টিসিবির লাইনে দেয়াল ধসে দুই জন নিহত
রাজধানীর মিরপুরে টিসিবির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ওপর একটি পুরোনো দেয়াল ধসে দুইজন নিহত ও অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। দিনের আলোয় জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নগর অবকাঠামোর নিরাপত্তা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পেছনের সীমানাপ্রাচীর হঠাৎ ধসে পড়লে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল মিরপুরের লাভ রোড এলাকায়, যেখানে নিয়মিত টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়। কম দামে নিত্যপণ্য সংগ্রহ করতে প্রতিদিনের মতো সেদিনও দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন শতাধিক মানুষ। এর মধ্যেই বিকট শব্দে ধসে পড়ে বহু বছরের পুরোনো দেয়াল। মুহূর্তেই ইট-পাথরের স্তূপের নিচে চাপা পড়েন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষ।
আরও পড়ুন: ৩ শর্তে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স পুনর্বহাল
নিহতদের মধ্যে জনতা হাউজিং এলাকার বাসিন্দা নাসিমা বেগমের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। অপর নিহত ব্যক্তি প্রায় ৪০ বছর বয়সী একজন পুরুষ। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান জানান, দুপুর ১টা ২৬ মিনিটের দিকে দেয়াল ধসের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের কাছেই থাকা পুলিশের টহল দল দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় ভাঙা দেয়ালের নিচ থেকে আটজনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে পঙ্গু হাসপাতালে নাসিমা বেগম এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপর এক ব্যক্তিকে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। আহতদের মধ্যে একজন নারীর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যৌথ উচ্ছেদ অভিযান, অপসারণ করা হলো অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধসে পড়া দেয়ালটি ছিল বহু বছরের পুরোনো এবং প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু। দেয়ালটির স্থায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়ে আগে কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, টিসিবির পণ্য বিক্রির কারণে ওই স্থানে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। তবু জনসমাগমের পাশেই ঝুঁকিপূর্ণ দেয়াল রেখে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়মতো দেয়ালটির ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বা অপসারণ করলে এই প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতে পারত।
আইনজ্ঞদের মতে, জনসাধারণের চলাচল বা সরকারি সেবাগ্রহণের স্থানে অবহেলাজনিত নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রাণহানি ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। তাই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না তা তদন্তের মাধ্যমে নিরূপণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ দেয়াল, ভবন ও অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকলেও কার্যকর নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষকেই প্রাণ দিতে হচ্ছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর তালিকা তৈরি, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা, জনসমাগমপূর্ণ স্থানে বিশেষ নজরদারি এবং দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।





