জোঁক

Sanchoy Biswas
‎শফিক মনজু
প্রকাশিত: ৯:৫৭ অপরাহ্ন, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:১১ পূর্বাহ্ন, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জোঁক

‎শফিক মনজু‎

‎১.

আরও পড়ুন: অমিত রেজা চৌধুরী’র একগুচ্ছ কবিতা

‎রাহাত আজ এখনও অফিসে যায়নি। মেজাজ সামান্য খারাপ। গেল রাতে পেটে মাল পড়েনি। তাসও ছুঁতে পারেনি। কালকের দিনটাই বৃথা গেছে বলে মনে হচ্ছে তার। টিভিতে হেডলাইন দেখছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত হচ্ছে। জুলাই বিষয়ে প্রামাণ্য চিত্র নিয়ে বিশাল ক্যাচালের নিউজ দেখাচ্ছে। প্রামাণ্য চিত্রে নাকি আবু সাঈদের ছবি না নাম নাই। সে খবর দেখাচ্ছে। নতুন সরকার আসার পর বিভিন্ন মাদ্রাসায় বলৎকার বেড়ে গেছে। তেল ও গ্যাস সংকটে শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, রান্নায় সমস্যা হচ্ছে। পাম্পে পাম্পে গাড়ির লাইন। এ ধরণের হেড লাইন দেখাচ্ছে। নাস্তা খাওয়ায় দেরি হয়ে যাচ্ছে রাহাতের। এর মধ্যে তার স্ত্রী তনিমা বলে উঠল, আজ মুনাকে স্কুলে নিব না। 

‎এ কথা শুনে রাহাত বিরক্ত হয়ে খবরের কাগজটা টেবিলে ছুড়ে দিল। বলল, এভাবে কতদিন? কেউ আর বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছে না, নাকি? 

আরও পড়ুন: জাকিয়া সুলতানা লাবিবার কবিতা ‘বিষণ্ণ ভালোবাসা’

‎তনিমা ছ্যাৎ করে উঠে বলল, যে খুশি পাঠাক। আমি পাঠাবো না। মেয়ের যদি কিছু একটা হয়ে যায়। তখন, তখন কি হবে?

‎টেলিভিশনের পর্দায় আবারও ভেসে উঠল- ব্রেকিং নিউজ। রাজধানীতে আরও পাঁচ শিশু নিখোঁজ। তিনজনের রক্তশূন্য মরদেহ উদ্ধার। মুনা চুপচাপ মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, আজকেও কি  স্কুলে যাব না? আমার বন্ধুরা তো আসবে স্কুলে। তনিমা উত্তর দিতে পারল না। শুধু মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরল। শোবার ঘরে গিয়ে দরাম করে দরজা লাগিয়ে দিল। রাহাতের মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। রাগে একটা গ্লাস ভাঙতে গিয়েও ভাঙ্ল না। ধুর বাল অফিসেই যাব না আজ বলে মুখ খারাপ করল।

‎২

‎বেশ কিছু দিন আগেও তো স্বাভাবিক ছিল শহরটা।তারপর প্রথম শিশুটির লাশ পাওয়া যায় একটি ড্রেনে। ডাক্তাররা অবাক হয়ে যান। শরীরে বড় কোনো ক্ষত নেই। কিন্তু শিশুটির শরীরে রক্ত নেই। এক ফোঁটাও নেই। কয়েকদিন পর দ্বিতীয় লাশ। তারপর তৃতীয়। তারপর আরো লাশ পাওয়া গেল। তারপর আরও। এবং আরও। প্রতিদিন কোনো না কোনো ড্রেনে, কোনো না কোনো ম্যানহোলের ভেতর, কোনো না কোনো নর্দমার গর্তে মিলছে রক্তশূন্য ছোট ছোট দেহ। বাচ্চাদের লাশ। রক্তশূন্য। ব্যাপার কি? কি ঘটছে শহরে?

‎৩. 

