তেল বিতরণে অব্যবস্থাপনায় তীব্র যানজটে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:০৪ অপরাহ্ন, ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৮:০৪ অপরাহ্ন, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকায় জ্বালানি তেল বিতরণে চরম অব্যবস্থাপনায় নগরজুড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভ্যাপসা গরম ও তীব্র যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী। পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ থাকলেও বিতরণ অব্যবস্থাপনায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তেলের পাম্প ঘিরে দীর্ঘ লাইনে ঢাকার মোড়ে মোড়ে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। তেজগাঁও এলাকায় সততা সাউদান ও অন্যান্য তেলের পাম্প ঘিরে বড় বড় কাভার্ড ভ্যান এক প্রকার অবরোধ তৈরি করে তুললে সড়কগুলো স্থবির হয়ে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা ও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তেল সংগ্রহে ঢাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ পাম্প গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কের সংযোগস্থলে থাকায় জ্বালানি নিতে আসা গাড়ির লাইন সরাসরি সড়কে উঠে যায়, ফলে আশপাশের পুরো এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার এই দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে।

আরও পড়ুন: তেল সংকটে দিন দিন থমকে যাচ্ছে রাজধানী: দীর্ঘ লাইন, রেশনিং আর বিশৃঙ্খলায় জনজীবন জিম্মি

তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সরকারি আশ্বাসের মধ্যেও রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের মজুতদারি ও সিন্ডিকেট কারসাজিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। চলমান জ্বালানি সংকট ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনা (প্যানিক বাইং) এবং পাম্পগুলোর সামনে রাস্তার একাংশ দখল করে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকায় রাজধানীর তেজগাঁও, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। তবে সরকার পর্যাপ্ত তেল মজুত থাকার নিশ্চয়তা দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না।

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুর ১০, মিরপুর ২, মহাখালী বাস টার্মিনালসংলগ্ন এলাকা, উত্তরা জসীম উদ্দীন ও আজমপুর, মগবাজার, আজিমপুর, নীলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এবং গুলিস্তান-শাপলা চত্বর এলাকার একাধিক পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ যানজট দেখা যায়। কোথাও কোথাও গাড়ির সারি এক থেকে দুই কিলোমিটার ছাড়িয়ে প্রধান সড়কের একাধিক লেন দখল করে ফেলে। এতে নগরজুড়ে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন: বনানীতে বহুতল ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে

তেজগাঁওয়ের সিটি ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির চালক আব্দুল কাদের বলেন, সকাল ৯টা থেকে লাইনে আছি। এখন বিকেল ৫টা, তবু তেল পাইনি। একই অবস্থায় আছেন মৎস্য ভবন এলাকার পাম্পে অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকারচালক সুমন মিয়া। তিনি বলেন, এটা এখন পাম্প না, পুরো রাস্তাই লাইন হয়ে গেছে। সামনে-পেছনে নড়ার জায়গা নেই। মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপর আটকে পড়া আজমেরী বাসের চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, পাম্পগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় থাকে, কিন্তু আজকে রাস্তা দখল করে যানজট লাগিয়ে দিয়েছে। ওই বাসের যাত্রী ইকবাল কবির বলেন, গত ঈদের পর আজকে যানজট সবচেয়ে বেশি মনে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে আটকে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের বাসের যাত্রী নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, এক ঘণ্টা ধরে বাস নড়ছে না। জটের কারণে নামতেও পারছি না। গরমে ভেতরে বসে থাকা কষ্টকর হয়ে গেছে।

ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মহাখালী, মিরপুর, তেজগাঁও, আসাদগেট, যাত্রাবাড়ীতে পাম্পের লাইন সরাসরি সড়কে চলে আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা চেষ্টা করছি যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে, কিন্তু চাপ অনেক বেশি। মূলত রাজধানীতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। পয়লা বৈশাখের ছুটির পর থেকে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা গেছে, যা নগরজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি করেছে। রাজধানীর এয়ারপোর্ট, নিকুঞ্জ, প্রগতি সরণি ও শাহবাগ, রামপুরা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে—বাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। অনেকেই আগের রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিশ্চিতভাবে তেল পাচ্ছেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী বাজার তদারকি, প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছাড়া জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। অন্যথায় এ সংকট আরও তীব্র হয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াতে পারে।