ইশরাকের যত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, ২২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, ২২ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

* কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা নাকি অপরিপক্বতা

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগ করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার খবর গণমাধ্যমে আসার পর হঠাৎ করেই গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ইশরাক বিষয়ক খবর ও বয়ান উল্টে গেছে। অথচ এর কিছু আগেও নির্বাচনী এলাকায় মাদক অভিযানে নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র প্রদর্শনে চরম নেগেটিভ আলোচনায় আসেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক। জাতীয় গণমাধ্যম সামাজিক মাধ্যমে সর্বস্তরে এমনকি বিরোধী দলও বিবৃতিতে ইশরাকের বিরুদ্ধে বেআইনী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শাস্তি দাবি করেছিলেন। এতে করে সরকারও বিব্রত হয়ে অবশেষে কঠিন সিদ্ধান্তই নিল। গত কয়েকদিন ধরে জাতীয় গণমাধ্যম সামাজিক মাধ্যমে ইশরাক হোসেনকে নিয়েই চলছে রাজনৈতিক পর্যালোচনা। আমাদের আলোচনার বিষয় হলো রাজনীতিতে ইশরাকের আবির্ভাব কিভাবে। রাজনীতিতে যোগদানের শুরু থেকেই একের পর এক বিতর্কিত ও বিএনপি বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে সব সময়ই বিশেষ স্নেহস্পদ দুর্বলতায় পার পেয়ে যাচ্ছেন। নানা বিতর্ক থাকলেও নির্বাচনে তাকে দলীয় মনোনয়ন এমনকি প্রথমবার এমপি হওয়ার পরই মন্ত্রী করা হয়। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পরও তার আচরণে এবং রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও জাতীয় শক্তি: ডিসি ফরিদা

প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের নির্দেশনার পরেও তার কর্মকাণ্ড নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে একশ্রেণির আলোচনায় এটিকে ইশরাকের অপরিপক্কতা অযোগ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করলেও উঠে এসেছে তার উচিত কর্মকাণ্ডের ঘটনাবলী। ইশরাকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বিএনপি’র বেশ কিছু নেতা কর্মী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাথে কথা বলে অনেক বিতর্কিত চাঞ্চল্যকর ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে স্বার্থ হাসিলের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের নির্দেশনা দেওয়ার পরও তার পক্ষ থেকে এটিকে গুজব হিসেবে উল্লেখ করে বিবৃতি পরবর্তীতে বিএনপি’র বশেষে জনমত গঠনের মাধ্যমে একের পর এক বিতর্কিত কাজের ইতিহাস রচনা করে চলছেন। আর এতে করে দলকেও চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নিজের অবস্থান শক্ত করতে গিয়ে অপরাপর শীর্ষ নেতাদের সম্পর্কেও বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে জোর আলোচনায় আসেন।

তার এইসব কর্মকাণ্ডগুলো খুঁটিয়ে দেখছে বিশ্লেষক ও রাজনীতিকরা। রাজনীতিতে ইশরাক হোসেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো ঢাকার সাবেক মেয়র ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি মরহুম সাদেক হোসেন খোকা জ্যেষ্ঠ পুত্র। পুরান ঢাকা ও বিএনপি রাজনীতিতে খোকা একজন কিংবদন্তি। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার, কারাবরণ, ও অসুস্থ পরবর্তীতে দূরারোগ্য ব্যাধিতে বিদেশে অকাল মৃত্যুতে তার প্রতি সর্বস্তরের মানুষ ও নেতাকর্মীদের শ্রদ্ধা ছিল। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের রাজধানী ঢাকার একজন গেরিলা যোদ্ধা, পরবর্তীতে শহীদ জিয়ার হাতে বিএনপিতে যোগদান, সিটি কর্পোরেশনের প্রথম কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও ৯১ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়ে তাক লাগিয়ে দেন। '৯৬ এর পর বিএনপির ঢাকা মহানগর সভাপতি হয়ে রাজপথের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে তার রক্তমাখা শরীর এখনো বিএনপি নেতাকর্মীদের মনে করিয়ে দেয়। তারই সন্তান হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের প্রতি নেতা কর্মীদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল। পিতার মৃত্যুর পর বিরোধী দলের রাজনীতিতে ইশরাকের পথচলা শুরু হলেও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।

আরও পড়ুন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার দায় ইশরাককে নিতে হচ্ছে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

