বিনয় মজুমদার ও তাঁর কবিতা

Sanchoy Biswas
মাসুদ খান
প্রকাশিত: ৬:১৭ অপরাহ্ন, ০২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩৩ অপরাহ্ন, ০২ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

‎বিশ শতকের ছয়ের দশক। বাংলাভাষায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল কিছু আশ্চর্য ধরনের কবিতা। “ফিরে এসো চাকা”, “অঘ্রানের অনুভূতিমালা”... বাংলাকবিতার ধারায় গ্রন্থ দুটি দুই বিরল সংযোজন। 

‎“নিষ্পেষণে ক্রমে ক্রমে অঙ্গারের মতন সংযমে

আরও পড়ুন: মনুষ্যত্বের নান্দীপাঠ

‎হীরকের জন্ম হয়, দ্যুতিময়, আত্মসমাহিত।”

‎তাঁর, কবি বিনয় মজুমদারের, সাধক বিনয় মজুমদারের “ফিরে এসো চাকা” গ্রন্থটির কথা উঠলে অনিবার্যভাবেই মনে এসে যায় তাঁরই রচিত এই পঙক্তি দুটি। সাতাত্তরটি কবিতা নিয়ে জমে-ওঠা এক স্ফটিক কাব্যগ্রন্থ, সাতাত্তর তলবিশিষ্ট এক হীরকখণ্ড... তার দ্যুতি, তার মহিমা, তার সাবলিমিটি... সাতাত্তরটি কবিতাতল থেকে অনবরত বিচ্ছুরিত-হতে-থাকা বর্ণালিপ্রভা... আর সে-দ্যুতি ও মহিমার নিচে কেবলই মুগ্ধ হয়ে বসে থাকা আমাদের, দীর্ঘ দশকের পর দশক...

আরও পড়ুন: অমিত রেজা চৌধুরী’র একগুচ্ছ কবিতা

‎আবার অন্য এক দিক থেকে দেখলে মনে হবে, গ্রন্থটির এক-একটি কবিতা যেন এক-একটি আলাদা স্ফটিক। আর পঙক্তিগুলি যেন ওই স্ফটিকের এক-একটি তল। তীব্র চাপ ও তাপের পরীক্ষার ভেতর দিয়ে, কঠোর সংযমের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে উতরে-ওঠা এক-একটি কবিতা। অঙ্গার যে প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় হীরকে, অনেকটা যেন সেই প্রক্রিয়া। শব্দে শব্দে অসাধারণ সংহতি, বাক্যের সুদৃঢ় বাঁধন ও গাঁথুনি। কবিতার অবয়ব জুড়ে অবাক-করা ঔজ্জ্বল্য ও বিচ্ছুরণলীলা। 

‎বাক্যের অর্থ বাক্যস্থিত শব্দের ভেতরে নিহিত থাকে না, তা থাকে শব্দসমূহের বিন্যাস ও তাদের পরস্পরের অন্বয়ের মধ্যে। এজন্য বলা হয়ে থাকে, বাক্যের অর্থ উৎপন্ন হয় পদ-পদান্তরের মধ্যকার ফাঁকা জায়গা থেকে। কবিতায়ও তেমনি... কখনো শব্দমালার মধ্যকার ফাঁকা জায়গা থেকে, কখনো পঙক্তির মাঝখানকার শূন্যতা ও নীরবতা থেকে উত্থিত হয় কবিতার অর্থ, তার নিহিত ব্যঞ্জনা। বাক্যে ব্যবহৃত শব্দরাজি সেখানে অবতীর্ণ হয় নিছক প্রতীকচিহ্নের ভূমিকায়। ‘শরীরের সবচেয়ে সংরক্ত জায়গা যেমন পোশাকের ছেড়ে-রাখা শূন্যস্থান’, কবিতায়ও তেমনি পঙক্তিগুচ্ছের রেখে-দেওয়া ফাঁকাস্থানগুলিই হচ্ছে সবচেয়ে সংরক্ত, সবথেকে ব্যঞ্জনাময়। 

‎আর বিনয় মজুমদারের কবিতা এসবের উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর কবিতায়, বিশেষ করে ‘ফিরে এসো, চাকা’-র কবিতাগুলিতে আমরা দেখব কীভাবে শব্দ আর পঙক্তির ভাঁজ থেকে, পঙক্তিগুচ্ছের মধ্যকার শূন্যস্থানগুলি থেকে উত্থিত হয় সৌন্দর্য ও সৌরভ। আর তা কখনো বিজলির মতো, কখনো-বা চাঁদের আলোর মতো ছলকে-ছলকে বয়ে চলে শব্দ থেকে শব্দে, পঙক্তি থেকে পঙক্তিতে। কবি তাঁর অব্যর্থ শব্দ আর বাক্যরাশি দিয়ে ঘটিয়ে তোলেন নানা জাদুকরি বিন্যাস। ক্রমাগত তৈরি করতে থাকেন জরুরি সব ঘোর ও ঘূর্ণি।  

