জুলাইয়ের অগ্নিকন্যারা একে একে সবাই এনসিপি ছেড়ে গন্তব্য কোথায়
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভেতরে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতায় আপত্তি জানিয়ে একের পর এক নারী নেতা দল ছাড়ছেন বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। এতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের নেতৃত্বে গড়া নতুন এই দলটি বড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে এরই মধ্যে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা পদত্যাগ করেছেন। তিনি আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে, যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন দল ছাড়লেও নির্বাচন করবেন না বলে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: নারীদের এনজিও ঋণের দায়িত্ব নেবে সরকার: মির্জা ফখরুল
এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, যদিও তিনি দল ছাড়েননি। আর যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম নির্বাচনের সময় দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতাকে ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন।
জামায়াত-এনসিপি জোটে আপত্তির সূত্রপাত
আরও পড়ুন: যারাই বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, তাদের ‘গুপ্ত’ বলবেন: তারেক রহমান
এনসিপি সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ছয় নারী নেতা জামায়াতের সঙ্গে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া আসন সমঝোতার বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি তোলেন। বৈঠকে তারা জোট হলে একযোগে পদত্যাগের হুমকিও দেন। তাদের দাবি ছিল— বিএনপির সঙ্গে জোট করা অথবা এককভাবে নির্বাচনে যাওয়া।
এর আগে গত শনিবার জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে এনসিপির ৩০ জন নেতা নাহিদ ইসলামকে চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের ভূমিকা এনসিপির ঘোষিত আদর্শ ও গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি অভিযোগ করা হয়, জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এনসিপির নারী সদস্যদের বিরুদ্ধে অনলাইনে চরিত্রহননের চেষ্টা চালিয়েছে।
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে শঙ্কা
এনসিপির একাধিক নেতা জানান, নারীনেত্রীরা মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে ভবিষ্যতে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আরও সংকুচিত হবে। এ অবস্থান নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
একে একে নারীনেত্রীদের সিদ্ধান্ত
তাসনিম জারা শনিবার রাতে ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়তে ভোটারদের স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেছেন।
তাজনূভা জাবীন রোববার সকালে পদত্যাগ করে জানান, তিনি রাজনীতি ছাড়ছেন না, তবে নির্বাচনে অংশ নেবেন না।
মনিরা শারমিন বলেন, ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণার পর এ ধরনের জোট সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
নুসরাত তাবাসসুম ফেসবুকে জানান, জামায়াতসহ ১০-দলীয় জোটে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মূল বক্তব্য থেকে সরে গেছে।
আর সামান্থা শারমিন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে বাধ্য করবে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দলে থাকা বা না থাকা এবং নির্বাচন করা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি দাবি করেন, নির্বাহী পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই জোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে এনসিপির গঠনে নারী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের এভাবে সরে যাওয়া নবীন দলটির জন্য বড় ধরনের হোঁচট। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন এনসিপির জন্য প্রথম নির্বাচন। এই মুহূর্তে দলটির ভেতরের বিভাজন নির্বাচনী রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।