‎অপহরণের পর খুন ভেবে পুলিশ অপহরণকারীদের খুঁজল প্রথম প্রথম। সবাই ভেবেছিল এটি কোনো সিরিয়াল কিলারের কাজ। তারপর ডাক্তাররা অবাক হয়ে গেলেন। তারা ভাবলেন এটা হয়ত কোনো অদ্ভুত রোগ। কিন্তু না। এমন কোনো রোগের খোঁজও মিলল না। সব লাশের শরীরে ছিল গোলাকার কিছু দাগ, বেশ ভালো রকমের ক্ষত। শরীরে প্রায় কোনো রক্তই ছিল না। কিন্তু কোনো ধারালো অস্ত্রের আঘাতও ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি সিসিটিভি ফুটেজ সবার ধারণাই পাল্টে দিল। তখন বাজে রাত তিনটা। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর বাজারের কাছাকাছি একটি ভাঙা ম্যানহলের ঢাকনা গলে বেরিয়ে এল একটি বিশাল জোঁক। কমপক্ষে তিন চার ফুট লম্বা। রক্ত খেয়ে স্ফীত হলে জোঁকটা আরও স্ফীত হয়ে আরও বড় হয়ে যায়। কুচকুচে কালো। মোটা। তুলতুলে। হাত পা নেই। তবে চোখ আছে। মাথার দিকে একটা চোখ বড়। শরীরের নিচের দিকে আছে আরও একটা চোখ। থলথলে শরীর। দ্রুত চলাচল করতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে সেটি ড্রেনের অন্ধকারে আবার মিলিয়ে গেল। ভিডিওটি পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার! এত্ত বড় জোঁকও হয় পৃথিবীতে!

‎৪. 

‎বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করলেন। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যায় গেলেন। এ দুই নদী বহু বছর ধরে বিষাক্ত শিল্পবর্জ্যে ভরে গেছে। মানুষের ফেলা বর্জ্য ও কলকারখানার বর্জ্য, ভারী ধাতু, রাসায়নিক দ্রব্য ও অজানা জীবাণুর কারণে নদীর পানির নিচের পরিবেশ বদলে গেছে। বহু দেশি মাছ ও প্রাণী প্রায় বিলুপ্ত। কোনো কারণে কিন্তু জোঁকগুলো বেঁচে গেছে। শুধু বেঁচেই নয়।  বিজ্ঞানীরা তখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছিলেন না ঠিক কী কারণে এই পরিবর্তন ঘটেছে। তবে তাদের ধারণা ছিল, দীর্ঘদিনের রাসায়নিক দূষণ ও অজানা জীবাণুর সম্মিলিত প্রভাবে জোঁকগুলোর জিনগত গঠনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে। বেশ বর ধরণের পরিবর্তন। তারা অস্বাভাবিক বড় হয়ে গেছে।

‎এসব বড় বড় জোঁকেরও মূল খাবার রক্ত। তাদের খাবারে প্রয়োজন বেড়ে গেছে। বিশাল পেট। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। রক্ত খাওয়ার ক্ষুধা। নদীতে মাছ বা খাওয়ার উপযুক্ত প্রাণী কমে গেছে। নিজেরা বেঁচে থাকার জন্য এরা স্থলে বাস করা মানুষের দিকে মুখ বাড়িয়েছে। নৌকায় বাস করা কিছু বেদে শিশুদের রক্ত খেয়েছে প্রাণীগুলো। বেদেরা নৌকায় বসবাস করতে এখন ভয় পাচ্ছে। ভয়ে পাড়ের মানুষ নদীতে নামছে না। নদীর সাথে, খালের সাথে সংযুক্ত বড়-ছোট ড্রেনের ভেতর দিয়ে জোঁকগুলো চলে আসছে শহরে। আর কৌশলগত কারণে সুবিধাজনক বলেই হয়ত আক্রমণ করছে শিশুদের। নদীর পাড়ে যেখানে শিশুদের আনাগোনা বেশি সেখানেই এদের দেখা যাচ্ছে। নদীর পাড়ের হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্কুলের আশপাশের বড় ড্রেনে হঠাৎ হঠাৎ দেখা যাচ্ছে এদের। মনে হয় নোংরা ময়লা ও আবর্জনায় ভরা ড্রেনই এদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

‎৫. 

