‘গুপ্ত’ পরিচয়ে দেশে নতুন জালিম আবির্ভূত হয়েছে: তারেক রহমান

Sadek Ali
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১:৫৯ অপরাহ্ন, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:৪৯ অপরাহ্ন, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জামায়াতে ইসলামকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, ‘‘ বাংলাদেশে নতুন জালেম আর্বিভূত হয়েছে।” বুধবার দুপুরে মহানগর বিএনপি আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘‘ একটি রাজনৈতিক দল যাদের একটি অন্য পরিচয় আছে, জনগণ যাদেরকে অন্য পরিচয়ে চিনে। জনগণ তাদেরকে কি পরিচয়ে চিনে? গুপ্ত পরিচয়ে চিনে। আপনারা চিনেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কারা সেই গুপ্ত। চিনেন আপনারা ? ’’ এই সময়ে উপস্থিত জনসভার মানুষজন সমন্বরে বলে ‘‘জামায়াত।”

জবাবে তারেক বলেন, ‘‘ আলহামদুলিল্লাহ। বর্তমানে বাংলাদেশে এক নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে। এই গুপ্ত সংগঠনের ব্যক্তিরা নতুন জালেমরুপে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশের জনগনের কাছে।”

আরও পড়ুন: জামায়াত প্রার্থী বাদলের মৃত্যু, পুনঃতফসিল ১২ ফেব্রুয়ারির পর

কেনো? তার ব্যাখ্যাও দেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন,  ‘‘এই বাংলাদেশে আবহাওয়ামান কাল ধরে হাজারো বছর ধরে নারী-পুরুষ সকলে মিলে মাঠে কাজ করে। বাংলাদেশে যেমন কৃষক ভাইয়েরা কাজ করে মাঠে, একই ভাবে আমরা জানি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষানীর বোনরাও তারা মাঠে কাজ করে। শুধু মাঠেই নয় বিভিন্ন কল কারখানায় আমরা দেখেছি আমাদের মায়েরা আমাদের বোনেরা আমাদের নারীরা তারা পুরুষের পাশাপাশি কাজ মিলিয়ে কাজ করে তারা যে গার্মেন্ট শিল্প নিয়ে সমগ্র পৃথিবীতে আমরা গৌরব বোধ করি সেই গার্মেন্ট শিল্প টিকিয়ে রেখেছে এই দেশের নারী সমাজ এই দেশের মা-বোনেরা।”

আরও পড়ুন: বিএনপির শাসনামলেই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে: ড. এম এ কাইয়ুম

‘‘আজ আমরা  অত্যন্ত কষ্টের সাথে দেখছি, অত্যন্ত ঘৃণার সাথে দেখছি, এই যে নতুন জালেম যাদেরকে মানুষ গুপ্ত  হিসেবে চিনে, এই জালেমদের নেতা সে দুইদিন আগে প্রকাশ্যে বলেছেন, বাংলাদেশের নারীদেরকে সে একটি অত্যন্ত কলঙ্কিত শব্দ দিয়ে ব্যবহার করেছে। যেই ব্যক্তি বা যেই দলের তার দেশের মা বোনদের প্রতি বিন্দুমাত্র -শ্রদ্ধা নেই, যেই নেতা যেই দলের নেতাকর্মীদের নিজের দেশের মা বোনদের কষ্টের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান নেই… তাদের কাছ থেকে আর যাই হোক বাংলাদেশ কখনো অগ্রগতি আশা করতে পারে না, তাদের কাছ থেকে আর যাই হোক বাংলাদেশের মানুষ আত্মসম্মান মূলক কোনো মর্যাদাপূর্ণ কোন আচরণ আশা করতে পারে না।”

হয়রত মুহাম্মদ (সা.) এর স্ত্রী বিবি খাদিজার কর্মময় জীবন তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘ আমাদের প্রিয় নবী করিমের স্ত্রী এই বিবি খাদিজা উনিও একজন কর্মজীবী মহিলা ছিলেন, উনিও একজন কর্মজীবী মহিলা ছিলেন। উনার নিজের ব্যবসা বাণিজ্য ছিল। যেখানে নবী করীম (সা.) নিজেও কাজ করতেন।”

‘‘ এরা(জামায়াতে ইসলাম) বলে ইসলামের রাজনীতি করে। অথচ নবীর স্ত্রী নিজে যেখানে একজন কর্মজীবী মহিলা ছিলেন সেখানে কেমন করে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কেমন করে সেই রাজনৈতিক দলটি তাবৎ বাংলাদেশের নারী সমাজকে এমন একটি কলঙ্কিত শব্দ জর্জরিত করলো?”

