তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
নলছিটি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ৩০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
ঝালকাঠির নলছিটি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মিজানুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাজস্ব ও উন্নয়ন বরাদ্দসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পৌরসভার সাবেক দুই কাউন্সিলর।
সম্প্রতি নলছিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক কাউন্সিলর মো. এনায়েত করিম মিশু ও সরোয়ার হোসেন তালুকদার এসব অভিযোগ করেন। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন প্রকল্পের নথিপত্র, বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরে অভিযোগগুলোর তদন্ত দাবি করেন।
আরও পড়ুন: হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় ‘দিগন্ত মেগা শপ’, গ্রামীণ জনপদে শহরের ছোঁয়া
লিখিত বক্তব্যে তাঁরা জানান, ২০১৭-১৮, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পৌরসভার বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করে অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, গত এক দশকে রাজস্ব, উন্নয়ন বরাদ্দসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সম্প্রতি নলছিটি পৌরসভার সিটিসিআরপি প্রকল্পের আওতায় চারটি রাস্তা নির্মাণে ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। গত মার্চে দরপত্র আহ্বানের পর ৯০ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করার কথা থাকলেও ছয় মাসেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়নের নামে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। এতে দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদাররা পে-অর্ডার জমা দিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: রান্নাঘর থেকে ফিলিং স্টেশন, কুমিল্লায় তীব্র গ্যাস সংকট
সাবেক কাউন্সিলরদের অভিযোগ, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু মশক নিধনে ৩১ লাখ ৩ হাজার টাকা এবং ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ১৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কবরস্থান সংস্কারসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বরাদ্দ মিলিয়ে প্রায় ৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার বেশি অর্থের বিপরীতে বাস্তব কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তাঁরা।
এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১৩টি প্যাকেজে প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার কাজের অধিকাংশেরও বাস্তবে অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ করা হয়।
জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের প্রায় ২ কোটি টাকা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ওই অর্থে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ১১৯টি সোলার স্ট্রিট লাইট ও ৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের কথা ছিল। তবে সরেজমিনে এসব প্রকল্পের অধিকাংশের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কিছু পরিত্যক্ত সড়কবাতিতে অন্য প্রকল্পের স্টিকারের ওপর জলবায়ু ট্রাস্টের স্টিকার লাগানোর অভিযোগও করেন তাঁরা।
তাঁদের দাবি, প্রকল্পের অর্থ থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ নির্ধারিত ১৫ শতাংশ অর্থ কর্তন না করেই পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। নলছিটি পৌরসভায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকার সময় বিধি লঙ্ঘন করে সহকারী প্রকৌশলীকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও করা হয়।
এ ছাড়া পটুয়াখালীর টাউন কলিকাপুর এলাকার রাকিব আহমেদের মালিকানাধীন ‘ফরিদা এন্টারপ্রাইজ’-কে নলছিটি পৌরসভার ঠিকানা ব্যবহার করে কাজ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। কয়েকটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলেও সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
নলছিটি পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ করেছেন সাবেক দুই কাউন্সিলর। তাঁদের দাবি, প্রকল্পের ১২টি প্যাকেজে ৯ কোটি ৯২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৪ টাকা ব্যয় ধরা হয়। কাগজপত্রে বিভিন্ন সময়ে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় ৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও সরেজমিনে রাস্তাগুলোর ২০ শতাংশ কাজও হয়নি। প্রকল্পের ১২টি রাস্তার মধ্যে আটটি এখনো অসম্পূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, প্রকল্প-সংক্রান্ত ফাইলপত্র, মেজারমেন্ট বুকের রেজিস্টার, মূল ফাইল নোট, চেক রেজিস্টার, জিও ও চেকের মুড়ি পৌরসভায় যথাযথভাবে সংরক্ষিত নেই। বিভিন্ন নথিতে প্রায় ৬ কোটি টাকার বিলের হিসাব পাওয়া গেলেও বাকি প্রায় ৩ কোটি টাকার সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।
পৌরসভার রাজস্ব তহবিল নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সাবেক কাউন্সিলরদের দাবি, প্রতি বছর ৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের তথ্য পাওয়া গেলেও ওই অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোনো উন্নয়নকাজ না হলেও পৌরসভার তহবিলে থাকা ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকারও সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।
এদিকে সহকারী প্রকৌশলী মিজানুজ্জামানের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় হুমকি দেওয়ার অভিযোগে গত রবিবার বরিশাল কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
অভিযোগকারীরা বলেন, এসব অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ ও তদন্তের মধ্যেই বিষয়গুলো সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তাঁদের দাবি, সহকারী প্রকৌশলী মিজানুজ্জামান চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে অসম্পূর্ণ উন্নয়নকাজ ও আর্থিক অনিয়মের বিষয়গুলো আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সাবেক দুই কাউন্সিলর অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।