‎সরকার সেনাবাহিনী নামল। ফায়ার সার্ভিস নদীর পাড়ে কাঁটাতার, আগুনের অস্থায়ী দেয়াল তৈরি করেছে। পুলিশ রাতভর টহল দিচ্ছে। ড্রেনের মুখে চিকন ধারালো লোহার নেট বসানো হলো। ভাঙা ম্যানহোল ঠিক করা হলো। শহরের চারদিকে সতর্কবার্তা দেয়া হল। শিশুকে একা বাইরে যেতে দেবেন না।’ ‘ড্রেনের পাশে দাঁড়াবেন না।’ পাইপলাইনে অস্বাভাবিক শব্দ শুনলে কর্তৃপক্ষকে ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করুন।’ এ ছাড়া শহরের সকল মসজিদে দোয়া ও বিশেষ মোনাজাত করা হচ্ছে। গীর্জা, মন্দিরে প্রার্থনা করা হচ্ছে। 

‎এরই মধ্যে কয়েকটা ভাল খবর পাওয়া গেল। কয়েকটি জোঁক ধরা পড়েছে। স্থানীয়রা কয়েকটি লবণ ও  আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারল। কয়েকটি পরীক্ষারগারে পাঠানো হল। সেই ভিডিও বারবার প্রচার করল দেশের সব সংবাদমাধ্যম। কিন্তু একি! পরদিনই আতঙ্ক তো আরও বেড়ে গেল। কারণ এবার জোঁকগুলো নদী থেকে নয়, বাড়ির ভেতর থেকে বের হতে শুরু করেছে।

‎একটি ভবনের রান্নাঘরের বর্জ্যপানির পাইপ থেকে ধরা পড়ল। আরেকটি বাথরুমের ড্রেন থেকে। আরেকটি ময়লার পাইপ ভেঙে বেরিয়ে এল। একটি ৭ তলা ফ্ল্যাটের চার তলার বাথরুমের কমোডের স্যুয়ারেজ পাইপের ভেতর দিয়ে একটি বিশাল জোঁক উঠে এসেছে। এসব খবর দেখে, ভিডিও দেখে মানুষ ভয়ে আতঙ্কে সরকারকে দ্রুত কিছু করার জন্য সবাই হইচই শুরু করল। ভিডিওতে, রিলসে বক্তব্য দেওয়া শুরু করল। ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া শুরু করল। লেখালেখি করা শুরু করলো সবাই। আর এ বিষয়ে টক শো তো চলছেই।

‎৭.

‎মানুষ বাথরুমে যেতেও ভয় পাচ্ছে এখন। পায়খানার চাপ হলেও অনেকে চেপে রাখত চাইত। না পারলে ঘরের মধ্যে কাজ সারতে হত। বাথরুমেও কেউ দরজা খুলে একা ঢুকত না। দুজন মিলে বাথরুমে যেত। কেউ লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কেউ ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে বাথরুমে যেত। কেউ ব্লিচ ঢেলে দিল পাইপে। কেউ কেজি কেজি লবন ঢালল কমোডে। লবণে নাকি জোঁক মারা যায়। তারপরও ভয় কাটল না মানুষের। ওদিকে বাজারে লবণের দাম হুহু করে বেড়ে গেল। আর সব দোকানে পাওয়াও যাচ্ছে না।

‎৮.