‎পঙক্তির পর পঙক্তি চলতে থাকে কিছুক্ষণ, অর্থের পরম্পরা, যুক্তির সিলসিলা, সবই অটুট রেখে রেখে। কিন্তু পরক্ষণেই কী যেন হয়, ছেদ পড়ে পরম্পরায়, শুরু হয় উল্লম্ফন, বাক্য তার অর্থসমেত চলে লাফিয়ে লাফিয়ে। এভাবে কখনো বাক্যের পর বাক্য উহ্য করে দিয়ে, কথার পর কথা বাদ করে দিয়ে দিয়ে এগিয়ে চলে কবিতা। সেখানে কেবল ‘তবু’, ‘অথচ’, ‘ফলে’ (ফলত)... এ ধরনের এক-একটি অব্যয়পদ দিয়ে আপাত-পরম্পরাহারা নানা অনুষঙ্গরাশির মধ্যে তৈরি করে রাখেন আবছা সেতুবন্ধ। তখন, সে-অবস্থায়, সেইসব অব্যয়পদের ওপরই টানটান দাঁড় করিয়ে রাখেন কবিতার গতি, নিশানা ও অবস্থান। এভাবে একটি আবর্তন পূর্ণ হবার পর শুরু হয় অন্য এক আবর্তনলীলা। 

‎এভাবে কখনো জাম্পকাট, কখনো এলিমিনেশন, আবার কখনো অনুষঙ্গ থেকে অনুষঙ্গান্তরে অবাধ ভেসে চলা (বিশেষ করে অঘ্রাণের অনুভূতিমালা-য়), এবং বেশিরভাগ সময়ই শান্ত নিস্তরঙ্গ বয়ে চলা, মাঝে মধ্যে অন্তর্লীন ঢেউ ও ঘূর্ণি... এভাবে কবিতার পর কবিতায় বয়ন করে চলেন নানারকম চোরা ফাঁদ, প্রচ্ছন্ন অন্তর্ঘাত, কখনো কখনো তৈরি করেন মোহময়ী সব গোলকধাঁধা। 

‎আর এইসব ঘোর ও ঘূর্ণি, শান্ততা ও নিস্তরঙ্গতা, ফাঁদ ও গোলকধাঁধার রকমারি বিন্যাসের ভেতর থেকে উদ্গীরিত হয় একইসঙ্গে আগুন ও আলেয়া, বিচ্ছুরিত হতে থাকে যুগপৎ জ্যোৎস্না ও রোদ্দুর।

‎কবিতা স্বভাবগতভাবেই বিষয়ীগত, মন্ময়। কবিতা প্রকৃতিগতভাবেই সংশ্লেষণধর্মী। কিন্তু, “ফিরে এসো, চাকা”-র কবি কবিতায় সম্ভব করে তুলেছেন নৈর্ব্যক্তিকতা (অবজেক্টিভিটি) ও মন্ময়তার (সাবজেক্টিভিটি) এক দুর্লভ সমন্বয়। কবিতাগুলি যেন বিষয় ও বিষয়ীর, তন্ময় ও মন্ময়ের সার্থক সমসত্ত্ব দ্রবণ। সংশ্লেষ ও বিশ্লেষের এক অনাস্বাদিতপূর্ব অন্নব্যঞ্জন। বিনয়ের কবিতা কারুকাজবিরল, কিন্তু অনুভূতিঘন। 

‎”ফিরে এসো, চাকা”-র কবিতাগুলির বিকাশভঙ্গি, তাদের বেড়ে ওঠার ধরনটাই অন্য রকম। কবিতাগুলিতে মাঝে মধ্যেই দেখতে পাব এমনসব বাক্য সচরাচর যাদের আমরা সর্বজনীন সত্য বা শাশ্বতবাক্য বলে জানি। কিংবা দেখতে পাব হয় পদার্থবিদ্যার, নতুবা দর্শনের, অথবা শারীরবিদ্যার কিংবা ভূয়োদর্শনজাত কোনো-না-কোনা তথ্য বা ফ্যাক্ট--

‎

‎“...নিকটবর্তী এবং উজ্জ্বলতম তারাগুলি প্রকৃতপ্রস্তাবে

‎সব গ্রহ, তারা নয়, তাপহীন আলোহীন গ্রহ... ” 

‎“সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে...”‎

‎“আলোকসম্পাতহেতু বিদ্যুৎসঞ্চার হয়, বিশেষ ধাতুতে হয়ে থাকে।”

‎“অতি অল্প পুস্তকেই ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়ে থাকে।”

‎‎“কিছুটা সময় দিলে তবে দুধে সর ভেসে ওঠে।”

‎‎“...ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে

‎পুনরায় কেশোদগম হবে না;”

‎‎“বর্ণাবলেপনগুলি কাছে গেলে অর্থহীন, অতি স্থূল মনে হয় 

‎অথচ আলেখ্যশ্রেণি কিছুটা দূরত্বহেতু মনোলোভা হয়ে ফুটে ওঠে।”

‎‎“প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলি ক্রমে জ্ঞান হয়ে ওঠে।”

‎‎“মুগ্ধ মিলনের কালে সজোরে আঘাতে সম্ভাবিত

‎ব্যথা থেকে মাংসরাশি, নিতম্বই রক্ষা করে থাকে।”

‎‎“...বাতাসের

‎নীলাভতাহেতু দিনে আকাশকে নীল মনে হয়।”

‎‎“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।”

‎

‎আর এইসব তথ্যবাচক ভাষ্যকে আবির্ভূত হতে দেখব এমনসব বাক ও বাক্যের পরিবেশে, যারা উৎসারিত হয় কবির গভীর অনুভূতিদেশ থেকে। কবির নিজস্ব রং ও মাধুরী মেশানো নানা মন্ময় (সাবজেকটিভ) পঙক্তিপ্রপঞ্চের আশপাশ দিয়েই বয়ে যেতে দেখব ওইসব তন্ময় (অবজেকটিভ) তথ্যপঙক্তিধারা। মন্ময় ভাষ্যগুলিকে নৈর্ব্যক্তিক ভাষ্যের সঙ্গে কবি বেঁধে দেন নানা নিগূঢ় সম্পর্কে। বেঁধে দেন কখনো উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, কখনো-বা রূপকে-প্রতীকে।  ‎ফলে, কবিতায় তিনি যখন “সূর্য পূর্বদিকে ওঠে” কিংবা “জল চিরকাল ঢালুর দিকে গড়ায়” কিংবা “রক্তের রং লাল হয়ে থাকে”... এ ধরনের সরাসরি অবজেকটিভ উক্তিও করেন, তখনও তাদের বিশেষ বিন্যাসের সুবাদে কিংবা প্রতিবেশী পঙক্তিনিচয়ের চরিত্রের আবেশে ওগুলির ধর্মই যায় পাল্টে। নিরেট নৈর্ব্যক্তিক ভাষ্যগুলিও রূপান্তরিত হয় সাংকেতিক ভাষ্যে। 