তারেক রহমান বলেন, ‘‘ বদরের যুদ্ধ নিশ্চয়ই আপনারা জানেন কমবেশি সবাই। সেই বদরের যুদ্ধে হযরত আয়েশা তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল, তার নেতৃত্বে যুদ্ধের সকল সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হয়েছিল, তার নেতৃত্বে যুদ্ধে যারা আহত হয়েছিল সেই মানুষগুলোকে নার্সিং, ছিল ট্রিটমেন্ট দেয়া হয়েছিল।”

‘‘  কাজেই আমরা ইসলাম ধর্ম বলে আমরা আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থান বলি সকল জায়গায় নারীদের একটি শক্তিশালী অবস্থান আছে এবং আমরা কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারবো না এই নারীদেরকে পেছনে রেখে, এই নারীদেরকে ঘরে বন্দি করে রেখে কোনভাবেই আমরা বাংলাদেশকে সামনে যেতে পারব… এটি আমরা কখনোই মনে করি না এবং সেইজন্যই দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন উনি বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করে দিয়েছিলেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত।”

ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে  বেলা ১২টায় বরিশালে নামেন তারেক রহমান। সেখানে থেকে মাঠে আসেন ১২টা ২৬ মিনিটে। বক্তব্য শেষ করে বিএনপি চেয়ারম্যান মাঠে ছেড়ে যান ১টা ৪০ মিনিটে। বরিশালের থেকে তরেক রহমান হেলিকপ্টারে ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখবেন তিনি।

‘দেশ গড়তে হলে নারী-পুরুষ সবাইকে লাগবে’

তারেক রহমান বলেন, ‘‘ আজ সময় এসেছে আমাদেরকে দেশ গড়ার। এবং দেশ যদি গড়তে হয় প্রত্যেকটি নারী-পুরুষকে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে কাজ করতে হবে আজকে। তা না হলে এই দেশকে আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো না।”

‘‘ সেজন্যই আমরা এই নারীদেরকে বিশেষ করে গ্রামের খেতে খাওয়া নারী যারা শহরের খেতে খাওয়া নারী যারা কর্মজীবী নারী যারা সহ সকল গৃহিণীর কাছে সকল পরিবারের মাদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই যার মাধ্যমে আমরা এই নারীদেরকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে পারি যেন তারা পুরুষের পাশাপাশি পরিবারে সমাজে দেশে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।”

‘জামায়াতের নাযেবে আমীরের বক্তব্যের সমালোচনা’

তারেক রহমান বলেন, ‘‘ ওই যে গুপ্ত সংগঠনটির আরেকটি ঘটনা বলি। তাদের আরেক নেতা যার বাড়ি কিনা কুমিল্লা জেলায়…. সেই নেতা কিছুদিন আগে তাদের এক দলীয় সমাবেশে বলেছেন তাদের কর্মীদেরকে যে, ১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন। তারপরে বাকি পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণ আপনাদের পা ধরবে।”

‘‘ চিন্তা করুন এই কথা থেকে প্রমাণিত হয, কি তাদের মেন্টালিটি কোন পর্যায়ের মানুষ হলে তারা জনগণকে নিয়ে এরকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কথা বলতে পারে।  এইসব লোক যদি নির্বাচিত হয়, এইসব লোক যদি দায়িত্ব পায় তাহলে আজকেই আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে জনগণের ভাগ্যের কি অবস্থা হবে, দেশের মানুষের ভাগ্যের কি দুর্বিষহ অবস্থা হবে… যাদের মনে এই কথা যাদের মনে এই কথা এবং মনের কথাই বেরিয়ে এসেছে তাদের বাস্তবে।”

‘গুপ্তদের বিরুদ্ধে সর্তক থাকুন

তারেক রহমান বলেন, ‘‘ কাজেই এইসব গুপ্তদের বিরুদ্ধে আপনাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে, সজাগ থাকতে হবে। যারা দেশের মানুষকে সম্মান করতে জানে না, যারা পরিকল্পনা করে রাখে যে,১২ তারিখের পর থেকে তারা জনগণকে নাকে দড়িয়ে ঘুরাবে তাদেরকে উচিত শিক্ষা আপনাদেরকে দিতে হবে। ”

‘‘ এসব গুপ্তরা সেই ৭১ সাল, সেই ৮৬ সাল…. ইতিহাস যদি দেখি আমরা সবসময় যারা দেশ থেকে পালিয়ে গেছে তাদের সাথে সবসময় এপাশ না হলে ওপাশ, এপিঠ না হয় ওপিঠ হিসেবে তারা ছিল। কাজেই তাদের কাছ থেকে দেশের মানুষ ভালো কোন কিছু আশা করতে পারে না। “

‘বরিশালের উন্নয়ন করতে হবে’

১৯৯৩ সালে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরিশালকে বিভাগ ঘোষণার কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘‘এই এলাকায় ১৯৭৮ সালে পল্লী বিদ্যুতের লাইন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। তারপরে নদীর পানি অনেকদূর গড়িয়ে গিয়েছে। আমরা এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করেছি। কিন্তু আরো বহু কাজ করা বাকি। যেমন বরিশাল-ভোলা ব্রিজ এই কাজটি আমাদেরকে করতে হবে।”

