‘সায়েদাবাদ ওয়ান্ডারল্যান্ড’ পার্কে ময়লার গাড়ির জঞ্জাল

Any Akter
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৫:১৩ অপরাহ্ন, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:০৯ পূর্বাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

# শিশুদের হাসি-আনন্দ আর মানুষের হাঁটাচলায় আনন্দ-কোলাহল যেন হারিয়ে গেছে

# পার্কের দুর্গন্ধে আশপাশের বাসাবাড়িতে বসবাসের অযোগ্য

আরও পড়ুন: রাড্ডা ও সালমানের স্টুডিওতে হামলা, ফের আলোচনায় বিএনপির দখল-চাঁদাবাজি

সায়েদাবাদ ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক—যা সায়েদাবাদ পার্ক নামে পরিচিত। ২০০২ সালে রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রবেশদ্বার সায়েদাবাদ লেভেলক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে স্বামীবাগ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এ পার্ক। এলাকার হাজারো বাসিন্দার বাধার মুখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ২০২২ সালে পার্ক উচ্ছেদ করে সেখানে ময়লার গাড়ির গ্যারেজ করেছেন।

ইট-কাঠ আর কংক্রিটের নগরী ঢাকায় বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু সবুজের প্রয়োজন, তা দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যকরভাবে বেঁচে থাকার জন্য নির্মল পরিবেশের খোরাক মেটানো শিশুদের প্রিয় পার্কটি বিলীন করে সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। ময়লার দুর্গন্ধে আশপাশের বহুতল ভবনের আবাসিক বাসাবাড়ি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। শিশু তো বটেই, বিভিন্ন বয়সী মানুষের কোলাহলে মুখর থাকা একসময়ের প্রাণবন্ত শিশুপার্কটিতে ছিল ট্রেন, ভয়েজার বোট, প্যারাট্রুপার, টুইস্টার, সুপার চেয়ার, ফ্লাওয়ার ক্যাপ, মিনি ট্রেন, মিনি ক্যাব, বেবি কার, মেরি-গো-রাউন্ড, ওয়ান্ডার হুইল, বাইক চপার, থ্রি-হর্সসহ ২০টি রাইড। সেখানে এখন গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, হর্নের উচ্চশব্দ ও ময়লার দুর্গন্ধ।

আরও পড়ুন: সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা: মূল পরিকল্পনাকারী গ্রেপ্তার

জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির গ্যারেজ সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসংলগ্ন মোটর গ্যারেজে ছিল। সেখান থেকে ২০২২ সালে তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস গ্যারেজ অস্থায়ীভাবে স্থানান্তর করে সায়েদাবাদ পার্ক উচ্ছেদ করে পার্কের জায়গা দখল করে ময়লার গাড়ির গ্যারেজ স্থাপন করেন। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির একাধিক চালক বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই পার্ক উচ্ছেদ করে পার্কের জায়গা দখল করে গ্যারেজ স্থানান্তর করা হয়েছে। গ্যারেজটি আগে যেখানে ছিল, সেখানে অনায়াসে যানজট ছাড়াই গাড়ি যাতায়াত করত। বর্তমান গ্যারেজের পাশে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ব্যস্ত এলাকা। এখানকার গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করতে ও প্রবেশ করতে যানজটে আটকে পড়ে ব্যাপক সময় ও গাড়ির জ্বালানি (তেল) অপচয় হয়। তাছাড়া এ গ্যারেজে গাড়ি রাখার জায়গা কম থাকায় রাস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি রাখা হচ্ছে।

