মন্ত্রিসভায় বড় রদবদলের আভাস: দলেও আসছে পরিবর্তন
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার বাকী আর মাত্র দুিদন। এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। বিশেষ করে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে চলছে নানা ধরনের গুঞ্জন। নতুন রাষ্ট্রপতির শপথের পরই বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ আসার জোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এদিকে দলেও অনেক পরিবর্তন আসছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। সূত্র মতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হচ্ছেন অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। এটি শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আর স্থায়ী কমিটিতে ঢুকতে পারেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আহমেদ আযম খান, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নুরুল ইসলাম মনিসহ কয়েকজন।
আগামী ১৬ আগস্ট বর্তমান সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এর আগে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ছয় মাসের কর্মদক্ষতা, মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সরকারের ভাবমূর্তিতে তাদের ভূমিকা নিয়ে মূল্যায়ন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এ মূল্যায়নের ভিত্তিতে কয়েকজনের দপ্তর পুনর্বণ্টন, কয়েকজনকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া এবং নতুন কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটায় কয়েকজন আসার সম্ভাবনা আছে।
আরও পড়ুন: আগামীকাল জেবিএবি নির্বাচন, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন চার প্রার্থী
মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পরই সচিবালয়জুড়ে শুরু হয় নতুন আলোচনা—কে হচ্ছেন পরবর্তী স্থানীয় সরকার মন্ত্রী? একাধিক সূত্রে জানা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ন্যস্ত হতে পারে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির ওপর। আবার তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে এমন গুঞ্জনও রয়েছে। তাকে দেওযা হতে পারে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে আসতে পারেন ডা. জাহেদুর রহমান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে পরিবর্তন করে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার ওপর। এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অথবা ড. আব্দুল মঈন খানকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, এমন আলোচনাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীকে বহাল রাখতে কোনো সমস্যা হবে না। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সেলিমা রহমানের নাম সম্ভাব্য নতুন মন্ত্রী হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। এছাড়া দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেলও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন এটিও প্রায় নিশ্চিত।
সূত্র আরো জানায়, টেকনোক্র্যাট কোটায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। সরকারের শরিক ও সমমনা দলগুলোর কয়েকজন নেতাকেও মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থর নাম আলোচনায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: আগামী সপ্তাহে ভারত সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী, মোদির সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন সদস্য আমার দেশকে বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ায় সেখানে তো নতুন মন্ত্রীর দায়িত্বে কেউ যাবেন। তবে এখন পর্যন্ত এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ন্যস্ত। ি
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রণালয়গুলোকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ছয় মাস পর কাজের মূল্যায়ন করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন। ১৮০ দিনের সেই সময়সীমা ঘিরে মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে এখন বাড়তি সতর্কতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে দিয়েছে। সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের পাশাপাশি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি, সংসদে উপস্থিতি ও জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও বিভিন্ন মাধ্যমে সরাসরি তথ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী কারও কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্ট না হলে দপ্তর পুনর্বণ্টন কিংবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য রদবদলে রাজনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বাস্তব কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে অগ্রগতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি ও মান, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে নেওয়া উদ্যোগ, মাঠ প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সংসদে জবাবদিহির বিষয়গুলো মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হতে পারে।
সরকারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এমন বিতর্কেও নজর দেওয়া হচ্ছে। কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দেখাতে না পারলেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ না থাকলে তাকে সরাসরি বাদ না দিয়ে সতর্ক করে সময় দেওয়ার নীতি নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ সম্ভাব্য পরিবর্তনে ‘বাদ’ দেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পুনর্বণ্টন ও কর্মদক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।