‎বিনয়ের কবিতায়, কোনো কোনো অংশে, দেখা যায় একধরনের বিশ্লেষণী উচ্চারণ। কিন্তু তাঁর কবিতার বিশেষ সজ্জা ও বিন্যাসের কারণে সেই বিশ্লেষণ-অংশটুকুও হয়ে ওঠে সংশ্লেষণের অবধারিত অংশ।    

‎এছাড়া মাঝে মাঝে তিনি গূঢ় দার্শনিকের কেতায়, অনেকটা প্রফেটিক ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেন কিছু গভীর উপলব্ধির কথা, আপ্তবাক্যের মতো করে... 

‎

‎”সকল ফুলের কাছে এতো মোহময় মনে যাবার পরেও 

‎মানুষেরা কিন্তু মাংসরন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালবাসে।’’

‎

‎’‘...প্রাকৃতিক সকল কিছুই 

‎টীকা ও টিপ্পনী মাত্র, পরিচিত গভীর গ্রন্থের।’’

‎”বীজের ভিতরে আছে গুহার লালসাময় রস।”

‎‎”প্রকৃষ্ট সময় ব্যয় করার পূর্বাহ্নে সে-সময়

‎আয় করে নিতে হয়-- নানারূপ আয় ও ব্যয়ের 

‎হিসাবের মতো এই সত্যটিও আজ মনে আসে।”

‎‎”অতিশয় উঁচু কোনো সৌখিন সৌন্দর্যচিন্তা রূপ হয়ে নাচে।”

‎‎”দেহসঞ্চালন হলো ভাবসঞ্চালনমাত্র, অন্য কিছু নয়।”

‎‎”মনে হয়, সবচেয়ে বেশি চিন্তাশীল এক অবয়ব ব’লে

‎খুব বেশি পরিমাণে চিন্তা করে দেয় ব’লে সমগ্র চিন্তার

‎প্রায় সবই একা-একা যৌনাঙ্গই করে দেয়, করে দিয়ে থাকে

‎সকল চিন্তাই তার একক অধিপত্যে অবাক করেছে।

‎যে-কোনো কাহিনী তাই শুধুমাত্র যৌনাঙ্গের আত্মকাহিনীই,

‎যে-কোনো চিন্তাই তাই এই চিন্তাকারীটির একক জীবনী

‎হয়ে যায়, হতে হয়, তথাকথনের দোষে যাকে তুমি বলো

‎অবচেতনার রূপ;”

‎‎”রাতের বেলায় সব বেশি-বেশি করে বাড়ে, বড় হতে থাকে

‎আলো খুঁজে পেতে গিয়ে, আলো ভালবাসে বলে সবই কীরকম

‎তাড়াতাড়ি করে বাড়ে, প্রায় সব ফুলই তাই রাতে ফুটে থাকে।” 

‎‎”রমণ না করে কোনো রমণী ও পুরুষের বন্ধুত্ব টেকে না,

‎খুব বেশিদিন ধরে তাদের বন্ধুত্বভাব কখনো টেকে না।”

‎”চিরকাল সংজ্ঞা থেকে আমাদের সব জ্ঞান যাত্রা শুরু করে,

‎হাজার পাঁচেক সংজ্ঞা একেবারে ভ্রান্তিহীনরূপে জানা গেলে

‎যা-ই চিন্তা করি তা-ই ভ্রান্তিহীন হতে বাধ্য, ভ্রান্তিহীন হয়।

‎অভিধানগুলি সব সংজ্ঞাপুস্তকের দলে অন্তর্ভুক্ত বই।”

‎‎”শতকরা একেবারে একশত ভাগ খাঁটি দর্শনের নাম

‎সংজ্ঞা অনুসারে ধর্ম...”

‎‎”পাখিদের থেকে সব পাখি জন্মে, আলোকের থেকে জন্মে সকল আলোক।”

‎‎”...এই মহাশূন্য শুধু

‎স্বতঃস্ফূর্ত জ্যোৎস্নায় পরিপূর্ণ মুগ্ধ হতে পারে।”

‎

‎এইভাবে একইসঙ্গে সংশ্লেষ ও বিশ্লেষ, তন্ময়তা ও মন্ময়তা, চেতন ও অবচেতনের বহুভুজ দ্বন্দ্ব ও শান্তির ভেতর দিয়ে বিকশিত হয় বিনয়ের কবিতা। তাঁর লেখা তাই আমাদের দেয় এক অননুভূতপূর্ব ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতা। এ প্রজাতির কবিতা বাংলাসাহিত্যে দুর্লভ। 

‎‎অবশ্য এতসব কথা বলার চেয়ে জরুরি হচ্ছে সরাসরি তাঁর কবিতায় অবগাহন, বেশি বেশি পাঠ... 

