ লোক যাতায়াত করেছে। অতিরিক্ত ৪৭ লাখ লোকের সার্ভিস দিতে গিয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। জনবল ও লজিস্টিকসের অনেক সমস্যা থাকলেও কর্তৃপক্ষ ম্যানেজ করে সেবা প্রদান করতে। তিনি আরো বলেন, ঢাকা শহরের হাইওয়ের পাশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বেষ্টিত এ বিমানবন্দরে যাত্রীদের এত স্বজনদের চাপ নেওয়ার সক্ষমতা নেই। দুইজনের বেশি যাত্রী সহযোগী না আসার জন্য বারবার নির্দেশনার দিলেও অতিরিক্ত স্বজনদের কারণে বিমানবন্দর কর্মীদের সাথে ঝগড়াঝাটি হচ্ছে। বিমানবন্দর কর্মীরা এ জাতীয় স্বজনদের হামলার শিকার হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। যাত্রীদের মালামাল পরিবহনের ট্রলি স্বল্পতার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় মালামাল পরিবহনের যাত্রীদের এসব ট্রলি অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য ম্যানেজ করতে সমস্যা হচ্ছে। প্রায় চার হাজার ট্রলি থাকলেও যাত্রীদের তুলনায় তাও অনেক কম। লাগেজ ব্যাল্ট বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হলেও তা পরিচালনার দায়িত্বে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। লাগেজ বিলম্বে ও দ্রুত পাওয়ার বিষয়টি তারা দেখেন। বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের সেবা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এয়ারলাইন্সগুলো অতিরিক্ত কাউন্টার দিয়ে তাদের যাত্রীদের সেবা করতে পারে। তিনি বিমানবন্দরে কিছু অনিয়ম স্বীকার করে বলেন, প্রতিদিনই বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অনেককে বরখাস্ত করেছে। বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মানের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সবসময় তৎপর আছে। এজন্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদেরও আরো সচেতন এবং বিমানবন্দরের নিয়মনীতি মেনে চলা উচিত।
তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, হয়রানির হাজারো অভিযোগ নিয়ে একের পর এক বৈঠক, মন্ত্রীপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সিভিল অ্যাভিয়েশনের কড়া তদারকি, প্রশাসনিক নজরদারিসহ গোয়েন্দা বিভাগগুলোর নানামুখী তৎপরতায়ও হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না। কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেরিয়ে আসার মুহূর্তেও দেশে ফেরত বিজনেস ক্লাস যাত্রীদের আটকে দেওয়া হয় নানা অজুহাতে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত ও নাজেহালের শিকার হন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিরা। তারা দেশে ফেরা ও কর্মস্থলের উদ্দেশে দেশত্যাগ- উভয় ক্ষেত্রেই চরম হয়রানি অভিযোগ করেছে। বিমানবন্দরে কাস্টমস চেকিং পয়েন্টে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাঙালিদের পাসপোর্ট হাতে নিয়েই লাগেজ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। ভুক্তভোগী যাত্রীরা মানসম্মানের দিকে তাকিয়ে বিদেশি মুদ্রা হাতে গুঁজে দিয়েই দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
প্রবাসীদের অভিযোগ
শুধু বিমানবন্দরের ভেতরে নয় বাইরেও হয়রানির অভিযোগ আছে। একটা ট্যাক্সি গাড়ি নেয়ার ২০০ টাকার ভাড়া হাজার টাকা চেয়ে বসে। লাগেজ নিয়ে করে টানাটানি। এভাবে অনেক লাগেজ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। পদে পদে টাকা চায়। হাজারো প্রবাসী প্রতিদিন শিকার হন এমন হয়রানির। বিমানবন্দরটিতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুট মিলিয়ে শ’ খানেক বিমানে ওঠানামা করে দেশি-বিদেশি হাজার হাজার যাত্রী। এদের বেশির ভাগই স্বল্পশিক্ষিত প্রবাসী শ্রমিক। এসব যাত্রীর জন্য আরো কয়েক হাজার দর্শনার্থী বিমানবন্দরে যাতায়াত করে। মধ্যপ্রাচ্যের পরেই অভিযোগ মালেশিয়ান এয়ারলাইন্স এর বিরুদ্ধে। যাত্রীসেবায় সবচেয়ে নিম্নমানের মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্স। একদিকে সময়মত বিমান উড্ডয়ন করে না আবার সময় মতো পৌঁছায়ও না। এমনকি বিজনেস ক্লাসের যাত্রীরাও লাগেজ পেতে হয়রানি হয়। এসব যাত্রী ও দর্শনার্থীদের টার্গেট করেই হয়রানি বাণিজ্যের নানা প্রক্রিয়া সচল থাকে।
যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক সময় লাগেজ পেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। আবার কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও লাগেজ পাওয়া যায়। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বলেছেন, লাগেজ খোয়া যাওয়া ও লাগেজ কেটে মূল্যবান মালামাল নিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে ব্যবস্থা নিলেও লাগেজ কাটা পার্টির তৎপরতা বন্ধ হয়নি।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অটোমেশন পদ্ধতি চালু হলেই হবে না। কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনমানসিকতার উন্নতি প্রয়োজন। যাত্রীদের প্রতি তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সিভিল অ্যাভিয়েশন ও কাস্টমসের একটি অসাধু সিন্ডিকেট এসব কাজে জড়িত থাকে আর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে এদের বেশ কয়েকজনকে হাতেনাতে ধরাও হয়েছে। এখন সিসি ক্যামেরার সাহায্যে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার পরও লাগেজ কাটা পার্টি তৎপর রয়েছে। আবার মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। বিমানবন্দর অভ্যন্তরের অন্তত ১২টি ধাপে যাত্রীদের কাছ থেকে চাহিদামাফিক টাকা হাতানোর ধান্দায় নানা রকম হয়রানি চালানো হয়। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে থাকা ব্যাংকের বুথে মুদ্রা সংগ্রহ করতে গিয়েও চরম হয়রানির শিকার হতে হয়। মুদ্রা সংগ্রহে গেলে ব্যাংক থেকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রা নেই। শেষ মুহূর্তে ব্যাংকের আশপাশে অবস্থানকারী অবৈধ মুদ্রা ব্যবসায়ীদের সহায়তা নিতে হয়।





