বিটিভির ভাষণে নাহিদ ইসলাম
রাষ্ট্র ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার
সামাজিক বৈষম্য দূর করে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
আরও পড়ুন: নির্বাচনী মাঠে প্রশাসনের ‘একপেশে ভূমিকা’ নিয়ে জামায়াতের ক্ষোভ
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট— ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।’
ভাষণে তিনি বলেছেন, 'বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর গত ৫৫ বছরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্য। এরই পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুরোনো কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, আইনের প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত।'
আরও পড়ুন: দেশ পুনর্গঠনই এখন বিএনপির প্রধান লক্ষ্য: তারেক রহমান
তিনি বলেন, 'রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিল এবং ক্ষমতাসীনদের সংস্পর্শে পৌঁছাতে পেরেছে, তারাই শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলে নিয়েছে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিতই থেকে গেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক আনুগত্যই হয়ে উঠেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান শর্ত।'
দেশের উন্নয়ন কাঠামোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা গড়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে। পরিকল্পিতভাবে এই মহানগর ও তার আশপাশে বসবাসকারী দুই কোটি মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বড় বড় সব অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। আর এদের মাথার ওপর বসে রাজধানীকেন্দ্রিক একটি ছোট্ট ধনীক শ্রেণি তৈরি হয়েছে।'
জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, 'এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও পূর্বেকার দুর্নীতিগ্রস্ত বেইনসাফের বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছে।'
ভাষণে তিনি বিগত সময়ে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, 'দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে খুনি হাসিনা গুম, হত্যা, বিনাবিচারে কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা করার ক্ষেত্রে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পরে এর সবগুলোই ভেঙে পড়েছে।'
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, 'আমরা স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছি— বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত লুকিয়ে থাকা সকল অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা হবে।'
ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লুটপাট ও পাচার নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট আওয়ামী ব্যবসায়ী ও আমলারা এই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে— যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে।'
পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'অন্তর্বর্তীকালীন সরকার লুটপাটকৃত এই বিশাল অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালানোর কথা বললেও তাদের অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য অর্জিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত ফ্যাসিবাদী যুগের সুবিধাভোগী কিছু শীর্ষ আমলা ও বিশেষজ্ঞেরা যারা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করায় এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার বিঘ্নিত হয়েছে।'
দুর্নীতিমুক্ত অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট— ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।'
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'খুনি হাসিনার আমলে বাংলাদেশ একটি নতজানু পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে আবদ্ধ ছিল। দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম কার্যত ইন্ডিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো, ফলে স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।'
সীমান্ত হত্যা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'বছরের পর বছর ধরে, সীমান্তে নির্বিচারে গুলি করে ইন্ডিয়ার খুনে বাহিনী বিএসএফ শত শত বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করলেও খুনি হাসিনার সরকার চুপ করে থেকেছে। 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়'— এই স্লোগান আওড়ালেও বাস্তবে খুনি হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ইন্ডিয়ার নির্দেশ পালন করা। সে কারণে পাকিস্তানের প্রতি সর্বক্ষেত্রে বৈরি আচরণ করা হতো।'
এনসিপি ক্ষমতায় এলে পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা কী হবে তা জানিয়ে তিনি বলেন, 'জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয় তাহলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি এবং কারো ওপর অতি নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা হবে। আমরা অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতিকাঠামো ভেঙে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব।'
প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন, 'প্রবাসে থাকা নাগরিকদের সমস্যা সমাধান ও দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল প্রান্তে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করা এবং কূটনীতিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। লক্ষ্য হবে, পৃথিবীর সম্ভাবনাময় সকল দেশে নামমাত্র খরচে জনবল রপ্তানি করা এবং তারা যাতে কোথাও কোনোভাবে হেনস্থার শিকার না হন, সেই সুরক্ষা দেওয়া।' তিনি জানান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতা হবে দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।
উল্লেখ্য, বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে নাহিদ ইসলামের ভাষণটি সম্প্রচারের অনুমতি চেয়ে গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর আবেদন করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।