‎

‎“সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কতো বেশি বিপদসংকুল

‎তারও বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ,

‎এ সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে

‎সঞ্চারিত হতে চাই, চিরকাল হতে অভিলাষী,

‎সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে বলে।

‎তবুও কেন যে আজও, হায় হাসি, হায় দেবদারু

‎মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।...”  

‎‎“কিছুকাল আগে প্রাণে, ধাতুখণ্ডে সুনির্মল জ্যোৎস্না পড়েছিলো। 

‎আলোকসম্পাতহেতু বিদ্যুৎসঞ্চার হয়, বিশেষ ধাতুতে হয়ে থাকে।

‎অথচ পায়রা ছাড়া অন্য কোনো ওড়ার ক্ষমতাবতী পাখি

‎বর্তমান যুগে আর মানুষের নিকটে আসে না। 

‎‎সপ্রতিভভাবে এসে দানা খেয়ে ফের উড়ে যায়,

‎তবুও সফল জ্যোৎস্না চিরকাল মানুষের প্রেরণাস্বরূপ।

‎বিশেষ অবস্থামতো বিভিন্ন বায়ুর মধ্য দিয়ে

‎আমরা সতত চলি; বিষাক্ত, সুগন্ধি কিংবা হিম

‎বায়ু তবু শুধুমাত্র আবহমণ্ডল হয়ে থাকে।

‎জীবনধারণ করা সমীরবিলাসী হওয়া নয়।

‎অতএব, হে ধিক্কার, বৈদ্যুতিক আক্ষেপ ভোলো তো,

‎অতি অল্প পুস্তকেই ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়ে থাকে।...”   

‎‎“ঘন অরণ্যের মধ্যে সূর্যের আলোর তীব্র অনটন বুঝে

‎তরুণ সেগুন গাছ ঋজু আর শাখাহীন, অতি দীর্ঘ হয়;

‎এত দীর্ঘ যাতে তার উচ্চ শীর্ষে উপবিষ্ট নিরাপদ কোনো

‎বিকল পাখির চিন্তা, অনুচ্চ গানের সুর মাটিতে আসে না।...” 

‎‎“কাগজকলম নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা প্রয়োজন আজ;

‎প্রতিটি ব্যর্থতা, ক্লান্তি— কী অস্পষ্ট আত্মচিন্তা সঙ্গে নিয়ে আসে।

‎সতত বিশ্বাস হয়, প্রায় সব আয়োজনই হয়ে গেছে, তবু

‎কেবল নির্ভুলভাবে সম্পর্কস্থাপন করা যায় না এখনো।

‎সকল ফুলের কাছে এতো মোহময় মনে যাবার পরেও

‎মানুষেরা কিন্তু মাংসরন্ধকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

‎বর্ণাবলেপনগুলি কাছে গেলে অর্থহীন, অতি স্থূল বলে মনে হয়।

‎অথচ আলেখ্যশ্রেণি কিছুটা দূরত্বহেতু মনোলোভা হয়ে ফুটে ওঠে।...”  

‎‎“হে আলেখ্য, অপচয় চিরকাল পৃথিবীতে আছে;

‎এই যে অমেয় জল— মেঘে মেঘে তনুভূত জল—

‎এর কতোটুকু আর ফসলের দেহে আসে বলো?

‎ফসলের ঋতুতেও অধিকাংশ শুষে নেয় মাটি।

‎তবু কী আশ্চর্য, দ্যাখো, উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে

‎তার এই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সংগীতময় হয়।...” 

‎‎“...শয়নভঙ্গির মতো অনাড়ষ্ট স্বকীয় বিকাশ

‎সকল মানুষ চায়— এই সাধনায় লিপ্ত হতে

‎অভ্যন্তরে ঘ্রাণ নাও, অযুত শতাব্দীব্যাপী চেয়ে 

‎মস্তিষ্কে সামান্যতম সাধ নিয়ে ক্লিষ্ট প্রজাপতি 

‎পাখাময় রেখাচিত্র যে-নিয়মে ফুটিয়ে তুলেছে

‎সে নিয়ম মনে রাখো, ঢেউয়ের মতোন খুঁজে ফেরো।

‎অথবা বিম্বের মতো ডুবে থাকো সম্মুখীন মদে

‎এমনকি নিজে-নিজে খুলে যাও ঝিনুকের মতো,

‎ব্যর্থ হও, তবু বালি, ভিতরে প্রবিষ্ট বালিটুকু

‎ক্রমে-ক্রমে মুক্তা হয়ে গতির সার্থক কীর্তি হবে।

‎শয়নভঙ্গির মতো স্বাভাবিক, সহজ জীবন

‎পেতে হলে ঘ্রাণ নাও, হৃদয়ের অন্তর্গত ঘ্রাণ।...” 

‎‎“অসুস্থতাকালে এত বিচিত্র লালসাময়ী স্বাদ

‎মনে পড়ে, জেগে রয় ঝালমত্ত আহার্যের ঘ্রাণ,

‎মাংসের ঝোলের সিক্ত আবাহন বুভুক্ষু শরীরে।

‎তারকারা ঋতুচক্রে সরে গেছে, এ-সব বোঝেনি।...”

‎‎“আমার আশ্চর্য ফুল, যেন চকোলেট, নিমেষেই

‎গলাধঃকরণ তাকে না-ক’রে ক্রমশ রস নিয়ে

‎তৃপ্ত হই, দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি আবিষ্কারে, প্রেমে।

‎‎আমি রোগে মুগ্ধ হয়ে দৃশ্য দেখি, দেখি জানালায়

‎আকাশের লালা ঝরে বাতাসের আশ্রয়ে-আশ্রয়ে।

‎আমি মুগ্ধ, উড়ে গেছো; ফিরে এসো, ফিরে এসো, চাকা

‎রথ হয়ে, জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো।

‎আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো। প্রেম হবো, অবয়বহীন

‎সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।...” 