'১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর হঠাৎ দেশি বিদেশি গোয়েন্দা চক্রে নতুন খেলা শুরু হয় বাংলাদেশ নিয়ে। কথিত আমেরিকান এজেন্টরা রেজিম চেঞ্জ এর নামে বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে মাইনাস করে নতুন প্রক্রিয়ার আভাস দেয়। পরবর্তীতে গঠন করে জাতীয় ইনসাফ কমিটি। প্রথম পর্যায়ে কথিত আন্দোলনের নামে ঢাকা মহানগরে মিছিলের দায়িত্ব দেয় ইশরাক হোসেনকে। তার নেতৃত্বে গুলিস্থান এলাকায় পূর্ব ঘোষিত সেদিন একটি বিক্ষোভ মিছিল করা হয় বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে।

বিএনপি ভাঙ্গার এই ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদসহ কয়েকজনকেও শোকজ করা হয়। এর কিছুদিন পরেই একই চক্র গড়ে তোলে জাতীয় ইনসাফ কমিটি। সেটিতেও ইশরাক হোসেনের ছিল বলিষ্ঠ যোগাসযোগ। যার প্রমাণ হয় ২৮ অক্টোবর ২০২৩ সালে বিএনপি অফিসের সামনে মহাসমাবেশে পলিশি হামলা ও ছত্রভঙ্গ করার পর শত শত নেতা কর্মী আহত হয়। কয়েকজন নিহত হয়। এক সময়ে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে আহতদের দেখতে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কথিত উপদেষ্টা নিয়ে জাহিদুল ইসলাম আরেফী ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান সোহরাওয়ার্দী। পরে ইশরাক হোসেন তাদেরকে হাসপাতাল থেকে নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয় এনে সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হিসাবে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেন।

ঘটনাটি অনেকটা ব্ল্যাকমেইলিং ও মার্কিন দূতাবাস বিবৃতি দেওয়ার পর বিএনপির পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়। ইশরাক হোসেনের এই কাণ্ডে বিএনপির কূটনীতি ও রাজনীতিতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। অতিসত্বর গ্রেফতার করা হয় এই ভুয়া উপদেষ্টাকে। এরপর গ্রেফতার হয় জেনারেল হাসান সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু বাইরেই থাকেন ইশরাক হোসেন। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ইশরাক হোসেন ধানমন্ডিতে অফিস করে সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করেন। তার অফিসের আশেপাশে ব্যাপক ভিড় যানজট বিতর্ক তৈরি করে। মামলা করে মেয়র নির্বাচিত ঘোষণা করেও দায়িত্ব না পেয়ে আন্দোলনেও অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির ভূমিকা চিহ্নিত হয়েছে। রাজনীতিতে যোগদানের পর থেকে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালেও পিতার অবদানের কথা স্মরণ করে সব সময় তাকে কাছে আগলে রাখত দল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিতার আসন থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথম মন্ত্রিসভাতে তাকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান জুলাই যোদ্ধা তালিকা- এ সংক্রান্ত কার্যক্রমও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকায় সরকারের অনেক নীতির কারণে কার্যক্রমে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা হয়েছে।

একজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রুলস অফ বিজনেস প্রটোকল মন্ত্রণের কার্যক্রম সরকারি আচরণবিধি অনুযায়ী কাজ করা যোগ্যতার পরিচয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে সম্প্রতি রাষ্ট্রপতিকে এক অনুষ্ঠানে তিন বাহিনী প্রধানের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র সালাম প্রদান নিয়ে ছবি ভিডিও প্রচারের পর নতুন বিতর্কের তৈরি করে মন্ত্রীর কার্যক্রম নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও নির্বাচনী এলাকায় বিএনপিতে ইশরাকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের শেষ নেই। এরপরও কেবল খোকার পুত্র হিসেবে সবসময়ই তিনি পার পেয়ে গেছেন। বিএনপির সুদিন দুর্দিন কঠিনতম সময়েও সাদেক হোসেন খোকা দৃঢ়, স্থির নির্ভীক চিত্তে জীবনযাপন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছিলেন। কিন্তু পুত্রের হুটহাট অস্থির কর্মকাণ্ডে বিশ্লেষকগণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও পরিপক্কতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার সংশ্লিষ্ট অনেক নেতাকর্মীর সাথে কথা বলে জানা গেছে শুধু কি অপরিপক্কতা না কি দেশে-বিদেশি কোন ষড়যন্ত্র চক্রের ফাঁদে পা দিয়েছেন। তাদের গুটি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছেন- তারা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। সর্বশেষ তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিএনপি'র লন্ডন প্রবাসী বক্তব্য নিয়ে ইঙ্গিতকে ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখছেন অনেকে।