দিল্লিতে পুশ-ইন নিয়ে কড়া আপত্তি ঢাকার, বিজিবির দাবি ২০২৬ সালে একজনও ঢুকতে পারেনি

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৬:২৭ অপরাহ্ন, ১০ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৬:২৭ অপরাহ্ন, ১০ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তথাকথিত ‘পুশ-ইন’ ইস্যু ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। দিল্লিতে চলমান ৮ - ১১ জুন   বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সম্মেলনে সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য আবারও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ একে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও স্বীকৃত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলে কঠোর আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারত দাবি করছে, তারা নিজস্ব আইন ও বিদ্যমান ব্যবস্থার আওতায় অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠাচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের বার্তা সামনে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমান্ত হত্যা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার এবং সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পুশ-ইন প্রশ্নে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।

আরও পড়ুন: হাইতির ‘গ্যাং সাপ্রেশন ফোর্স’-এ অংশ নেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশ: সেনাপ্রধান

বৈঠকের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বুধবার বিকেলে বাংলাবাজার পত্রিকাকে বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, “বৃহস্পতিবার ১১ তারিখ বৈঠক শেষের পর দেশে ফিরে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন বিজিবির মহাপরিচালক।”

অর্থাৎ চূড়ান্ত আলোচনা, সমঝোতা কিংবা মতবিরোধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে এখন অপেক্ষা করতে হবে সম্মেলন-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং পর্যন্ত।

আরও পড়ুন: শুরু হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, দুদকের সার্চ কমিটি চূড়ান্ত

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পুশ-ইন ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি দাবি করলেই তাকে সীমান্তের শূন্যরেখায় এনে ঠেলে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নাগরিকত্ব যাচাই, তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্মতি নিশ্চিত করার পরই কাউকে ফেরত পাঠানো সম্ভব।

বাংলাদেশ আরও যুক্তি দিয়েছে, রাতের অন্ধকারে বা সীমান্তের অরক্ষিত অংশ দিয়ে লোকজনকে প্রবেশ করানোর চেষ্টা শুধু অবৈধই নয়, এটি মানবিক ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক নীতিমালারও লঙ্ঘন।

অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হচ্ছে, তাদের ভূখণ্ডে অবস্থানরত অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হচ্ছে এবং অতীতে হাজার হাজার ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তবে তালিকা হস্তান্তর ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য এখনও বিদ্যমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, হাজার হাজার অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ৪ হাজার ৮৮০ জনের বেশি ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর কথাও উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাবাজার পত্রিকার পক্ষ থেকে জানতে চাইলে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, “শুভেন্দু অধিকারীর এই দাবির জবাব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিতে পারবে। তবে, ২০২৬ করে আজ পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে একজনও ঢুকতে পারেনি।”

বিজিবির এই বক্তব্য সীমান্তে বাহিনীটির কঠোর অবস্থান এবং প্রতিরোধমূলক তৎপরতারই ইঙ্গিত বহন করে।

দিল্লিতে আলোচনা চলাকালেই বুধবার সকালে জামালপুরের বকশীগঞ্জ সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় সূত্র ও সীমান্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ভারতের নন্দীরচর সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

পরে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমাধান হয়নি। ওই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে অবস্থান করেন বলে জানা যায়।

সীমান্তে এমন পরিস্থিতি কেবল নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগই বাড়ায় না, বরং মাঠপর্যায়ে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সীমান্তে কার্যকর সমন্বয় না হলে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

পুশ-ইনের পাশাপাশি সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনাও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিরস্ত্র নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সীমান্তে হত্যা, নির্যাতন ও আটক সংক্রান্ত ঘটনাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক নিরাপত্তা কাঠামো থাকলেও মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকাণ্ড সেই কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ছে। ফলে বারবার একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক দাবি করে ফেরত পাঠানোর আগে তার পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল পরিচয়ে কাউকে ফেরত পাঠানো হলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়ও সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক চ্যানেল, যৌথ যাচাই এবং রাষ্ট্রীয় সম্মতির বিকল্প নেই। অন্যদিকে ভারত দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।

এই অবস্থানগত পার্থক্যই বর্তমানে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

পুশ-ইন ইস্যু ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

১১-দলীয় ঐক্য সীমান্তে পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। জোটটির নেতারা দাবি করেছেন, সীমান্ত পরিস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ইস্যু সাধারণত জনমতকে দ্রুত প্রভাবিত করে। ফলে বিষয়টি শুধু নিরাপত্তা বা কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক বিতর্কেও রূপ নিতে পারে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। প্রায় প্রতিদিনই এই সীমান্তে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মানবপাচার, মাদক পরিবহন এবং অবৈধ পারাপারের মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হলে দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ যাচাই প্রক্রিয়া এবং দ্রুত কূটনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

অন্যথায় পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা কিংবা অনিয়মিত প্রত্যাবাসনের মতো ইস্যুগুলো বারবার দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি সৃষ্টি করবে।

চার দিনের সম্মেলনের শেষ দিনে দুই পক্ষের সম্মত কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। এরপর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার ফলাফল তুলে ধরা হবে।

তবে এরই মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট—যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যেকোনো প্রত্যাবাসন হতে হবে।

অন্যদিকে ভারত নিজেদের আইনগত অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।

ফলে দিল্লির বৈঠক সীমান্ত সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান এনে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—পুশ-ইন ইস্যু এখন আর কেবল সীমান্তের ঘটনা নয়; এটি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আস্থা, কূটনীতি, মানবাধিকার এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।