‎‎আর কবিতার পর কবিতায় জ্বালিয়ে রেখেছেন দ্যুতিময় সব উপমা ও উৎপ্রেক্ষা...কখনো কখনো একই কবিতায় উপমার পর উপমা...,জমাটবাঁধা, কেলাসিত সব উৎপ্রেক্ষিত উপমাঃ

‎‎“শয়নভঙ্গির মতো অনাড়ষ্ট স্বকীয় বিকাশ  

‎সকল মানুষ চায়...”

‎‎“কোনো পরিচিত নাম বলার সময় হলে মাঝে মাঝে দেখি

‎মনে নেই, ভুলে গেছি; হে কবিতারাশি, ভাবি ঈষৎ আয়াসে

‎ঠিক মনে এসে যাবে, অথচ...অথচ...হায়, সে-এক বিস্মিত,

‎অসহ্য সন্ধান, তাই কেউ যদি সে-সময়ে বলে দেয় তবে

‎তপ্ত লৌহদণ্ড জলে প্রবিষ্ট হবার শান্তি আচম্বিতে নামে।...” 

‎“তবুও পাইন গাছ, ঋজু হয়ে ক্রমে বেড়ে উঠে,

‎প্রকৃত লিপ্সার মতো, আকাশের বিদ্যুতের দিকে।...” 

‎“কৌটার মাংসের মতো সুরক্ষিত তোমার প্রতিভা

‎উদ্ভাসিত করেছিলো ভবিষ্যৎ দিকচক্রবাল।...” 

‎

‎“...বিমর্ষ ভাবনায়

‎রাত্রির মাছির মতো শান্ত হয়ে রয়েছে বেদনা—

‎হাসপাতাল থেকে ফেরার সময়কার মনে।

‎মাঝে মাঝে অগোচরে বালকের ঘুমের ভিতরে

‎প্রস্রাব করার মতো অস্থানে বেদনা ঝরে যাবে।...”

‎“সেই কোন্ ভোরবেলা ইটের মতোন চূর্ণ হয়ে

‎পড়ে আছি নানা স্থানে; কদাচিৎ যথেষ্ট ক্ষমতা,

‎তুমি এসে ছিন্ন-ছিন্ন চিঠির মতোন তুলে নিয়ে

‎কৌতূহলে এক করে একবার পড়ে চলে যাও,

‎যেন কোনো নিরুদ্দেশে,...”

‎“...চতুর্দিকে সরস পাতার

‎মাঝে থাকা শিরীষের বিশুষ্ক ফলের মতো

‎আমি জীবনযাপন করি; কদাচিৎ কখনো পুরোনো

‎দেয়ালে তাকালে বহু বিশৃঙ্খল রেখা থেকে কোনো

‎মানুষীর আকৃতির মতো তুমি দেখা দিয়েছিলে।

‎পালিত পায়রাদের হাঁটা, ওড়া, কূজনের মতো

‎তোমাকে বেসেছি ভালো; তুমি পুনরায় চলে গেছো।...” 

‎“...অগণন কুসুমের দেশে

‎নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো

‎তোমার অভাব বুঝি...”

‎“অভিজ্ঞতা থেকে ক্রমে আকাশের বর্ণহীনতার

‎সংবাদের মতো আমি জেনেছি তোমাকে;...”

‎“এতকাল মনে হতো, তুমিও এসেছো অভিসারে—

‎চাঁদের ওপর দিয়ে স্বচ্ছ মেঘ ভেসে-ভেসে গেলে

‎যেমন প্রতীতি হয়, মেঘ নয়, চাঁদ চলমান।...” 

‎“শিশুদের আহার্যের মতোন সরল হও তুমি,

‎অনাদি বেদনা আছে, অক্ষত চর্মের অন্তরালে

‎আহত মাংসের মতো গোপন বা গোপনীয় হয়ে।...” 

‎“দেবদারু, আমি স্পষ্ট পেঁচকের মতো গহ্বরের

‎স্বস্তি অভিলাষী, তবু ফিরে আসি পূর্ববর্তী ফুলে

‎ক্বচিৎ কখনো কোনো ফোঁড়া হলে নিষিদ্ধ হলেও

‎যে-কারণে তার কাছে অগোচরে হাত চলে যায়।...” 

‎“হাসির মতোন তুমি মিলিয়ে গিয়েছো সিন্ধুপারে। 

‎এখন অপেক্ষা করি, বালিকাকে বিদায় দেবার

‎বহু পরে পুনরায় দর্শনের অপেক্ষার মতো—..

‎কাঁটার আঘাতদায়ী কুসুমের স্মৃতির মতোন

‎দীর্ঘস্থায়ী তার চিন্তা; প্রথম মিলনকালে ছেঁড়া 

‎ত্বকের জ্বালার মতো গোপন, মধুর এ-বেদনা।...”

‎

‎“...পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের

‎অবকাশে ফুটে ওঠা পিপাসার্ত তারাদের মতো

‎অন্যান্য সকলে আছো; অথচ আমি তো নিরুপায়।

‎ক্ষুধিত বাঘের পক্ষে শূন্যে দিক-পরিবর্তনের 

‎মতোন অসাধ্য কোনো প্রচেষ্টার সারবত্তা নেই।...” 