‎সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নতুন সমস্যা দেখা দিল। নানা ধরণের রোগী আসছে। কেউ তিন দিন ধরে ঘুমায়নি। কেউ কয়েক দিন ধরে পায়খানা করতে পারছে না। কেউ আতঙ্কে খাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। ডাক্তাররা বললেন, শারীরিক রোগের পাশাপাশি মানসিক বিপর্যয়ও ছড়িয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে ভয়ের পেটের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে পুরো শহর। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রতিদিন একই শিরোনাম হচ্ছে- ‘আবার শিশু নিখোঁজ।’ ‘ড্রেনে মিলল রক্তশূন্য দেহ।’ ‘স্যুয়ারেজের পাইপ দিয়ে জোঁক ঢোকার দাবি।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো ভিডিও ছাড়ছে মানুষ। কেউ বলছে ছাদের পানির ট্যাংকে জোঁক দেখেছে। কেউ বলছে- বেসিনের পাইপে নড়াচড়া শুনেছে। কেউ ভিডিও করছে বাথরুমের ড্রেন থেকে আসা অদ্ভুত শব্দ।কোনটি সত্যি, কোনটি গুজব, কেউ আর বুঝতে পারছিল না। মনে হচ্ছে জোঁকেরা তাদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ছোট বড় ড্রেনের ভেতর দিয়ে শহরে চলে এসেছে। আস্তানা গেড়েছে ড্রেনের ভেতর। 

‎৯. 

‎রাহাতের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এরকম পরিস্থিতিতে স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে সে খুবই অস্থির ও  বিচলিত। এ ধরনের সমস্যায় কি করবে না করবে সে ভেবে পাচ্ছে না।  মুনা আর হাসে না। খেলনা ছুঁয়েও দেখে না। বাথরুমে গেলে মাকে না হয় বাবাকে নিয়ে যায়। রাতে তিনজন একই বিছানায় ঘুমায়। জড়াজড়ি করে। তবুও ঘুম আসে না। হঠাৎ পাইপে পানি নামার শব্দ হলেই সবাই চমকে ওঠে। এক রাতে রাহাতদের পুরো ভবনের পানি বন্ধ হয়ে গেল। দারোয়ান এসে বলল, ‘মনে হচ্ছে বড় কিছু আটকে আছে।’ পাইপ কাটা হলো। কিন্তু ভেতরে কিছুই নেই। শুধু পিচ্ছিল কালো শ্লেষ্মার মতো এক ধরনের পদার্থ। 

‎বিজ্ঞানীরা নমুনা নিয়ে গেলেন। প্রাথমিক পরীক্ষায় পদার্থটির সঙ্গে জোঁকের শরীর থেকে নিঃসৃত মিউকাসের মিল পাওয়া গেল। তারা জানালেন, আরও পরীক্ষা না করে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না এটি ঠিক কী। তাই সবাইকে পানি ভালমতো ফুটিয়ে তারপর ছেঁকে খাওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হল। মানুষ অবশ্য আগে থেকেই তা করে আসছে। আষাঢ় মাসের বৃষ্টিতে ড্রেন উপচে পানি রাস্তায় উঠল। সেই পানির নিচে কী আছে, কেউ জানে না। সেই পানি ভেঙে কেউ বাসা থেকে বের হতে চায় না। ভয় পায়। কোনো শিশু আর স্কুলে যায় না। পার্কে দোলনা নড়ে শুধু বাতাসে। স্কুলের মাঠে খুব আনন্দের সাথে ঘাস ও আগাছারা বাড়তে থাকে। রাত নামলেই শহর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর অনেকে বাইরে থাকতে চায় না। বিশেষ করে মহিলা ও শিশুরা।

‎১০

‎একদিন মধ্যরাতে পুরো শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৯৯৯ এ কল আসতে শুরু করল।

‎আমাদের বাথরুমে শব্দ হচ্ছে।

‎পায়খানার পাইপ কাঁপছে।

‎ড্রেনের ঢাকনা নড়ছে।

‎বেসিনের নিচে কিছু নড়ছে।

‎ফোনকলের সংখ্যা এত বেশি হয়ে গেল যে জরুরি সেবা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা লোকেরা অস্থির হয়ে পড়ল। ৯৯৯-এর অপেক্ষমাণ কল স্বাভাবিক সক্ষমতার কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

