অপরিকল্পিত উন্নয়নে অস্তিত্ব সংকটে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার আজ ত্রিমুখী সংকটে জর্জরিত। প্রতিনিয়ত সাগরের তীব্র ঢেউয়ের তোড়ে বালি ক্ষয় ও ভাঙন, পলিথিন-প্লাস্টিক বর্জ্যের জটলা এবং তীরবর্তী এলাকায় অপরিকল্পিত ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণে সৌন্দর্য হারিয়ে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে এই পর্যটন নগরী।
কক্সবাজার সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী ও শৈবাল পয়েন্টে সরজমিনে দেখা গেছে ভাঙনের তীব্র রূপ। বিশাল বালিয়াড়ি, সাগরলতা এবং প্রতিরক্ষা ঝাউগাছ উপড়ে পড়ে সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পানির তোড়ে বালু ক্ষয়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত ও গুপ্তখাল, যা সৈকতের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্টের পাশাপাশি গোসল করতে নামা পর্যটকদের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।
আরও পড়ুন: রায়পুরে প্রবাসীর ঘরে দুঃসাহসিক চুরি, স্বর্ণালংকার লুট
ভাঙন ঠেকানোর সাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা বালুভর্তি জিও-ব্যাগ অনেক জায়গায় ছিঁড়ে গিয়ে সৈকতেই মিশে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো উদ্যোগ নেই। ভাঙনের সঙ্গে নতুন সংকট তৈরি করেছে প্লাস্টিক বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা। প্রতিদিন ভেসে আসা পলিথিন, বোতল, চিপসের প্যাকেট এবং উপকূলীয় দোকানের খাবারের বর্জ্য জমে থাকছে সৈকতের বালুচরে। এতে প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে সমুদ্রের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য।
ঢাকার মিরপুর থেকে সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক আসাদ চৌধুরী তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিবার নিয়ে কক্সবাজারের সৌন্দর উপভোগ করতে এসেছিলাম। কিন্তু সৈকত জুড়ে প্লাস্টিকের বর্জ্য আর ভাঙন দেখে খুব খারাপ লাগছে। বাচ্চাদের নিয়ে বালুচরে নিরাপদে হাঁটা কিংবা সাগরে নামার পরিবেশও নেই। এমন অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে পর্যটকরা কক্সবাজার বিমুখ হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ২০ হাজার চারা রোপণ, সবুজায়নের গুরুত্ব তুলে ধরলেন পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী
পরিবেশবিদ ও সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়াই উপকূলীয় জোনে বহুতল ভবন, হোটেল-মোটেল ও কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ করার ফলে সমুদ্রের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে সৈকত রক্ষাকারী বালির ডেইল ও সাগরলতা ধ্বংস করে বাণিজ্যিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়ায় সাগরের ভাঙন দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।
এদিকে, সুগন্ধা থেকে ভাঙারমুখ পর্যন্ত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন সমুদ্র বালিয়াড়ি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতি করে বালিয়াড়ির ওপর সড়ক নির্মাণের এই উদ্যোগে চরম উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশি-বিদেশি পরিবেশবাদী সংগঠন, সিপিডি (Center for Policy Dialogue) ও গবেষণা সংস্থা বিআইওপি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলছেন, প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করা বালিয়াড়ি কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হলে সৈকতের ক্ষয় আরও দ্রুত হবে এবং লাল কাঁকড়াসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। সম্প্রতি জনস্বার্থে দায়ের করা রিটের পর হাইকোর্ট বালিয়াড়িতে রাস্তা নির্মাণ কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। একই সঙ্গে সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় সেখানে সব ধরনের অবৈধ নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ আন্দোলনের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কক্সবাজারকে রক্ষায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃতির অনুকূলে টেকসই মহাপরিকল্পনা গ্রহণ না করলে অচিরেই বিশ্বের বৃহত্তম এই প্রাকৃতিক বিস্ময়টি তার মূল রূপ হারাবে। ।