‎“গর্ভস্থ ভ্রূণের প্রতি গূঢ় ভালোবাসার মতোন

‎প্রকাশের কোনোরূপ উপায়বিহীন যন্ত্রণায়

‎গীতিপরায়ণ আমি; মানুষের মরণের আগে

‎পিপাসা পাওয়ার মতো অতিরিক্ত অথচ করুণ

‎আমার অপেক্ষা, আশা—...” 

‎“...মহাশূন্যে গোয়েন্দার মতো জোনাকিরা

‎জ্বলে নেভে, জ্বলে নেভে।...”

‎“...হরিণের মাংসের মতোন

‎বিলম্বিত ব্যবহার পাবো আমি জিহ্বায়, জগতে,...” 

‎

‎কবিতার এ এক তুঙ্গ মহিমা। সৌন্দর্যের শিখর ছোঁয়ার কাঁপা-কাঁপা মুহূর্তে নিয়ে গিয়ে, চূড়ান্ত দশায় উঠিয়ে নিয়ে ফ্রিজ করে ছেড়ে দিয়েছেন কবিতাগুলোকে। শিল্পের, সৌন্দর্যের এক অপরূপ দশাপ্রাপ্তি।  কবিতার এক নিখুঁত নির্বাণপ্রাপ্তি।

‎ফিরে এসো, চাকা-র কবিতাগুলোকে কেউ কেউ বলবেন, প্রেমের কবিতা, প্রেমার্তির কবিতা, কেউ বলবেন, বিরহের; কেউ-বা বলবেন মগ্ন কবিতা, অনুধ্যানমূলক কবিতা। কিন্তু প্রকৃত কবিতাকে কি আদৌ কোনো বিশেষ অভিধায়, বিশেষ সংজ্ঞাবাচক অভিধায় ফেলা যায়? আসলে, যেকোনো খাঁটি কবিতায় যে বিমূর্ত বিষয়টি মূর্ত হয়ে ওঠে তা হচ্ছে সৌন্দর্য, নান্দনিকতা অর্থাৎ শিল্প। কবিতায় যা বিকীর্ণ হয় তা হচ্ছে অনিবর্চনীয় সৌন্দর্য— বিষয় কবিতার যাই হোক না কেন, হোক না তা শান্তির কিংবা অশান্তির, আবিলের কিংবা অনাবিলের, প্রেমের কিংবা অপ্রেমের, নদীর কিংবা নর্দমার, আগুনের কিংবা পানির, আলোর কিংবা কালোর— হোক না তা যে-কোনো রসের, শান্ত কিংবা করুণ কিংবা রৌদ্র কিংবা বীভৎস কিংবা বীর...।

‎যদিও তাঁরই ভাষায়, “চিরকাল সংজ্ঞা থেকে আমাদের সব জ্ঞান যাত্রা শুরু করে”, তবুও প্রকৃত কবিতা তো সমস্ত সংজ্ঞার সীমা ছাড়িয়ে পৌঁছতে চায় নিরাকার, সংজ্ঞাতীত দশায়। কারণ, জ্ঞানের যাত্রা তো এক সময় পেয়ে যায় তার সীমা, কিন্তু অনুভূতির ভাষ্য যে কবিতা, তার তো লীলা চলে বহুদূর ব্যেপে, অনেক রকমের সীমা ছাড়িয়ে,তারও পরে...।

‎প্রকৃতি জুড়ে বিরাজ করে এক বিশেষ ধরনের স্ফূর্তি— সৃজনশীল সহজতার স্ফূর্তি, ক্রিয়েটিভ নাইভিটির স্ফূর্তি ও তার বিচ্ছুরণ। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, বিনয় মজুমদারের বাক্যে ও মননে সেই একই রকম সৃজনশীল সহজতার স্ফূর্তি। অনর্গল। কবিতা, গদ্য, ডায়েরি নির্বিশেষে তার সমস্ত কাজ নিসর্গের সৃষ্টিশীল কাজগুলোর মতোই সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত, নদী, অরণ্য ও পাহাড়শ্রেণির মতো মহিমামণ্ডিত, কাশফুল ও জ্যোৎস্নার মতো, হাওয়া ও বৃষ্টির মতো সরল ও প্রাঞ্জল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যঞ্জনাময়। কেবলই মনে হতে থাকে, এত যে সহজতা, একি কোনো গূঢ় ও গভীর জটিলতার সারাৎসার! এখানে একটা বিষয় লক্ষ করার মতো— তাঁর এই ক্রিয়েটিভ নাইভিটির স্ফূর্তি আমরা “ফিরে এসো, চাকা” পর্বের কবিতাগুলোতে হঠাৎ হঠাৎ ঝলকে উঠতে দেখি...     

‎

‎“আমিই তো চিকিৎসক, ভ্রান্তিপূর্ণ চিকিৎসায় তার

‎মৃত্যু হলে কী প্রকার ব্যাহত আড়ষ্ট হয়ে আছি।

‎আবর্তনকালে সেই শবের সহিত দেখা হয়;

‎তখন হৃদয়ে এক চিরন্তন রৌদ্র জ্বলে ওঠে।

‎অথচ শবের সঙ্গে কথা বলা স্বাভাবিক কিনা

‎ভেবে-ভেবে দিন যায়; চোখাচোখি হয়ে লজ্জা-ভয়ে

‎দ্রুত অন্যদিকে যাই;...”