‎পত্রিকায় কোনো নেতা বলল- এটা পাশের দেশের ষড়যন্ত্র। ঐ দেশই আমাদের শিশুদের মারতে এ রকম ভয়ংকর জোঁক পাঠিয়েছে নদী দিয়ে। কেউ কেউ রিলস বানিয়েছে- এটা নাকি দেশ থেকে কোনো নেত্রীকে তাড়ানোর অভিশাপ। নানা ধরনের ভিডিও ছড়াচ্ছে ইউটিউবে। পোস্ট, ছবি আর রিলসে ভরে গেছে ফেসবুক। একটা শেষ হতে না হতে আরেকটা ছাড়ছে কেউ। এসব দেখে দেখেই আরও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে মানুষ।

‎১১. 

‎ভোরের আগে বিদ্যুৎ চলে গেল। রাহাত হাতে টর্চ নিয়ে বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে। তনিমা মুনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। ও টয়লেট করবে। আর ঠিক তখনই...... 

‎টয়লেটে কমোডের পাইপের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেসে এল ভারী, পিচ্ছিল কিছু ওঠার শব্দ। ভদ ভদ আওয়াজ। নাকি ভুল শুনছে ওরা। হতে পারে। মুনা ভয়ে এখন টয়লেট করতে পারছে না। কান্না শুরু করে দিল। ওরা টয়লেট থেকে বের হয়ে এল। আতঙ্কে আর উত্তেজনায় হয় তো ওদের হেলুসিনেশন হচ্ছে। দরজার নিচ দিয়ে শব্দ ভেসে আসছে। সত্যি আসছে? নাকি রাহাতের ফের মনের ভুল। ঘরে লাইট জ্বলছে। তবু হঠাৎ কারেন্ট যাওয়ার ভয়ে রাহাত টর্চ নিয়ে রেখেছে হাতে। রাহাত টর্চের আলো ফেলল। কিছুই দেখা গেল না। ভ্যা করে চিৎকার করে উঠল মুনা। রাহাত দিল কড়া এক ধমক। তনিমা বলল- খবরদার আমার মেয়েকে ধমক দিবে না। আর এমন সময় টেলিভিশনে ঘোষণাটি এল। 'রাজধানীবাসীকে ঘরের ভেতর থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।’ 

‎তনিমা চোখ বন্ধ করে মেয়েকে বুকে চেপে আল্লা আল্লা করছে। যত প্রকার সুরা মুখস্থ আছে ওর, সেগুলো বলে যাচ্ছে। পাশের ফ্ল্যাট থেকেও আসছে চিৎকারের আওয়াজ। আর পাশের বাড়ি থেকেও আসছে চিৎকারের আওয়াজ। তারপরের বাড়ি থেকেও শিশুদের, নারীদের ভয়াবহ কান্না চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে। পুরুষদের ভয়ার্ত গলায় ডাকাডাকি চেচামেচি হুস হুস করে কোনো কিছু তাড়ানোর শব্দ ভেসে আসছে। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি থেকে তরুণ আর যুবকদের হইচই আওয়াজ ভেসে আসছে। মহল্লায় মহল্লায় তারা একত্র হয়ে লাঠি সোটা নিয়ে জোঁকের বিরুদ্ধে  লড়াইয়ে নেমেছে । রাত গভীর হচ্ছে আরও। মনে হয় অমাবস্যা চলছে। হঠাৎ করে কারেন্ট যাওয়ার পর বোঝা গেল রাতটা কুচকুচে কালো। রক্ত খেয়ে ফুলে টুইটুম্বুর হওয়া জোঁকের শরীরের মত কালো রাত। মনে হয় এ রকম কালো রাতই বুঝি জোঁকদের খুব প্রিয়।