পল্লী মেলার নামে জুয়া-অশ্লীল নৃত্য, পরিচালক বললেন, ‘সবাইকে ম্যানেজ করেই চালানো হচ্ছে মেলা’
শরীয়তপুরের নড়িয়ায় ‘পল্লী মেলা’র নামে অবৈধভাবে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফেরি করে লটারির টিকেট বিক্রির মাধ্যমে জুয়া এবং গভীর রাত পর্যন্ত অশ্লীল নৃত্য পরিবেশনের অভিযোগ উঠেছে। এসব লটারি কিনে প্রতারিত হচ্ছেন হাজারো মানুষ। যার কারণেই ইতিমধ্যে সর্বস্বান্তু হয়েছেন অনেকে। লটারি কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ।।
প্রশাসনের দেওয়া সময় ও শর্ত উপেক্ষা করে মেলা পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে এলাকার সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
আরও পড়ুন: এগিয়ে চলেছে নবীন প্রবীণ জনকল্যাণ সংস্থার ক্রীড়া বিষয়ক কার্যক্রম
মেলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আজাদের দাবি, ‘সব পক্ষকে ম্যানেজ করেই মেলা চালানো হচ্ছে।’ তবে কার কার সঙ্গে কীভাবে ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে- এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। অন্যদিকে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল কাইয়ুম খান জানিয়েছেন, মেলা নিয়ে তাঁর কাছেও অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নড়িয়া বাজার বণিক সমিতির উদ্যোগে এবং ‘আলোক দিশারী সংঘের’ ব্যবস্থাপনায় নড়িয়া উপজেলার পানি ভবন সংলগ্ন মাঠে ‘নড়িয়া পল্লী মেলা-২০২৬’ নামে এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি সফিকুর রহমান কিরণ। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান, নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেনসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তখন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের দেওয়া শর্ত উপেক্ষা করে মেলার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০ টাকা মূল্যের লটারির টিকিট বিক্রি করে মোটরসাইকেল, স্বর্ণালংকার, টেলিভিশন, ফ্রিজসহ বিভিন্ন পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন ৫১টি আইটেমের পুরস্কার দেওয়ার কথা বলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লটারির টিকিট বিক্রি হচ্ছে। মেলার আয়োজকেরা প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার টিকিট বিক্রি করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। সকাল থেকে লটারির টিকিট বিক্রি শুরু করে এবং রাত ২টার মধ্যে র্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে রাত ৯টার পর থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে আনা তরুণীদের দিয়ে অশ্লীল নৃত্য পরিবেশন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাত পর্যন্ত এসব নৃত্য চলায় মেলা প্রাঙ্গণে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হচ্ছে। এতে মেলা সংলগ্ন এলাকায় শব্দদূষণ ও জনদুর্ভোগও সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ, মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থাকলে তাতে কারও আপত্তি ছিলনা। কিন্তু মেলায় র্যাফেল ড্র'র নামে জুয়ার মতো কার্যক্রম এবং গভীর রাত পর্যন্ত অশালীন নৃত্য চললে সেটি পরিবার ও শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
স্থানীয় পারভেজ ছৈয়াল অভিযোগ করে বলেন, সন্ধ্যার পর মেলা এলাকায় উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণদের ভিড় বাড়ছে। লটারির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অনেকে বারবার টিকিট কিনছে। এতে অল্প বয়সেই জুয়া বা ভাগ্যনির্ভর অর্থ উপার্জনের প্রতি আসক্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাত্তার বেপারী বলেন, মেলা হলে আমরা সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে যেতে চাই। কিন্তু সেখানে যদি লটারির নামে জুয়া আর গভীর রাত পর্যন্ত অশ্লীল নৃত্য চলে, তাহলে সন্তানদের নিয়ে সেখানে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনের উচিত মেলার অনুমতির শর্ত ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আবু বকর দেওয়ান বলেন, বিনোদনের নামে এমন আয়োজন চললে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। বিশেষ করে কিশোরদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। মেলা কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শেষ করতে হবে এবং অনৈতিক বা বিতর্কিত আয়োজন বন্ধ করা দরকার।
মেলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আজাদের কাছে লটারির আয়োজন, গভীর রাত পর্যন্ত কার্যক্রম এবং অশ্লীল নৃত্যের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সব পক্ষকে ম্যানেজ করেই মেলা চালানো হচ্ছে।
তবে ‘সব পক্ষ’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে এবং মেলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের কী কী অনুমতি রয়েছে- এ বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, আমার কাছেও কিছু অভিযোগ এসেছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