‎“এখন সম্মুখে যাবো, অসুস্থতাগুলি মনে মনে

‎গোপন রেখেই যাবো, ফুলের সহিত আলোচনা

‎করা তো সম্ভব নয়, যেতে হবে পিতার সকাশে।”

‎

‎পরবর্তীকালে তাঁর অনেক ভাষ্যই একধরনের শিশুসুলভ-অথচ-প্রাজ্ঞ সারল্যে উদ্ভাসিত হতে দেখি। এই যে ক্রিয়েটিভ নাইভিটি, এই যে আপাত-শিশুসুলভ অথচ প্রাজ্ঞ, সৃজনচঞ্চল ভাষ্য সকল, এরা বিকশিত হয়েছে অঘ্রানের অনুভূতিমালা পর্ব থেকে। সেখানে আমরা দেখছি, এক অনুষঙ্গ থেকে অপর অনুষঙ্গে অবাধ ভেসে চলা, কখনো কখনো একটি অনুষঙ্গকে ঘিরে বেশ কিছুক্ষণ ভাবনার তন্তুজাল ছড়ানো, একটি অনুষঙ্গের ওপরই ঘুরে-ঘুরে নানান দিক থেকে আলো ফেলা, আবর্তন, ঘুরে-ফিরে নানা রকমের সহজাত দার্শনিক ভাষ্য ছড়িয়ে দেওয়া...এরপর আস্তে আস্তে, অনেকটা যেন চুপিসারেই, অন্য বিষয়, অন্য অনুষঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়া...অবাধে, অবলীলায়, অনর্গলভাবে...কবিতায় অটোমেটিক রাইটিং-এর এক দীপ্তিমান দৃষ্টান্ত।  

‎এভাবেই কবি পাঠককে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কেমন অবাক সব মায়াবী গোলকধাঁধার মধ্যে নিয়ে গিয়ে দেন ছেড়ে। আর আমরা তো জানিই, গোলকধাঁধা হচ্ছে সেই প্রপঞ্চ যার ভেতরে একবার ঢুকে গেলে আর নিষ্কৃতি নেই, নিষ্কৃতি পাবার আর ইচ্ছাও থাকে না কোনো। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমরা যে পথ হাতড়াই, ইচ্ছা দেখাই, তা আসলে ঠিক বেরুনোর ইচ্ছা নয়, গোলকধাঁধার কুহক ও মায়ায় জড়িয়ে গিয়ে ওর মধ্যেই নিরন্তর ঘুরে মরবার বাসনা।   

‎অঘ্রানের অনুভূতিমালা পর্ব থেকেই আমরা দেখব, এই কবি ও সাধক কীভাবে হয়ে উঠছেন প্রকৃতির এক অমোঘ অংশ, হয়ে যাচ্ছেন নিসর্গ-সংসারের এক অনিবার্য সদস্য । তিনি স্বগতোক্তির মতো করে গাছপালা ফুল, লতা, মানকচু, ঢিবি, চাঁদ, পাহাড়, বাতাস, এদের সঙ্গে কথা বলেন, ঠাট্টা-মশকরা করেন, মাখামাখি করেন, কখনো তাদের কাছে মতামত জানতে চান, কখনো-বা প্রস্তাব পেশ করেন; জবাবে তারাও সাড়া দেয়।   

‎কবি বাতাসের মতামত জেনে নিচ্ছেন এবং আমাদের জানাচ্ছেন, “বাতাসের মতে, খুব কম ঘ্রাণময় ফুলের কেয়ারিগুলি সবচেয়ে ভালো।” কারণ,

‎”খুব বেশি ঘ্রাণ হলে— গাঢ় ঘ্রাণময় হলে বাতাস সহজে

‎কেয়ারিতে ঢুকে যেতে কখনো পারে না, ঘ্রাণই বাধা দিতে থাকে।

‎কোনোমতে জোর করে দায় সারা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না,

‎আমাদের বাতাসের উপায় থাকে না...” 

‎কবি পাহাড়কে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “পাহাড়, তোমার গায়ে বাড়িটি গজালো কেন, এইভাবে কেন গজিয়েছে?” কবি আমাদেরকে আরো জানাচ্ছেন— পাহাড়দেরকে কিংবা শীতকালটিকে কিংবা ওপরের বাড়িটিকে কাউকে কোনো উপদেশ দেন না বা দেবার কথাও ভাবেন না। তবে একবার পাহাড়ের রোডোডেনড্রনদেরকে তাদের সকল ডালে কেবলই বকুল ফুল ফোটাবার জন্য উপদেশ প্রায় দিতে গিয়েও চেপে গিয়েছিলেন। 

‎তারপর তিনি বাজপাখিসহ সকল পাখির মনের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং জানাচ্ছেন—  

‎“বাজপাখিদের মন সকল পাখির মন পরিষ্কার ছন্দোময় হয়।”

‎অতঃপর তিনি বলছেন,

‎”আকাশে হৃদয় মেলে মন ঝাপটিয়ে আমি তালে-তালে মন ঝাপটিয়ে

‎কবিতার মতো উড়ি, সকল পাহাড় ঘিরে, বাড়ি ঘিরে, চূড়া ঘিরে-ঘিরে।”  

‎

‎পাহাড়টির সঙ্গে কবি কোনো তর্ক করেন না, বস্তুত বাড়িটির সঙ্গেও নয়, এমনকি, এই চূড়া কিংবা ওই দূর চূড়া, কারো সঙ্গেই নয়। কারণ তিনি জানেন, তর্ক করে কিংবা বলে-বলে কোনো লাভ নেই, পাহাড় তার নিজের খুশিমতো কাজ করে যায়, যার বহু কিছু কবির নিজের কাছে ভালোই লাগে না। কবি যখন দিনের বেলায় পাহাড়টির চূড়ায় হাত বোলাতে চান কিংবা চান লতাপাতা ঘাসগুলি নিয়ে দুই হাতে আনমনে খেলা করতে, পাহাড় তখন বেশ আপত্তি করে।... 

