আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ২০২৬

মায়ের হাতের ছাপ মেয়ের ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৭:৪৮ অপরাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫০ অপরাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করো, কন্যার অধিকারে বিনিয়োগ করো’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে মায়ের হাতের ছাপে ১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে না দেওয়া ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।

শানিবার  (১০ অক্টোবর) শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের সুন্দরবন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় প্রেরণা–উইমেন ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনের ‘দুর্বার’ প্রকল্পের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ৬০ জোড়া মা-মেয়েসহ প্রায় ১১০ জন অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন।

আরও পড়ুন: দেশে শিশু নিখোঁজ-ও হত্যার ঘটনায় ভয়ানক উদ্বেগ

সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আয়োজিত অনুষ্ঠানে র‍্যালি, মায়ের প্রতিশ্রুতি, কন্যাশিশুর এক দিনের নেতৃত্ব, দুই প্রজন্মের অভিজ্ঞতা বিনিময় ও বৃক্ষরোপণসহ নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

মা-মেয়ের অঙ্গীকারে বাল্যবিবাহ বন্ধের বার্তা

আরও পড়ুন: হাজার হাজার নিখোঁজ শিশু কোথায় যাচ্ছে

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মায়ের প্রতিশ্রুতি পর্ব। এ সময় মায়েরা সাদা কাপড়ে হাতের ছাপ দিয়ে দুটি অঙ্গীকার করেন—১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দেবেন না এবং তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করবেন। প্রতিটি হাতের ছাপে রং লাগিয়ে দেয় মেয়েরা নিজেরাই।

আয়োজকেরা জানান, বাল্যবিবাহের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের ভেতরেই নেওয়া হয়। তাই মা ও মেয়েকে একই মঞ্চে এনে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিক্ষার অধিকার এবং কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করাই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

দিনের কর্মসূচি ও আলোচনার বিষয় নির্ধারণে দুর্বার কন্যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনুষ্ঠান পরিচালনা থেকে শুরু করে সমাপনী পর্ব পর্যন্ত তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

নিজেদের স্বপ্ন ও সমস্যার কথা জানাল কিশোরীরা

‘মায়ের স্বপ্ন, মেয়ের স্বপ্ন’ পর্বে তিন জোড়া মা-মেয়ে নিজেদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে। দুই প্রজন্মের অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে মায়েরা তাঁদের কৈশোরের দুর্যোগকালীন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। অন্যদিকে, কিশোরীরা আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ, পৃথক শৌচাগার, মাসিককালীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

‘আমার মেয়ে আমার গর্ব’ শীর্ষক উঠান বৈঠক পরিচালনা করে দুর্বার কন্যাদের একজন সদস্য। এ ছাড়া মা-মেয়েরা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সড়কে র‍্যালিতে অংশ নেন। র‍্যালির সামনের সারিতে ব্যানার বহন করে দুর্বার কন্যারা।

দিনের শেষে প্রতিটি মা-মেয়ে জুটি একটি করে গাছের চারা রোপণ করে। প্রতিটি গাছের সঙ্গে মেয়েটির নামসংবলিত একটি ছোট নামফলক লাগানো হয়।

‘মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেব না’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুন্দরবন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “একটি মেয়ে হঠাৎ স্কুল ছেড়ে দিলে আমরা বুঝতে পারি বাড়িতে কী ঘটেছে। আজ মায়েরা মেয়ের সামনে যে অঙ্গীকার করলেন, সেটি রক্ষা করতে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যা করণীয়, তা আমরা করব।”

দুর্বার কন্যা দলের এক সদস্য বলেন, “আমরা বহুবার শুনেছি আমাদের কথা বলার বয়স হয়নি। আজ আমরা নিজেরা অনুষ্ঠান চালিয়েছি, আর মায়েরা শুনেছেন।”

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এক মা বলেন, “আমার বিয়ে হয়েছিল পড়া শেষ হওয়ার আগেই। মেয়ের বেলায় সেটা হতে দেব না—এটা আজ সবার সামনে বললাম।”

প্রেরণার পক্ষ থেকে বলা হয়, ঘরে যে মেয়ের কথা শোনা হয়, বাইরেও তার কথা শোনা হয়। কন্যাশিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

কিশোরীদের ছয় দফা দাবি

সমাপনী পর্বে দুর্বার কন্যা দলের পক্ষ থেকে স্থানীয় সম্প্রদায়ের উদ্দেশে একটি দাবিনামা পাঠ করা হয়। কিশোরীরা নিজেরাই দাবিনামাটি তৈরি করে। এতে রয়েছে—

মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে ১৮ বছরের আগে কোনো মেয়ের বিয়ে না দেওয়া নিশ্চিত করা।

প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও কিশোরীদের জন্য পৃথক শৌচাগার ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা।

দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ প্রয়োজনীয় মাসিককালীন সামগ্রী রাখা।

বিদ্যালয়ে মাসিককালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করা।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ইউনিয়ন পরিষদ ও বিদ্যালয়ের যৌথ তদারকি এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ।

স্থানীয় পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিতে কিশোরীদের মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা।

কিশোরীদের নেতৃত্ব বিকাশে ‘দুর্বার’ প্রকল্প

প্রেরণা–উইমেন ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় নারী ও কিশোরীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে বাস্তবায়নাধীন ‘দুর্বার’ প্রকল্পের আওতায় কিশোরীরা জলবায়ু ন্যায়বিচার, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে প্রকল্পের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস (ডিআরআর) ও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার (এসআরএইচআর) দল, ইয়ুথ লিডার এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সহযোগিতা করেন।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, মা-মেয়ের এই অঙ্গীকার শুধু একটি দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা এবং দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পরিবার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করবে।