আপসহীন সংগ্রামের জীবন ও রাজনীতি: বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
বাংলাদেশি রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা বা একাধিকবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি এ দেশের তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রতীক। ৮২তম জন্মদিনের এই বিশেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যখন তাঁর দীর্ঘ জীবন পরিক্রমা ও রাজনীতি ফিরে দেখা হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে কীভাবে এক সাধারণ গৃহবধূ সময়ের প্রয়োজনে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিলেন এবং সংকটকালে দেশের হাল ধরেছিলেন।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম। সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে উঠে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি নিজেকে রাজনীতির প্রচ্ছদপটেই রেখেছিলেন। একজন সাধারণ গৃহবধূ ও মা হিসেবে তিনি তাঁর জীবন অতিবাহিত করছিলেন।
আরও পড়ুন: বেসরকারিকরণ হোক, বেসরকারি আধিপত্য নয়
তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন অস্তিত্বসংকটে পড়ে, তখন দলের অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও রাজনৈতিক শূন্যতা দূর করতে ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে।
"রাজনীতি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জনগণের অধিকার রক্ষার এক আমৃত্যু লড়াই।" — রাজনীতির কঠিন মোড়ে বেগম জিয়ার জীবনদর্শন যেন এই কথাই বারবার প্রমাণ করেছে।
আরও পড়ুন: হুমায়ুন আজাদ ও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়
রাজনীতিতে তাঁর এই রূপান্তর কোনো পরিকল্পিত বা সহজ পথ ছিল না। স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যখন দেশ উত্তাল, তখন তিনি নেতৃত্বের আসনে এসে কেবল দলকে পুনর্গঠনই করেননি, বরং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকা পালন করে রাজপথ মাতিয়ে তোলেন।
১৯৮০-এর দশকজুড়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে দেশবাসীর হৃদয়ে স্থান করে নেন। আপসের বহু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো সামরিক বা অগণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করেননি।
এই টানা আট বছরের সংগ্রামের পরিণতি ছিল ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন: ১৯৯১ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি থেকে বাংলাদেশ পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসে, যা বেগম জিয়ার সরকারের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।
নারী শিক্ষার বিপ্লব: দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করে গ্রামে-গঞ্জে নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনা হয়।
মুক্তবাজার অর্থনীতি: দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে অর্থনৈতিক সংস্কার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসার ঘটানো।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস যেমন অর্জনের, তেমনই এটি চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈরী বাস্তবতায় পূর্ণ। বেগম খালেদা জিয়া তাঁর চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে একের পর এক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন।
১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটময় সময়ে তাঁকে বারবার কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রিয় পুত্র হারানোর বেদনা ও নিজস্ব বাসভবন ছাড়ার মতো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিও তাঁর রাজনৈতিক অদম্যতাকে টলাতে পারেনি।
বয়সের ভার ও শারীরিক জটিলতা সত্ত্বেও তিনি কখনোই রাজনীতির মাঠ কিংবা নেতাকর্মীদের থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হননি। জীবনের শেষভাগে এসে আইনি জটিলতা ও গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও এ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি আশার আলো ও সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে আসছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার আগমন কেবল একটি দলের ক্ষমতায় যাওয়ার গল্প নয়, এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতার এক বড় নিদর্শন।
তিনি প্রমাণ করেছেন যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একজন নারী দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে পুরো দেশকে পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন।
গ্রামে মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি যে সামাজিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তার সুফল আজ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে সর্বস্তরের কর্মজীবী নারীরা পাচ্ছেন।
একটি দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নেতৃত্বের ভূমিকা থাকে অপরিসীম। বেগম খালেদা জিয়া সেই নেতৃত্বের জায়গায় নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, ভালো-মন্দ বা বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাস তাঁকে বাদ দিয়ে লেখা অসম্ভব।
৮২তম জন্মদিনের এই ক্ষণে দেশবাসী ও তাঁর কোটি কোটি অনুরাগী তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছেন। আপসহীন সংগ্রাম, ত্যাগ এবং দেশের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার যে বার্তা তিনি নিজের জীবন দিয়ে রেখে যাচ্ছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘকাল ধরে এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস হিসেবে মূল্যায়িত হতে থাকবে।
লেখক: মমিনুল ইসলাম, সাংবাদিক





