লক্ষ্মীপুর জেলায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি, দিনে শ্রমিকের আয় আড়াই হাজার
লক্ষ্মীপুরে চলতি মৌসুমে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। জেলার শতাধিক হাটবাজারে জমে উঠেছে সুপারির বেচাকেনা। পাইকারি ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক, দরদাম আর সুপারির স্তূপে মুখর হয়ে উঠেছে বাজারগুলো। এই মৌসুমি বাণিজ্যকে ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাগানমালিক, ব্যবসায়ী ও সুপারি পাড়ার শ্রমিকেরা। এতে গতি ফিরছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেহমনী সুপারিবাজার ঘুরে দেখা যায়, সড়কের পাশে সারি সারি সুপারির স্তূপ। ক্রেতারা একেকটি স্তূপ ঘুরে সুপারি দেখছেন। দরদাম মিলে গেলে বস্তা ও ঝাঁকায় ভরে যানবাহনে করে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গ্রামের ছোট ছোট হাট থেকে সুপারি সংগ্রহ করে এই বাজারে বিক্রি করেন। এখানকার অধিকাংশ পাইকারি ক্রেতা জেলার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন।
আরও পড়ুন: পরিচ্ছন্ন কুলাউড়া গড়তে তিন মাসের অভিযানে পৌরসভা
বাজারে প্রতি পণ সুপারি ১৫০–১৭০ টাকা
উত্তর তেহমনী বাজারে সপ্তাহে দুই দিন সুপারি কেনাবেচা হয়। বাজারে পণ ও কাউন হিসেবে সুপারি বিক্রি করা হয়। বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি পণ (৮০টি) পাকা সুপারি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায়। আর প্রতি কাউন (১ হাজার ২৮০টি) বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। শুধু উত্তর তেহমনী বাজারেই প্রতি সপ্তাহে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়।
আরও পড়ুন: জৈন্তাপুরে ট্রাক থেকে বিদেশি মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবা জব্দ, আটক ৩
এ ছাড়া জেলার রায়পুর উপজেলার হায়দাগঞ্জ, বাসাবাড়ি, খাসেরহাট, মোল্লারহাট ও মীরগঞ্জ; লক্ষ্মীপুর সদরের দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া ও জকসিন এবং রামগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে সুপারির বেচাকেনা চলছে। এসব বাজার থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সুপারি সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন।
৬০ শতাংশ সুপারি পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ
লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারি সাধারণত পাকা, ভেজানো ও শুকনা—এই তিনভাবে বাজারজাত করা হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। বাকি ৪০ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় বিক্রি অথবা রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নদী-নালা, খাল-ডোবা, পুকুর ও পানিভর্তি পাকা চৌবাচ্চায় সুপারি ভিজিয়ে রাখেন। মৌসুমের শুরুতে কৃষকেরা বাগান থেকে পাকা সুপারি বিক্রি করেন। পরে ব্যবসায়ীরা সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করেন। কৃষকদের বিক্রি শেষ হওয়ার পরবর্তী সময়ে ভেজানো সুপারির বাজারদর বাড়ার প্রবণতাও দেখা যায়।
সুপারি পেড়েই দিনে আয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা
সুপারির মৌসুমে শুধু বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরাই নন, ভালো আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে শ্রমিকদেরও। গাছ থেকে সুপারি পাড়া, বাছাই, পরিবহন, ভেজানো ও শুকানোর কাজে যুক্ত রয়েছেন বহু মানুষ।
রায়পুর উপজেলার কেরোয়া এলাকার শ্রমিক রুবেল হোসেন প্রায় ২০ বছর ধরে সুপারি পাড়ার কাজ করছেন। তিনি জানান, প্রতিটি গাছ থেকে সুপারি পেড়ে ১০ টাকা মজুরি পান। মৌসুমে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে উঠে সুপারি পাড়েন তিনি। এতে দৈনিক তাঁর আয় হয় প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। একটি গাছ থেকে দুই থেকে তিনবার সুপারি সংগ্রহ করা যায় বলেও জানান তিনি।
৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সুপারিবাগান
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সুপারিবাগান রয়েছে। গত মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন সুপারি উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য উপযোগী। একবার সুপারি চারা রোপণ করলে উপযুক্ত পরিবেশে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সুযোগ থাকায় কৃষকদের মধ্যে সুপারি চাষের আগ্রহ বাড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ জানান, লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে। এরপর রয়েছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাকা, শুকনা ও ভেজানো সুপারি মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার বিক্রি হতে পারে।
সুপারির এই মৌসুমি বাণিজ্য লক্ষ্মীপুরের কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ কার্যক্রম সচল থাকলে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।