‘‘ বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ সেটিকে এলাকার মানুষের চিকিৎসার জন্য উন্নত করতে হবে। ভোলাতে মেডিকেল কলেজের কাজে আমাদেরকে হাত দিতে হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা এই এলাকার নদী ভাঙ্গন সমস্যা মানুষের। যারা আমাদের মুরুব্বি ছিলেন যারা গত হয়েছেন, বিভিন্ন এলাকায় তাদের কবর ভেঙে যাচ্ছে, মসজিদ ভেঙ্গে যাচ্ছে, বাপ-দাদার ভিটে বাড়ি ভেঙে যাচ্ছে। এই বিশাল এলাকাকে আমাদের বেড়িবাঁধ দিতে হবে। এই কাজগুলো যদি করতে হয় তাহলে অবশ্যই আপনাদেরকে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই সকল সমস্যার সমাধান বিএনপি তখনই করতে পারবো যখন আপনারা ধানের শীষকে ইনশাল্লাহ নির্বাচিত করবেন তাহলেই আমরা এই কাজ করতে পারব।”

বরিশালে মৎস্যচাষীদের জন্য হিমাগার নির্মাণসহ বিএনপির ঘোষিত ফ্যামিলী কার্ড, কৃষি কার্ড, বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনসিইটউট প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্য সেবা, খাল খনন প্রভৃতি কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান।

‘ভুয়া ব্যালেট পেপার, সিল ছাপানোর খবর প্রসঙ্গে’

তারেক রহমান বলেন, ‘‘গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিউজে আমরা কিছু খবর দেখতে পাচ্ছি। ওই যে যারা নতুন জালেম হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে, ওই যে যাদেরকে বাংলাদেশের মানুষ গুপ্ত হিসেবে চিনে আমরা দেখেছি কিভাবে তাদের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া সিল তৈরি করছে, আমরা বিভিন্নভাবে শুনতে পাচ্ছি,  যে তাদের পরিচিত যেসব প্রেস আছে সেখানে তারা ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে…যেটি তারা পকেটে করে নিয়ে হবে।”

‘‘ শুধু তাই নয় আমরা এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, বিশেষ করে নিরহ মা-বোন যারা আছেন তাদের কাছে গিয়ে তারা এনআইডি নাম্বার নিচ্ছে, তাদের কাছে গিয়ে তারা বিকাশ নাম্বার নিচ্ছে। “

তিনি বলেন, ‘‘ এই গুপ্তের দল এই জালেমের দল বলে তারা নাকি সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে। আরে ভাই , নির্বাচনের আগেই তো শুনলাম, আপনারা জাল ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছেন, নির্বাচনের আগেই তো দেখলাম আপনাদের লোকজন এনআইডি নাম্বার নিয়ে যাচ্ছেন মা-বোনদের কাছ থেকে,  বিকাশ নাম্বার নিয়ে যাচ্ছেন।”

‘‘ প্রথমেই তো আপনারা অনৈতিক কাজ শুরু করছেন।  অনৈতিক কাজ দিয়ে আপনারা মানুষের ভোটকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছেন। যাদের ভোটের শুরুটাই অনৈতিক কাজ দিয়ে তারা কি করে সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে। তারা কি পারে? পারেন তারা সৎ মানুষের শাসন দিতে।”

‘ভোট হাইজ্যাক করতে যেন না পারে সর্তক থাকুন’

তারেক রহমান বলেন, ‘‘ যারা মা বোনদেরকে অপমান করার পরে তারা বলছেন যে তারা এটা করে নাই। তাদের আইডি বলে হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের কথা অনুযায়ী আইডি কোন হ্যাক হয় নাই। যখন তারা ধরা পড়ে গিয়েছে বিভিন্ন রকম মিথ্যা কথা তারা বলা শুরু করেছে। যারা একটি অপরাধকে ঢাকার জন্য মিথ্যা কথা বলে আর যাই হোক তারা সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে না।”

‘‘ কাজেই এদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আপনাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। আজ এই মাঠে লক্ষ মানুষ যারা আছেন আপনারা স্ব স্ব এলাকায় ফিরে গিয়ে আপনার এলাকার যে সকল ভাই বোন আছে যারা ভোটার আছেন তাদের সকলকে সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলবেন। যাতে করে ১২ তারিখে আপনার অধিকার অন্য কেউ হাইজ্যাক করে নিয়ে যেতে না পারে।”

মহানগর আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুকের সভাপতিত্বে  ও  সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদারের সঞ্চালনায় সমাবেশে দক্ষিনাঞ্চলের ২১ আসনের প্রার্থীরা ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, নুরুল ইসলাম মনি, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন প্রমূখ নেতারা বক্তব্য রাখেন।