বাঘ হত্যা থামছে না, সক্রিয় আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র

Sadek Ali
মো ইউনুস আলী
প্রকাশিত: ৭:২৭ অপরাহ্ন, ২৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৭:২৭ অপরাহ্ন, ২৮ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বিশ্ব বাঘ দিবস (২৯ জুলাই) সামনে রেখে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট এবং আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের কারণে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখনো বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে রয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম ট্রানজিট ও উৎসদেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীর বড় একটি অংশের উৎস সুন্দরবন ও এর আশপাশের এলাকা। বাঘ ছাড়াও কুমির, হরিণ, তক্ষক, সাপ, কচ্ছপ ও হাঙ্গরও পাচারের শিকার হচ্ছে।

আরও পড়ুন: নান্দাইলে বিএনপি নেতার পরলোকগমনে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর শোক প্রকাশ

বনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সাল থেকে সুন্দরবনে অন্তত ২০০টি বাঘ অবৈধভাবে হত্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এ সময়ে বহু বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁত ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উদ্ধার হলেও মূল হোতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।

সূত্র জানায়, সংঘবদ্ধ চোরাশিকারি চক্র দাদনের অর্থ নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করে। তারা কখনও গুলি, কখনও ফাঁদ, আবার কখনও বিষমাখানো মৃত হরিণ বা ছাগল ব্যবহার করে বাঘ হত্যা করে। পরে চামড়া, হাড়, দাঁত, মাথার খুলি, চর্বি, মাংসসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আন্তর্জাতিক কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। বিশেষ করে চীন ও পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে এসবের চাহিদা রয়েছে।

আরও পড়ুন: ঢাকা-যমুনা মহাসড়কে গ্যাস লাইনে ফাটল, যান চলাচলে ধীর গতি

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উচ্চমূল্যের কারণেই সুন্দরবন দীর্ঘদিন ধরে চোরাশিকারিদের লক্ষ্যবস্তু। বনদস্যুদের একটি অংশও এখন বন্যপ্রাণী শিকারে জড়িয়ে পড়েছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনের বাঘের প্রধান তিনটি হুমকি হলো—অবৈধ শিকার, বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ নিধন এবং আবাসস্থলের অবক্ষয়। এসব মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও লবণাক্ততা বাড়ছে। এতে বাঘের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে এবং মিষ্টি পানির সংকটে প্রাণীগুলো নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বন উজাড়, অপরিকল্পিত পর্যটন, ভারী নৌযান চলাচল এবং খাদ্যসংকটও বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।

অন্যদিকে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেএম হাসানুর রহমান জানান, ২০১৮ সালের পর থেকে লোকালয়ে বাঘ প্রবেশের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং পিটিয়ে বাঘ হত্যার ঘটনাও আর পাওয়া যাচ্ছে না।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে “সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প” গ্রহণ করা হয়, যা চলতি বছরের মার্চে শেষ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের বৈজ্ঞানিক জরিপে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯.৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭.৯২ শতাংশ বেশি। এছাড়া ২১টি শাবকের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে, যদিও উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে সেগুলো মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

সংরক্ষণবাদীদের মতে, বাঘের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও পাচারচক্র দমন, আবাসস্থল রক্ষা, খাদ্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং সীমান্তজুড়ে কঠোর নজরদারি ছাড়া সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।