‎খাঁটি কবিতাকে ঘিরে নানা কথা ও কোলাহল জমিয়ে তোলার চেয়ে জরুরি হচ্ছে তাকে গভীরভাবে পাঠ, অনুভব, আর তার সৌন্দর্য উপভোগ...পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়ে— এ হলো চিরকালের দাবি, খাঁটি কবিতার। এ কথা মনে রেখে তাই এখানে বিনয় মজুমদারের কবিতা নিয়ে বেশি আলোচনার চেয়ে চেষ্টা করলাম তার কবিতা থেকে পাঠের, বেশি বেশি করে পাঠের। আরো অনেক পাঠ করতে পারলে ভালো লাগতো— কারণ, শিল্পসম্ভোগের যে প্রশান্তি, তা প্রকৃতপক্ষেই অনাবিল, অনুপম— কিন্তু সীমিত এখানে পরিসর। পরবর্তী সময়ে এই মহৎ সাধককবির শিল্পকর্ম নিয়ে আরো কথা বলার আশা রাখি।  

‎যেসব শিল্পকর্ম আমাদেরকে জীবনযাপনের নানা সংকটে, আশায় ও নিরাশায় শুশ্রূষা দেয়, আলো ও হাওয়া দেয়, দিতে পারে, এমনকি কখনো কখনো পিছলে পড়বার মুহূর্তে পড়ে যাবার হাত থেকে বাঁচায়, বিনয় মজুমদারের কবিতা ও কাজ তাদের মধ্যে ব্যতিক্রমীভাবে অন্যতম। বহুবার, বহু আনন্দ ও কষ্ট পাবার মুহূর্তে, শোকের, নির্বেদের, বিষণ্নতার, আর প্রত্যাখ্যাত হবার দিনগুলোতে আমরা এগিয়ে যাই তাঁর পঙক্তিমালার দিকে; শ্লোকের মতো উচ্চারণ ও ধারণ করি তার পঙক্তি ও বচন আর প্রশান্তিতে পূর্ণ হয় আমাদের অভ্যন্তর। সম্ভবত ভবিষ্যতেও বহুবার সেগুলোকে উচ্চারণ করতে হবে আমাদের। ‎সাধক হওয়ার পথে একটি পর্যায় হচ্ছে কবি-পর্যায়, অর্থাৎ সাধনার পথে একটি পর্ব হচ্ছে কবিত্বপর্ব। এ পর্ব থেকেই শুরু হয় সহজ, সরল, প্রাঞ্জল ও পুরোপুরি সংস্কারহীন হয়ে যাওয়ার পর্যায়। কবি যখন সাধনা করতে করতে সাধকের স্তরে পৌঁছে যান, তখন তাঁর চিন্তা, তাঁর ভঙ্গি ও ইশারা, তাঁর বচন-বাচন সব হয়ে আসে সহজ-সরল অথচ অর্থময়, ভাবব্যঞ্জক। একাকার হয়ে আসে তাঁর যাপন ও বচন, তাঁর ভাষা ও ভাষ্য, প্রায় একাকার হয়ে যায় তাঁর দেহ ও বাক্য। সেই স্তরে পৌঁছে, স্বয়ং কবি আর তাঁর কবিতা, স্বয়ং সাধক আর তাঁর চিন্তা ও কাজ, এসবের মধ্যে থাকে না আর কোনো ভেদ কিংবা ফারাক। এবং ভাবুকজনেরা, রসজ্ঞ সমঝদারেরা তখন খোদ সাধককেই পাঠ ক’রে তাঁর ভাবের, ব্যঞ্জনার অর্থোদ্ধার করে। 

‎দুরারোহ পর্বতের নানা জটিল ও লোমহর্ষক চড়াই-উৎরাই, উত্তেজনাপূর্ণ খানাখন্দ, বিচিত্র দৃশ্যশোভা উতরে উতরে পার হয়ে বহু সাধনার পর যখন চূড়ায় গিয়ে পৌঁছেন কোনো আরোহীসাধক, তখন সবকিছু তার কাছে সহজ ও প্রাঞ্জল বোধ হতে থাকে; সমগ্র জীবন, জগৎ, নিসর্গ, মানবের বড় বড় সব অর্জন, কীর্তি, মহোচ্চ সব চিন্তা, দর্শন, সব কিছুকে শিশুর কীর্তিকলাপ, শিশুর ধুলোখেলা বলে মনে হয়, তখন অনেক নিচের কোলাহল ও খেয়োখেয়িতে ভরা সমাজ-সভ্যতার বিশাল বিশাল স্থাপনাগুলোকে মনে হয় খেলাচ্ছলে সাজিয়ে রাখা দেশলাই বাকশোর সারি। অনেকটা কি সে-রকম এক স্তরে উত্তীর্ণ হওয়ার সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন আমাদের এই সাধককবি বিনয় মজুমদার! সব ধরনের মোহ ও চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে, সকল শুচিবায়ু ও সংস্কারের ঊর্ধ্বে... 

‎আমরা জানি, এক ধরনের সাংস্কৃতিক চক্রান্ত ও ভেদবুদ্ধির, একধরনের দুর্বোধ্য কুহেলিময় অনুকম্পা ও অবহেলার শিকার হতে হয়েছে এই সাধককে। তাঁর জীবন ও কীর্তির ওপর, তাঁর কৃতিত্ব ও মহত্ত্বের ওপর দিয়ে তৈরি হয়ে আছে রকমারি কুয়াশার আবরণ। কুয়াশা সরে গেলে অনেককিছু ফরসা হয়।