নজরদারিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা, আরও রদবদলের আভাস

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৩:২১ পূর্বাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সরকার গঠনের ৬ মাসের মাথায় কলেবর বাড়িয়ে মন্ত্রিসভায় রদবদল করেছে বিএনপি। নতুন করে ৫ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হয়েছেন, একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রী হয়েছেন একজন। ৬ মাসের মাথায় এই রদবদলের কারণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। এছাড়াও একই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ, একজন পূর্ণমন্ত্রীকে সরিয়ে একই পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা এবং শরিক দলের একজন নেতাকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে। কেউ কেউ এটিকে সরকারের ‘স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ হিসেবেই দেখছেন। কারও কারও মতে, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর মধ্যেই আবার মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরেক দফা পরিবর্তন হতে পারে। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের আলোচনায় তা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। অনেকে বলছেন কাজের মূল্যায়ন, সমন্বয় এবং কাজের গতি বাড়াতে মন্ত্রিসভায় রদবদল এনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাছে একটি বার্তাও দিতে চেয়েছেন তিনি। সেটি হলো মন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন হবে নিয়মিত। সরকারের একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলো আরও জানায়, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় আরও পাঁচ থেকে ছয়টি নতুন মুখ দেখা যেতে পারে।

আরও পড়ুন: দুই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মাঝে দায়িত্ব বন্টনের পরিপাত্র জারি

এই দফায় পরিবর্তন এসেছে তথ্য ও সম্প্রচার এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই দুটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা কারণেই প্রধানমন্ত্রী রদবদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে নতুনভাবে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে জহির উদ্দিন স্বপনের জায়গায় নতুন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে আফরোজা খানম রিতাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তার জায়গায় গত ছয় মাস ধরে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পূর্ণ মন্ত্রী করে ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সদ্যসাবেক তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদা ও সুবিধাসহ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রগুলো জানায়, তথ্য মন্ত্রণালয়ের পারফরম্যান্স, নির্দেশনা বাস্তবায়ন, সংকটের সময় যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে অসন্তোষ বাড়ছিল। কয়েকটি নিয়োগ নিয়ে মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কিছু নির্দেশনা ঠিকমতো বাস্তবায়িত হয়নি বলেও সূত্রগুলো জানায়। এছাড়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে জহির উদ্দিন স্বপন ও প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর মধ্যে সমন্বয়ে সমস্যার কথাও উল্লেখ করে সূত্রগুলো।

আরও পড়ুন: একমাসের মধ্যে প্রাথমিকে আসছে নতুন নীতিমালা: শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী

সরকার হাম-এর প্রাদুর্ভাব, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের সময় মন্ত্রণালয় থেকে আরও দ্রুত ও ধারাবাহিক যোগাযোগের আশা করেছিল। এছাড়া মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমও এই মূল্যায়নে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার গঠনের পরপরই আন্দালিব রহমান পার্থ তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নীতিনির্ধারকদের কাছেও নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন।

এদিকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি বাড়াতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তেল-গ্যাস সংকট মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। লোডশেডিং কমাতে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, জহির উদ্দিন স্বপনের এই নতুন দায়িত্বকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে: প্রধানমন্ত্রী হয়তো তাকে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিজের কাছাকাছি রাখতে চেয়েছেন অথবা তার মন্ত্রণালয়ের পারফরম্যান্স এখানে ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, সংকটের সময় সঠিক সময়ে তথ্য সরবরাহ, জনগণকে আশ্বস্ত করা এবং ভুল তথ্য মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়টি পিছিয়ে ছিল।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রগুলো জানায়, কাজের পদ্ধতি ও মন্ত্রণালয় পরিচালনা নিয়ে আফরোজা খানম রিতা এবং রশিদুজ্জামান মিল্লাতের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছায়। এরপরই দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী।

সর্বশেষ গত শুক্রবারের রদবদলের পর প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে, যার মধ্যে ২৮ জন মন্ত্রী এবং ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫ জনের মন্ত্রীর এবং ৫ জন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় আছেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানকে। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও টেকনোক্র্যাট সদস্য হুমায়ুন কবীরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে এই মন্ত্রণালয়ে এখন দুজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন।

দলীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং রোজকার বিষয়গুলোর দায়িত্ব ভাগ করে দিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. খলিলুর রহমান আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম সভাপতি হিসেবে এক বছরের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাজে গতি আনতে এবং মন্ত্রীকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বে সহায়তার জন্য প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে সাচিং প্রু জেরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত জুনে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর পদটি শূন্য ছিল।

মন্ত্রিসভার উদ্দেশ্যে বার্তা

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেন, তারেক রহমান শুরু থেকেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ১৮০ দিন পর সরকারের কাজের মূল্যায়ন করা হবে। তিনি বলেন, কাজের গতি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী যাকে যে দায়িত্ব দেওয়া উচিত মনে করেছেন, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখানে কাউকে অবমূল্যায়ন করা হয়নি। যে যে কাজে দক্ষ, তাকে সেখানেই আনা হয়েছে।

অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, এই রদবদল থেকে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী বেশিরভাগ মন্ত্রীকে আরও কিছুটা সময় দিতে চান। তবে এর মাধ্যমে তিনি এই বার্তাও দিয়েছেন যে পারফরম্যান্স ভালো না হলে সামনে আরও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানউজ্জামান বলেন, প্রশাসনিক গতি বাড়ানো এবং নতুনদের সুযোগ দেওয়ার জন্যই এই রদবদল। তিনি বলেন, মন্ত্রীরা যদি এটিকে তাদের কাজের মূল্যায়ন হিসেবে দেখেন, তবে যারা স্বপদে আছেন এবং যারা নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন—সবার ওপরই ভালো করার চাপ বাড়বে।