কথা হয় স্বামীবাগ এলাকার বাসিন্দা আলী আক্কাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে পার্কটি স্থাপন করা হয়। তখন পার্কের জায়গাটি পুকুর ছিল। আমরা এ পুকুরে গোসল করতাম। মোস্তফা নামে এক ব্যক্তি জায়গাটি লিজ নিয়ে মাটি ভরাট করে পার্ক স্থাপন করেন। পার্কটি স্থাপনের পর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ীসহ এই এলাকার শিশু-কিশোররা পার্কে এসে বিভিন্ন রাইডে উঠে মাতিয়ে রাখত। তাছাড়া ডায়াবেটিসের রোগীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ সুস্থ থাকতে পার্কে এসে হাঁটাচলা ও বিনোদন করে সময় কাটাত। বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালিতে সবুজে ঘেরা ছিল পার্কটি। কিন্তু বাদ সাধেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি কোনো কারণ ছাড়াই পার্ক উচ্ছেদ করে ময়লার গাড়ির গ্যারেজ স্থাপন করেন। এই এলাকার ৫৬টি বাড়ির মালিক ও বয়োজ্যেষ্ঠ লোক স্বাক্ষর দিয়ে মেয়র ও জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেছিলেন, যাতে পার্ক উচ্ছেদ ও গ্যারেজ স্থাপন করা না হয়। গ্যারেজ স্থাপন করার পর ময়লার দুর্গন্ধের কারণে বাসাবাড়ি ও এই এলাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পার্কের ভেতর বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল, দিন দিন গাছগুলো মরে যাচ্ছে। গ্যারেজের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে দুটি জামে মসজিদ এবং ১০-১২টি বহুতল আবাসিক ভবন রয়েছে। ময়লার গ্যারেজ সরিয়ে পুনরায় পার্ক স্থাপন করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা প্রশাসকের কাছে দাবি জানিয়েছেন স্বামীবাগ এলাকার বাসিন্দারা।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা না থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তবে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকা হাসিবা খান বলেন, "পার্কের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। আমি কিছু বলতে পারছি না।"

জানা গেছে, রাজধানীর স্বামীবাগ-সায়েদাবাদের ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কটি একসময় শিশুদের হাসি-আনন্দ আর মানুষের হাঁটাচলায় মুখর থাকত। গাছপালা আর খোলামেলা পরিবেশে শিশু-কিশোরদের বিনোদনের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের হাঁটা ও অবসর কাটানোর অন্যতম জায়গা ছিল পার্কটি। সেই জায়গাতেই এখন সারি সারি ময়লার গাড়ি, লোহালক্কড় ও বিভিন্ন সরঞ্জামের জঞ্জাল। নেই কোনো রাইড, নেই বিনোদনের ব্যবস্থা, নেই সেই সবুজ পরিবেশও।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গাড়ি রাখার জন্য ধলপুর এলাকায় গাড়ি রাখার বড় গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। সেটি সম্পন্ন হলে সায়েদাবাদের এ স্থানে আর ময়লার গাড়ি রাখা হবে না। তখন সরকার এ স্থানটি ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে, এখানে আবার পার্ক নির্মাণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেই বলেও জানিয়েছেন তারা।

গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় ধুলাবালি, জলাবদ্ধতা ও আশপাশের যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যায় পার্কের দর্শনার্থী কমতে থাকে। ফ্লাইওভার চালুর পরও যানবাহনের চাপ, ভাঙাচোরা সড়ক ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে মানুষের আনাগোনা আর আগের মতো হয়নি। এরপর পার্ক পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে এর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২২ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের সময়ে পার্কের জায়গাটি ময়লার গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহার শুরু করা হয়। এর আগে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসংলগ্ন মোটর গ্যারেজ এলাকায় ময়লার গাড়ি রাখা হতো। বর্তমানে জায়গাটিতে কোনো রাইড বা পার্কের স্থাপনা নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো চত্বরটি এবড়োখেবড়ো, বিভিন্ন জায়গায় কাদাপানি জমে আছে। পুরো চত্বরজুড়ে বিশৃঙ্খলভাবে ময়লার গাড়ি রাখা। চারপাশে ময়লার দুর্গন্ধ। কিছু গাছ থাকলেও সেগুলোর অবস্থাও ভালো না। এখানকার কর্মীরা জানিয়েছেন, একসময় এখানে অনেক গাছ ছিল। ধীরে ধীরে গাছগুলো মরে যাচ্ছে।

গ্যারেজের একজন কর্মী জানান, গ্যারেজে ১০০ থেকে ১৫০টি গাড়ি সবসময়ই থাকে। সায়েদাবাদ ও আশপাশের বিশাল এলাকাজুড়েই বাসস্ট্যান্ড। তাই, এ এলাকায় যানজট সারাক্ষণ লেগেই থাকে। সেই যানজট পেরিয়ে এ গ্যারেজে গাড়ি আনা খুবই ঝামেলার।

