ফের উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ
*দলীয় নেতাকর্মীরা তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণ করছেন পোস্টার-লিফলেট
*সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে ব্যাপক প্রচারণা
আরও পড়ুন: প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে শ্রমিকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে: শিমুল বিশ্বাস
*ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে: সেলিমা রহমান
*জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়ায়মসি করছে সরকার: মাওলানা আবদুল হালিম
আরও পড়ুন: লং মার্চের সম্ভাব্য পথসভাগুলোর স্থান জানালেন জামায়াতের সেক্রেটারি
ফের অস্থিরতা ও রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে ভিন্নমত এবং নির্বাচনের দাবিকে সামনে রেখে জামায়াতসহ বিভিন্ন জোট রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করছে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল ও তাদের মিত্র ১১ দলের লংমার্চ-সহ বৃহত্তর কর্মসূচি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতার কারণে এ ধরনের প্রশ্ন সামনে আসছে। এককথায় বলতে গেলে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে সরকার ও বিরোধী ১১ দলীয় ঐক্য।
বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় রয়েছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের শর্ত অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনসহ বেশ কিছু দাবিতে ঢাকা থেকে পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহর অভিমুখে লং মার্চ কর্মসূচি পালন করবে তারা। এর মধ্যে প্রথম দিন আজ শনিবার ৫ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে লং মার্চ শুরু হয়ে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পথসভা করে চট্টগ্রামের লালদিঘি মাঠে গিয়ে মূল জমায়েত হওয়ার কথা রয়েছে। এ নিয়ে তাদের সব প্রস্তুত সম্পন্ন। বাকি বিভাগগুলোতেও একই কর্মসূচি পালন করে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদের ভেতরেও সরব রয়েছে তারা। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জোটও প্রতিদিনই কোন না কোন কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠে বিরোধী দলের জবাব দিচ্ছে। অপরদিকে নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে মাঝে-মধ্যেই বিভিন্ন সড়কে ঝটিকা মিছিল করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগসহ তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে গত ৫ আগস্ট অনলাইন বক্তব্যে আগামী ডিসেম্বর-নভেম্বর যেকোনো মূল্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক্ষেত্রে তিনি কোনও বাধা মানবেন না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। সরকারের দুই প্রতিপক্ষের এমন তৎপরতা ঘিরে আগামী দিনে রাজনীতির গতিপথ কোনদিকে যাচ্ছে এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে। এই সময়ে প্রধান বিরোধী দলের এমন আন্দোলন কি আসলে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারবে? আর সরকার বা বিষয়টিকে কিভাবে মোকাবিলা করবে? অপর দিকে আসলেই কি শেখ হাসিনা ফিরবেন? এমন অলক্ষ্যে প্রশ্ন ঘুরেপাক খাচ্ছে।
এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একেকজন একেক রকম কথা বলছেন। কেউ মনে করেন প্রধান বিরোধী দল যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, তা রাজপথে তাদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার আয়োজন। তারা এখনই সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো কর্মসূচি দেবে বলে মনে করেন না তারা। অন্যদিকে শেখ হাসিনা আসবেন কিনা, সেটি নিয়েও এখনই কিছু বলা কঠিন বলে তাদের ধারণা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দল রাজপথে কর্মসূচি দেবে এটা তো স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু তারা এখনই মাঠ গরম করার মতো কিছু করবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এর মাধ্যমে সরকার বিপাকে পড়লে তারা ভালো থাকবে কিনা, সেই প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। তবে এখন তারা যা করছে, সেটি হচ্ছে বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান জানান দেওয়ার কৌশল। আর আওয়ামী লীগ ফিরবে কিনা বা শেখ হাসিনা আসলেই আসবেন কিনা, সেটিও সুনির্দিষ্ট করে বলার সময় এখনও আসেনি।
