কর, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির নতুন ভাষ্য: বাস্তবতা নাকি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস?
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে করনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যাংকিং খাত এবং পুঁজিবাজার। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো কেবল অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ব্যাখ্যা নয়; বরং এগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থানও প্রকাশ করছে। সেখানে অতীত সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে নতুন এক বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই ভাষ্য কতটা বাস্তবভিত্তিক, কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, এবং কতটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার অংশ?
সরকারের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে কর আদায়ের হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। সরকার এখন বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ বহুদিন ধরেই এই লক্ষ্যকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করে আসছেন। কিন্তু লক্ষ্য নির্ধারণ করাই আসল বিষয় নয়; প্রশ্ন হলো—এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ কী?
আরও পড়ুন: সীমান্ত সাংবাদিকতার ব্যবচ্ছেদ: আবেগ বনাম বস্তুনিষ্ঠতা
সরকার বলছে, কর ফাঁকি রোধ, পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক কর সংস্কৃতি ভাঙা এবং এসআরওনির্ভর বিশেষ সুবিধা কমানোর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বক্তব্য। কারণ বাংলাদেশের করব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হচ্ছে বৈষম্যমূলক করছাড় ও বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা। দীর্ঘদিন ধরে কিছু করপোরেট গোষ্ঠী রাজনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছে, আর তার বোঝা বহন করেছে সাধারণ করদাতা ও ছোট উদ্যোক্তারা।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কর সংস্কার কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হয় না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানগত স্বচ্ছতা। বাংলাদেশে বহু বছর ধরে কর ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের “নেগোসিয়েটেড কমপ্লায়েন্স” সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে—যেখানে বড় করদাতারা প্রভাব খাটিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে দায় কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়। এই বাস্তবতা ভাঙা সহজ নয়।
আরও পড়ুন: ইলিশের ঘরবাড়ি
অন্যদিকে সরকার বলছে, তারা “এভিডেন্স ইনফর্মড” নীতিতে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি অবশ্যই আধুনিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের জন্য জরুরি। তবে বাংলাদেশে বহু সময় দেখা গেছে, তথ্য ব্যবহারের ভাষা থাকলেও নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক বিবেচনাই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পেয়েছে। তাই বাস্তব প্রশ্ন হচ্ছে—সরকার কি সত্যিই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে?
জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারের বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার সরাসরি স্বীকার করেছে যে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির ফাঁদে আটকে ছিল। এই বক্তব্য নতুন নয়, কিন্তু এবার সেটি অনেক বেশি রাজনৈতিক ভাষায় এসেছে। বলা হয়েছে, অতীতের নীতির কারণে একটি “গোষ্ঠীতান্ত্রিক” অর্থনীতি তৈরি হয়েছে, যেখানে এলএনজি আমদানি, এলপিজি বাজার এবং বিদ্যুৎ খাত কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বাস্তবতা হলো—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন অবহেলা করা হয়েছে। অথচ দেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্রমাগত আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে, ডলার সংকট তৈরি হয়েছে এবং বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
এখন সরকার বলছে, তারা নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেবে, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দ্রুত অনুসন্ধানে উৎসাহিত করবে এবং বাপেক্সকে সক্রিয় করবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে শুধু আমদানিনির্ভরতা নয়, দেশীয় উৎপাদন কাঠামো তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। কারণ সোলার প্যানেল বা নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি শুধু আমদানি করলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠে না।
তবে এখানেও বড় প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা। বাংলাদেশে বহু বছর ধরে জ্বালানি নীতিতে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ছিল না। বড় বড় প্রকল্প ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন ধীরগতির হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সরকার নিজেই বলেছে—ইস্টার্ন রিফাইনারির ঋণের কমিটমেন্ট ফি দেওয়া হলেও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হয়নি। এটি কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতার উদাহরণ নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীর সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এলএনজি অবকাঠামো। সরকার প্রশ্ন তুলেছে—যথেষ্ট ল্যান্ডিং স্টেশন ছাড়া কিভাবে জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বলা হয়? এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে জরুরি ভিত্তিতে ভাসমান টার্মিনাল নির্ভর এলএনজি আমদানি করেছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং সরবরাহ ঝুঁকি রয়ে গেছে।