স্বামীবাগ এলাকার বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, ফ্লাইওভার বানানো শুরু হলে পার্কে লোক কমতে থাকে। একসময় পার্ক বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ময়লার গাড়ি রাখার কারণে প্রথম দিকে আশপাশে গন্ধে টেকা যেত না। এলাকার মানুষ আপত্তিও জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এখন সবার সয়ে গেছে।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, পার্কটি চালু থাকাকালে শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেখানে সময় কাটাতেন। পার্কের সবুজ পরিবেশ ছিল এলাকার ঘনবসতির মধ্যে স্বস্তির একটি জায়গা। এখন সেই জায়গায় ময়লার গাড়ি, লোহালক্কড় ও নানা ধরনের জঞ্জাল থাকায় আগের পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, "সায়েদাবাদ ও ধলপুর এলাকায় একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে ময়লার গাড়িগুলো ওই জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জায়গাটি খালি হওয়ার পর সেখানে পার্ক করা হবে কি না, এ মুহূর্তে সিটি করপোরেশনের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা নেই।" তিনি বলেন, "যখন ধলপুরের প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে এবং ময়লার গাড়িগুলো শিফট হয়ে যাবে, তখন জায়গাটি নিয়ে অবশ্যই একটা ভাবনা কাজ করবে। সেটা পার্ক হতে পারে বা অন্য কোনো স্থাপনা হতে পারে। তখনকার প্রশাসক বা মেয়র যিনি থাকবেন, তাঁরা প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করে এ বিষয়ে পরিকল্পনা নিতে পারেন।" তিনি আরও বলেন, "ঢাকা শহরের মধ্যে জায়গা পাওয়া কঠিন। নতুন করে জায়গা পাওয়ার সুযোগও কম। যেগুলো আছে, সেগুলো এবং সিটি করপোরেশনের পুরোনো জায়গাগুলো ব্যবহার করার পাশাপাশি যেগুলো উদ্ধার করা যায়, সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। অনেকগুলো পার্ক ও খেলার মাঠ আমরা উদ্ধার করে দখলমুক্ত করছি। কাজ চলছে এবং সেগুলোর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও চলছে। নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, হয়তো অল্পদিনের মধ্যে আপনারা আরও দৃশ্যমান উন্নতি দেখতে পাবেন।"

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিবহন বিভাগের ব্যবস্থাপক গোলাম মোর্শেদ বলেন, "জায়গাটি মূলত অস্থায়ীভাবে ময়লার গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তখনকার মেয়র সাহেব এটা অস্থায়ীভাবে করেছিলেন। আমাদের মূল গ্যারেজ হচ্ছে ধলপুরে ওয়াসার ওই জায়গায়। সেখানে প্রায় ২০ একর জায়গার ওপর গ্যারেজ নির্মাণের কাজ চলছে। এরই মধ্যে কাজ প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।" তিনি বলেন, "এটি যান্ত্রিক বিভাগের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে করা হচ্ছে। কাজ শেষ হতে আরও এক থেকে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। গ্যারেজটি চালু হলে সায়েদাবাদ থেকে ময়লার গাড়িগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। আমরা এখান থেকে সরে গেলে তখন এখানে পার্ক বা সরকার যা করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই হবে। সরকার বা সিটি করপোরেশন যে সিদ্ধান্ত নেবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে।" বর্তমানে জায়গাটি শুধু ময়লার গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও জানান পরিবহন বিভাগের ব্যবস্থাপক।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূইয়া বলেন, "আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গাড়িগুলো পরিবহন বিভাগের আওতায় অস্থায়ীভাবে ওই জায়গায় রাখা হয়। সিটি করপোরেশনের মেকানাইজড কার পার্কিং প্রকল্পের আওতায় একটি পার্কিং এলাকা নির্মাণ করা হচ্ছে। ওই জায়গার নির্মাণকাজ শেষ হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গাড়িগুলো সেখানে স্থানান্তর করা হবে।"