প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান পর্ষদ ভেঙ্গে দেয়ার দাবি সাবেক পরিচালকদের নানা অনিয়মের অভিযোগ

Any Akter
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৫:৪৮ অপরাহ্ন, ১১ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৫:৪৮ অপরাহ্ন, ১১ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকটির সাবেক চার পরিচালক। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান পর্ষদ অবৈধভাবে গঠিত এবং নানা অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকটি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক আবেদনপত্রে সাবেক পরিচালকেরা দাবি করেন, ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট কোনো ধরনের নোটিশ বা কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়েই আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। তাঁদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান ডা. আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে একটি ‘অবৈধ’ পর্ষদ গঠন করা হয়, যেখানে অধিকাংশ পরিচালকই স্বতন্ত্র এবং তাঁদের ব্যাংকে কোনো শেয়ার নেই। ফলে ব্যাংকের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা নেই এবং দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁরা উন্নয়নের বদলে ব্যক্তিস্বার্থে মনোযোগী হয়ে পড়েছেন।

আরও পড়ুন: কক্সবাজারে ব্র্যাক ব্যাংকের এজেন্ট এনগেজমেন্ট মিটিং অনুষ্ঠিত

অভিযোগ করা হয়, পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এমডিসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া, শাস্তিমূলক বদলি এবং সাবেক পরিচালকদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থায় বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়। এতে ব্যাংকের ভেতরে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব পড়ে গ্রাহকদের আস্থায়। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের আস্থা কমে যাওয়ায় আমানত কমে গেছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন। আবেদনপত্র অনুযায়ী, আগের পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সময় ব্যাংকের আমানত ছিল প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমানে কমে প্রায় ৩০ হাজার কোটিতে নেমে এসেছে। আমানত কমে যাওয়ায় ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে, যা গত ২৫ বছরে কখনো ঘটেনি। অতীতে কখনো ব্যাংকের এসএলআর (স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রেশিও) ঘাটতি হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন: সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ

এ অবস্থায় ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা নিয়েছে, যা গত ২৫ বছরে প্রথম বলে দাবি করা হয়। এই তারল্য সহায়তা নিতে বড় অঙ্কের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও আবেদনপত্রে অভিযোগ করা হয়েছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনায়ও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। সাবেক পরিচালকদের দাবি, বর্তমান পর্ষদ নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে শত শত কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

তাঁদের দেওয়া তথ্যে বলা হয়, ২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকটি প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছিল, সেখানে বর্তমানে ৬৩৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। প্রকৃত লোকসান প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা হতে পারত বলেও দাবি করা হয়। খেলাপি ঋণের হার ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অমান্য করে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ‘মিথ্যা আয়’ দেখানো হচ্ছে বলেও আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়।

শিল্পখাতেও এর প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আগে প্রায় ৫০০ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এই ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করলেও বর্তমানে ৫০টিরও কম প্রতিষ্ঠান সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আমদানি-নির্ভর অনেক প্রতিষ্ঠানও ব্যাংকের সহযোগিতা না পেয়ে কার্যক্রম সংকুচিত বা বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।

এ ছাড়া নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সাবেক পরিচালকদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে প্রায় ৬০০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, ফলে যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় বনানীর ইকবাল সেন্টার থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং আমানতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আবেদনপত্রে বলা হয়।

সাবেক পরিচালকদের অভিযোগ, বর্তমান পর্ষদ নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে ব্যাংকের ভেতরে ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করেছে। ফলে আস্থা, সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার অভাবে ব্যাংকটি ‘বন্ধ হওয়ার উপক্রম’ হয়েছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত বর্তমান পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে রক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক পরিচালকেরা।