এটি পর্যবেক্ষণের বিষয় বলে মনে করেন তিনি। এরইমধ্যে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলের লং মার্চ বাস্তবায়নে দফায় দফায় বৈঠক করছে জোটভুক্ত দলগুলো। ইতোমধ্যেই কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচারের জন্য গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তৃণমূল পর্যায়ে পোস্টার-লিফলেট বিতরণ করছেন নেতাকর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক প্রচারণা চলছে। এতকিছুর পরও প্রশ্ন উঠছে— সরকারের মাত্র ৬ মাসের মাথায় এ ধরনের কর্মসূচিকে নিজেদের নেতাকর্মীদের বাইরে জনসম্পৃক্ততা মিলবে তো? আর যদি সত্যিই জনগণের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহ না থাকে, তাহলে তো আন্দোলনের সাফল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অবশ্য বিষয়টিকে দুইভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কেউ বলছেন বিরোধী দলের আন্দোলন যদি জনদাবি বিষয়ক হয়, তাহলে অনেক সময় সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে ১১ দলের আন্দোলন কতটুকু গণমুখী, সেটা নিশ্চয়ই বিবেচনা করেই জনগণ সিদ্ধান্ত নেবেন। আর বিরোধী দল মনে করে, তাদের আন্দোলনে অবশ্যই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, শুধু কর্মসূচি দিলেই রাজপথ উত্তপ্ত হয় না বা জনগণ রাজপথে নেমে আসে না। তারা দেখবে, আসলে এর মধ্যে তাদের কোনও স্বার্থ আছে কিনা। আর বিরোধী দল যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, তা গতানুগতিক। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সেখানে কেন জনগণ তাদের ডাকে মাঠে নামবে? তার মতে, সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হলেই বা বিরোধী দলের প্রতি ভরসা পেলেই সাধারণ মানুষ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়। তবে ভিন্নসুরের কথা বলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার।
তিনি বলেন, তাদের কর্মসূচি ঘিরে মিত্রদলগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক সাড়া দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, তাদের প্রতিটি দাবিই জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। তাই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কিছু বিষয়ে কথা বলেছি। তবে মঞ্চ চুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। হলে অবশ্যই বিরোধী দলের অবস্থান তুলে ধরা হবে। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতসহ ১১ দলের রাজপথে আন্দোলনের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ফেরা। গত ৫ আগস্ট ভার্চুয়াল বক্তব্যে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, যেকোনও মূল্যে তিনি ফিরবেন এবং আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, 'তার আগমন ঘিরে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় সেটি পরের কথা, জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো কী অবস্থান নেয়, আগে তা দেখতে হবে। তারা যদি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চায়, তাহলে তো পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতেই পারে।
তবে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, শেখ হাসিনা তার ঘোষণা অনুসারে আত্মসমর্পণ করতে পারলে, তার দলের পুনরুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে। তার নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হবেন। এক্ষেত্রে হয়তো তাকে ঝুঁকি নিতে হবে। তবে আসলেই তিনি আসবেন কিনা জানি না। হয়তো তিনি চমক হিসেবে এমন কথা বলে থাকতে পারেন। আর তার আসার বিষয়টি আরও দুইটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। একটি হচ্ছে, সামনে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হয় তার ওপরে। আরেকটি হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির কোনও ধরনের সমঝোতা হয় কিনা, সেটিও মূল্যায়নের দাবি রাখে। অন্যদিকে জুলাই নিয়ে শেখ হাসিনা অনুতপ্ত কিনা, তার কথাবার্তায় তা বোঝা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে তার আগমন ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় কিনা, তা নির্ভর করছে জুলাইয়ের শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, বিরোধী দল বিগত ৬ মাসে সরকারের গঠনমূলক কাজে সহযোগিতা করে আসছে। কিন্তু সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। আর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটেরও সমাধান করতে পারছে না। তাই জনগণের অধিকার আদায়ে আমাদের কর্মসূচি। অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, সরকার তার সাধ্যমতো দেশকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে এই সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।