তবে জ্বালানি খাতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য ছিল “ভয়ের সংস্কৃতি” নিয়ে। সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে অতীতে অনেকেই নীতিগত ভুল জানলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে পারেননি। এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি অর্থনৈতিক ব্যর্থতাকে কেবল নীতিগত ভুল নয়, বরং কর্তৃত্ববাদী পরিবেশের ফল হিসেবেও তুলে ধরছে।
বিনিয়োগ খাত নিয়ে সরকারের পাঁচ দফা পরিকল্পনা শুনতে আকর্ষণীয়। প্রথমত, তারা নীতির ধারাবাহিকতার কথা বলেছে। এটি বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে প্রায়ই হঠাৎ নীতিপরিবর্তন, করহার পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়েন।
দ্বিতীয়ত, সরকার ডি-রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কথা বলছে। বাস্তবে বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশ এখনও অত্যন্ত জটিল। লাইসেন্স, অনুমোদন, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব এবং অস্বচ্ছ নিয়ম ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং যদি সত্যিই অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো যায়, তাহলে তা বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হবে।
তৃতীয়ত, সরকার বলছে তারা বৈষম্যহীন রপ্তানি সহায়তা দেবে। অতীতে কিছু নির্দিষ্ট খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প—অতিরিক্ত সুবিধা পেলেও অন্য খাতগুলো পিছিয়ে ছিল। বহুমুখীকরণের জন্য সমতাভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাস্তবে কি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বাইরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সেই সুবিধা পাবে?
চতুর্থত, সরকার “এসআরও কালচার”-কে বিদায় জানানোর কথা বলেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিশ্রুতি। কারণ বাংলাদেশে বিশেষ আদেশের মাধ্যমে করছাড় বা সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দুর্নীতির অন্যতম উৎস। তবে এই সংস্কৃতি ভাঙতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাজস্ব প্রশাসন দরকার।
পঞ্চমত, সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বিত ফিসকাল-মনিটারি নীতির কথা বলেছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের জন্য রি-ফাইন্যান্সিং স্কিম এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে অর্থায়নের পরিকল্পনা। বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তবতা হচ্ছে, বড় করপোরেট গোষ্ঠীগুলো তুলনামূলক সহজে ঋণ পায়, কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এখনও উচ্চ সুদ ও জটিল শর্তের মধ্যে আটকে থাকে।
সরকার “ক্রিয়েটিভ ইকোনমি” বা “অরেঞ্জ ইকোনমি”-র কথাও বলেছে। এটি তুলনামূলক নতুন ধারণা, যেখানে সংস্কৃতি, ডিজাইন, মিডিয়া, প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল খাতকে অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বে বহু দেশ এই খাত থেকে বিপুল আয় করছে। বাংলাদেশেও তরুণ জনগোষ্ঠী ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে এই খাতে সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে শিক্ষা, প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে সরকার বলেছে, বাংলাদেশ এখনও “ফ্রন্টিয়ার মার্কেট” রয়ে গেছে এবং “ইমার্জিং মার্কেট”-এ যেতে পারেনি। এটি বাস্তব সত্য। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বহু বছর ধরে আস্থাহীনতা, কারসাজি এবং নীতিগত দুর্বলতায় ভুগছে। সরকার যদি সত্যিই অর্থনীতিকে ঋণনির্ভরতা থেকে ইকুইটি-ভিত্তিক অর্থনীতিতে নিতে চায়, তাহলে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের প্রসঙ্গেও সরকার সংস্কারের কথা বলেছে। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল তদারকির কারণে সংকটে রয়েছে। “স্বাধীন বোর্ড” এবং “যোগ্য নেতৃত্ব”-এর কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা কঠিন।
সবশেষে, সরকারের বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—তারা অতীতের অর্থনৈতিক কাঠামোকে “অলিগার্কিক” বা গোষ্ঠীতান্ত্রিক অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে এবং নিজেদেরকে সংস্কারমুখী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এবার কি সত্যিই কাঠামোগত পরিবর্তন হবে, নাকি নতুন ভাষায় পুরোনো বাস্তবতাই চলতে থাকবে?
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তৃতা বা উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তব সংস্কার, প্রতিষ্ঠানগত স্বচ্ছতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা। জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়।লেখক হেড অব নিউজ দি মিরর এশিয়া





